
প্রিন্ট: ০১ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:২৯ এএম
দেশের একমাত্র পরিচ্ছন্ন গ্রাম মুনলাইপাড়া, কিন্তু কেন?

আলাউদ্দীন শাহরিয়ার, বান্দরবান
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৫, ০৩:৩৬ পিএম

আরও পড়ুন
ভারতের মেঘালয়ের মাওলিনং ভিলেজকে বলা হয় এশিয়ার সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। মেঘালয়ের রাজধানী শিলং থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই গ্রামটি ২০১৩ সালেই এই স্বীকৃতি পায়। তবে বাংলাদেশেও এমন একটি গ্রাম রয়েছে যাকে বলা হয় দেশের সবচেয়ে পরিপাটি ও পরিচ্ছন্ন গ্রাম। গ্রামটির নাম মুনলাইপাড়া। চলুন জেনে নেই গ্রামটি সম্পর্কে—
বান্দরবানের রুমা উপজেলায় সাজানো-গোছানো পরিপাটি পাহাড়ের পরিচ্ছন্ন একটি গ্রাম মুনলাইপাড়া। গ্রামটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো পাড়ার প্রতিটি মাচাং ঘরের আঙিনায় জবাসহ হরেকরকমের ফুলের গাছ রয়েছে, যা গ্রামের সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে বহুগুণে। পর্যটন স্পট বগালেক যাওয়ার পথে সড়কে দেখা মিলবে আদর্শ এ গ্রামের। ইতোমধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন-পরিপাটি গ্রাম হিসাবে স্বীকৃতি পাওয়া মুনলাইপাড়া স্থানীয় দর্শনার্থী ও পর্যটকদের আকর্ষণে পরিণত হয়েছে।
তবে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, দর্শনার্থী ও ভ্রমণকারী পর্যটকের আনাগোনা না থাকায় অর্থনৈতিক কষ্টে দিন কাটাচ্ছে পর্যটননির্ভর পাড়াবাসীরা। ট্যুরিজমকে ঘিরে গড়ে তোলা কিছুক্ষণ ও চুংচুং দুটি রেস্টুরেন্ট বন্ধ রয়েছে। ইকো-ট্যুরিজম রিসোর্টগুলোর অবস্থাও জরাজীর্ণ। মুনলাইপাড়ার মূল আকর্ষণ বগালেক সড়কের দুপাশে পাড়ার প্রতিটি বাড়ির আঙিনায় লাগানো ফুলের গাছগুলো রুক্ষ হয়ে পড়েছে পানির অভাবে। তীব্র পানি সংকটে রয়েছে পাড়াবাসী।
স্থানীয় জনগোষ্ঠীদের তথ্যমতে, ১৯৮৩ সালে ৩০টি বম জনগোষ্ঠীর পরিবার নিয়ে গড়ে ওঠে মুনলাইপাড়া। সীমান্তবর্তী চুংচুংপাড়া থেকে বম জনগোষ্ঠীর পরিবারগুলো এখানে এসে জনপ্রতি পাঁচ একর করে জায়গা নিয়ে মুনলাইপাড়ায় বসবাস শুরু করেছিল। বর্তমানে এখানে প্রায় ৭০টি বম জনগোষ্ঠীর পরিবার এ পাড়ায় বসবাস করছে। তারা সবাই সম্মিলিতভাবে পাড়ার সৌন্দর্যবর্ধন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং সালিশ-বিচারের কাজ করেন। ঐক্যবদ্ধ হওয়ায় দেশের সবচেয়ে সুন্দর গ্রামের তকমা পেয়েছে পাহাড়ের ছোট্ট মুনলাইপাড়া। চারদিকে পাহাড়বেষ্টিত এবং সাঙ্গু নদী পাশ ঘেঁষে গড়ে তোলা এ গ্রামটি দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় ইকো-সিস্টেমের হোম স্টে ও পাহাড়ি রান্না, রোমাঞ্চকর ট্রেকিং, কায়াকিং, দেশের দীর্ঘতম জিপ লাইন ও বিভিন্ন ইভেন্টের মাধ্যমে।
বান্দরবান জেলা শহর থেকে রুমা উপজেলার দূরত্ব ৪২ কিলোমিটার। রুমা বাসস্ট্যান্ড থেকে পরিচ্ছন্ন গ্রাম মুনলাইপাড়ার দূরত্ব ছয় কিলোমিটার। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময়ের মধ্যে বান্দরবান সদর থেকে পৌঁছে যাওয়া যায় আদর্শ গ্রামটিতে।
স্থানীয় বাসিন্দার ইকো-ট্যুরিজমের উদ্যোক্তা জিংসম বম বলেন, বম জনগোষ্ঠীরা সুন্দরের পূজারি। এটি বম সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যের অংশ। গ্রামের প্রতিটি ঘরের সামনে আছে ময়লা ফেলার ঝুড়ি (ডাস্টবিন)।
পাড়ার গৃহিণী লালনুন জির বম বলেন, সংসারের কাজকর্মের ফাঁকে গ্রামের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতায় দুবেলা কম হলেও ত্রিশ মিনিট সময় দিতে হয়, এটি বাবা-মায়েদের আমল থেকেই বংশপরম্পরায় করে আসছে।
মুনলাইপাড়া বম কমিউনিটি ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক রবিন বম বলেন, পানি সমস্যায় মুনলাইপাড়ার সৌন্দর্যবর্ধনে লাগানো বিভিন্ন জাতের ফুলের গাছগুলো মরে যাচ্ছে। পাড়াবাসীরাও পানির জন্য খুবই কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর কাছে পানির ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। পাড়ার বাসিন্দা শিক্ষক কালেব বম বলেন, এ গ্রামের বাসিন্দারা কেউই ঘরে কখনো তালা লাগায় না, কারণ এখানে চুরি হওয়ার কোনো ভয় নেই। ঘর খোলা রেখেই কেউ বাইরে গেলে প্রতিবেশী নিজের মনে করেই বাড়িটি পাহারা দেন।
রুমা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আদনান চৌধুরী বলেন, এ গ্রামে পানি সংকটের বিষয়টি আমাকে গ্রাম কমিটি জানায়নি। খবর নিয়ে সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।