
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০২:২১ পিএম

ফখরুল ইসলাম
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য চীন খুবই আগ্রহী। আর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের কাছে আগে থেকেই পরিচিত। এ কারণেই তাকে এত সম্মান দিয়ে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কথাগুলো বলেছেন শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ, অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ। যুগান্তরকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর ছাড়াও চীন-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক, বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা, নির্বাচন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ইত্যাদি অনেক বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফখরুল ইসলাম
যুগান্তর : প্রধান উপদেষ্টার চীন সফর নিয়ে আপনার মূল্যায়ন কী?
ড. মাহবুব উল্লাহ : অধ্যাপক ড. ইউনূস নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্য জগতে অত্যন্ত সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। সেখানে তাকে সম্মানিত ব্যক্তি হিসাবে দেখা হয়। এজন্য বিভিন্ন সরকার তাকে বিভিন্নভাবে সম্মানে ভূষিত করেছে, পদক দিয়েছে। এর অর্থ এ নয়-তিনি চীনে সম্মানিত ব্যক্তি নন। বরং সেখানেও তিনি বেশ সমাদৃত। তিনি প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার আগে চীনের অনেক স্থানে তার ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থাটি প্রয়োগ করা হয়েছে। তিনি কয়েকবার চীন সফর করেছেন। কাজেই চীনা নেতৃত্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক আছে। তো এ ধরনের বড় মাপের মানুষগুলো শেষ পর্যন্ত সব ধরনের মানুষের কাছেই গ্রহণযোগ্য হন নিজের গুণে। এখানে এ সফর নিয়ে নেতিবাচক যেসব প্রচারণা যারা করছে, তারা আসলে এ মুহূর্তে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের অবনতির পরিস্থিতি থেকে ভারতকে কিছু সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার জন্য এ ধরনের কথাগুলো বলছে। তিনি চীনের কাছে গ্রহণযোগ্য না হলে চীনের প্রেসিডেন্ট কেন তার ব্যক্তিগত বিমান তার জন্য পাঠাবেন? ইতিহাসে এ রকম নজির কি আর দ্বিতীয়টি আছে? এর আগেও বাংলাদেশে অনেক রাষ্ট্রপতি ছিলেন, প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তাদের জন্য তো এ ব্যবস্থা করা হয়নি। দেখা যাচ্ছে, চীন খুবই আগ্রহী বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য।
যুগান্তর : ভারত ও চীন, এ দুদেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
ড. মাহবুব উল্লাহ : চীন ও ভারত আমাদের দুই প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুটিই বিশাল প্রতিবেশী। দুটি বহুল জনসংখ্যার দেশ। কিন্তু দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্কের অনেক ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে সীমান্ত নিয়ে। এছাড়াও আন্তর্জাতিক ছোট ছোট অনেক বিষয় নিয়েও তাদের মধ্যে বিরোধ রয়েছে। ভারত একটু ভিন্নদৃষ্টিতে তাইওয়ানকে দেখতে শুরু করেছে। এটাও চীনের জন্য অস্বস্তিকর। তবে চীনকে বাদ দিয়ে ভারত যেমন চলতে পারবে না, আবার ভারতকে বাদ দিয়েও চীন চলতে পারবে না। কারণ দুদেশের মধ্যে বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে। এ সম্পর্ক এড়িয়ে যাওয়াও কিন্তু সম্ভব নয়। তবে ভারত যেটা চাইবে বা চায়, আমরা (বাংলাদেশ) যেন চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ না হয়ে ভারতের তাঁবেদারিতে থাকি। আমি এখানে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ শব্দটি ব্যবহার করলাম না। কিন্তু এটা তো স্বাধীন জাতি হিসাবে আমাদের কাম্য নয়। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক তো নতুন নয়। ১৯৭৬ সালে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর দুদেশের এ সম্পর্কের ৫০ বছর উদ্যাপন হতে যাচ্ছে। সে হিসাবে এবারের চীন সফর দুদেশের সম্পর্কের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ নিঃসন্দেহে এ সম্পর্কে এড়িয়ে যেতে পারে না। এটিকে অবহেলা করতে পারে না। বরং এটিকে গুরুত্ব দিতে হবে। চীনের সঙ্গেও আমাদের বহুমাত্রিক সম্পর্ক রয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত অস্ত্রের ৭০ শতাংশই আসে চীন থেকে। তাছাড়া চীনের সঙ্গে আমাদের বিশাল বাণিজ্য সম্পর্ক রয়েছে, যদিও এটি ঘাটতি বাণিজ্য। তৎসত্ত্বেও দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে এ বাণিজ্য অপরিহার্য। এসব বিষয় বিবেচনা করে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আরও গভীর হবে, এটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা। এ বিষয়ে ভারত অসন্তুষ্ট হলো কি না, এটি বাংলাদেশের দেখার বিষয় নয়। কারণ, জাতি হিসাবে আমরা স্বাধীন জাতি, এক্ষেত্রে ভারত যদি আমাদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখতে চায়, আমরাও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখব। এর মানে এ নয় যে, একজনের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো রাখতে গিয়ে অন্যজনের সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট করব। আমরা কারও সঙ্গেই সম্পর্ক নষ্ট করতে চাই না। আমরা সেই সম্পর্ককে স্বাগত জানাই, যে সম্পর্ক জাতীয় স্বার্থে উপযোগী।
আপনারা নিশ্চয় জানেন, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের জন্য চীনের প্রেসিডেন্টের ব্যক্তিগত উড়োজাহাজ ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ সফরে তিনি বাণিজ্যিক-অর্থনৈতিক অনেক সম্মেলনে ভাষণও দেবেন। তারপর প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দুদেশের পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হবে। যদিও পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, শুধু কিছু সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়া ছাড়া অতিরিক্ত তিনি কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। কিন্তু আমি মনে করি, সমঝোতা স্মারকের বাইরে আরও দু-একটা বিষয়ে চুক্তি হওয়া খুবই প্রয়োজন। বিশেষ করে বাংলাদেশের নিরাপত্তা প্রশ্নে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্মানসূচক ডক্টর অব ল উপাধি দেওয়া হবে। সবদিক থেকে চীনের পক্ষ থেকে ইউনূসকে উষ্ণ আমন্ত্রণ বা অভ্যর্থনা জানানো হবে। চীনের রাষ্ট্রদূত বারবার বলছেন, এ সফরের মাধ্যমে দুদেশের সম্পর্কে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া হবে। আমরাও আশা করব, দুই দেশের সম্পর্ক উত্তরোত্তর আরও গভীর হবে।
যুগান্তর : চীনের সঙ্গে যদি বাংলাদেশের সম্পর্ক গভীর হয়, সেক্ষেত্রে ভারতের এত মাথাব্যথা কেন?
ড. মাহবুব উল্লাহ : দেখুন, এটি তো অনেক পুরোনো ব্যাপার। ১৯৬২ সালে সীমান্ত যুদ্ধ হওয়ার পর থেকে দুটি দেশের সম্পর্ক বলতে গেলে মসৃণ নয়। সেই সম্পর্কের ভেতরে অনেক বিরোধ লুকিয়ে আছে, বিশেষ করে সীমান্ত জমি নিয়ে। এছাড়া আদর্শগত পার্থক্য রয়েছে। কাজেই ভারত মনে করে, চীনের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সম্পর্ক যদি বৃদ্ধি পায়, ভারতের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ বিষয়টি সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। কারণ হলো, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে ভারতের ‘চিকেন নেক’ পথটি রয়েছে। ভারত এটি নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়ে। তখন ভারত মনে করে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের যদি সম্পর্ক গভীর হয়, তাহলে এ চিকেন নেক ভারতের হাতছাড়া হয়ে যেতে পারে বা হুমকির মুখে পড়তে পারে। বাংলাদেশ হয়তো চিকেন নেক প্রশ্নে চীনের আহ্বানে সাড়া দিতে পারে, এ ধরনের একটি মাথাব্যথা ভারতের মধ্যে আছে। তাছাড়া সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, ভারতের মনটা খুবই ছোট। এরা বড় মাপে বা বড় মনে কোনো কিছু চিন্তা করতে পারে না। পারে না বলেই পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। পতিত শেখ হাসিনার আমলে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের যে ‘স্বামী-স্ত্রী’ সম্পর্ক ছিল, এটি বর্তমানে নেই, কারণ আমরা এমন সম্পর্ক পেছনে ফেলে আগামী দিনে সমতার ভিত্তিতে, ন্যায্যতার ভিত্তিতে, বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে চাই। এ চেষ্টা নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হবে না। আমার মনে হয়, বিশ্ব শক্তিধর দেশগুলোর মধ্যে যে আন্তঃসম্পর্ক, সে আন্তঃসম্পর্কের নতুন বিন্যাস ঘটবে। এ বিষয়টি নিয়ে আমি এখনই আজ বিস্তারিত কিছু বলতে চাচ্ছি না, তবে আমি কিছুটা হলেও উপলব্ধি করতে পারি, সেই আন্তঃসম্পর্কটি হবে আমেরিকাকেন্দ্রিক। আমেরিকাকে প্রতিপক্ষ বা শত্রু হিসাবে চিহ্নিত করে অন্যরা একত্রিত হওয়ার চেষ্টা করবে। সেই ঐক্যবদ্ধ হওয়ার চেষ্টার মধ্য দিয়ে চীন ও ভারতের সম্পর্কের স্বাভাবিকতা ফিরে আসতে পারে। তবে খুব সহজেও নয়, নিকট ভবিষ্যতেও নয়।
যুগান্তর : বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে আপনার বিশ্লেষণ কী?
ড. মাহবুব উল্লাহ : যে কোনো রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ হচ্ছে সেনাবাহিনী। বিশেষ করে যুদ্ধের সময় জাতীয় দুর্যোগের সময় সেনাবাহিনীর অবস্থান এবং ভূমিকা প্রাধান্যে চলে আসে। বর্তমানে বাংলাদেশে যে সরকারটি আছে, এটি হচ্ছে একটি অন্তর্বর্তী সরকার। এ সরকার বৈধতা অর্জন করেছে, জুলাই-আগস্টের বিশাল গণ-অভ্যুত্থান থেকে। এ সরকার ভোটে নির্বাচিত সরকার নয়। কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনিত করে গঠিত হয়েছে এ সরকার। সুতরাং, যে কোনো বিচারেই আমরা যাই না কেন, যে কোনো বিশ্লেষণই আমরা করি না কেন, এ সরকারটি একটা বৈধ সরকার। তবে সরকারি বলতে আমরা কয়েকজন ব্যক্তির সমষ্টিকে দেখি। যার কেন্দ্রে রয়েছেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তারা এককভাবে দেশ চালাতে পারেন না। তাদের জন্য সহায়তাকারী শক্তির প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে আমরা সামরিক বাহিনী, পুলিশবাহিনী, আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, গোয়েন্দা সংস্থা, এমনকি কারাগারের কথাও বলতে পারি। এসব মিলেই হচ্ছে রাষ্ট্রযন্ত্র এবং যখন দেশে নির্বাচিত সরকার থাকে না এবং এ ধরনের সরকার থাকে, তখন দেখা যায়, রাষ্ট্রযন্ত্রের কিছু অঙ্গ রয়েছে, যে অঙ্গগুলো কখনো কখনো মনে হয়, তারা পর্দার পেছন থেকে পর্দার সামনে চলে আসছে। আর যেহেতু একটা অন্তর্বর্তী সময়, সামনে নির্বাচন হবে এবং একটা ক্রান্তিকাল চলছে দেশে, দেশ কোন পথে এগোবে, সেটা নিয়ে নানা চিন্তাচেতনা চলছে, নানারকম অনুশীলন চলছে, সেই অবস্থায় স্বাভাবিকভাবে রাষ্ট্রের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলো থেকে, বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে কিছু না কিছু প্রতিক্রিয়া বা কিছু না কিছু পরামর্শ আসতেই পারে। কারণ, এ মুহূর্তে পুলিশ পর্যুদস্ত অবস্থায় আছে। সেই অবস্থায় সেনাবাহিনীকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। এখন আপনি যে প্রশ্নটা করেছেন, একটা ঘোলাটে পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে। যতটা না ঘোলাটে পরিবেশ দেশে বিরাজ করছে, তার চেয়ে বেশি ঘোলাটে করা হচ্ছে মিডিয়ার মাধ্যমে। মিডিয়া পরিস্থিতিটাকে ঘোলাটে করে তুলছে এবং এখন যেহেতু সবকিছুই খোলামেলা, মানুষ প্রকাশ্যে কথা বলে, গোপন কথা লুকিয়ে রাখে না, যার যা চিন্তা, যার মনে যা আসে তাই বলে, সেহেতু মনে হচ্ছে, দেশে মনে হয় একটা বিরাট গোলযোগপূর্ণ অবস্থা, বিভ্রান্তিকর অবস্থা বিরাজ করছে। তা আমার মনে হয়, এরকম বিভ্রান্তিকর অবস্থা আসলে নেই এবং সামরিক বাহিনীও এ দেশের রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করার মতো পরিস্থিতিতে নেই এবং তারা কোনোরকম হস্তক্ষেপ করবে বলে আমার মনে হয় না। কাজেই জরুরি অবস্থা জারি বা সামরিক শাসন জারি ইত্যাদি নিয়ে আশপাশে যে আলাপ চলছে, এগুলোর ভিত্তি নেই।
যুগান্তর : আগামী নির্বাচন নিয়ে কি কোনো বাধা আছে বলে মনে করেন?
ড. মাহবুব উল্লাহ : না, নির্বাচন হওয়ার জন্য বাধা সেভাবে নেই। তবে নির্বাচনের যে প্রস্তুতি, সেই প্রস্তুতির ঘাটতি কিন্তু এখনো আছে। নির্বাচন যেমন একটা বিশাল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একই সঙ্গে নির্বাচন একটা বিশাল প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও। একটা নির্বাচন পরিচালনা করতে ডেপুটি কমিশনারদের সহায়তা লাগে, অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সহায়তা লাগে এবং শতসহস্র পোলিং অফিসার, প্রিসাইডিং অফিসার নিয়োগ দিতে হয়। পুলিশ বাহিনীর একটা বিরাট সহযোগিতা লাগে। এ মুহূর্তে বাংলাদেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে। ৫ আগস্ট পর্যন্ত তারা যে ধরনের কাজকর্ম করেছে, তার ফলে তাদের সঙ্গে যে জনবিচ্ছিন্নতা সৃষ্টি হয়েছে, এখন আর তারা বলিষ্ঠতা নিয়ে দায়িত্ব পালনে সাহসী হচ্ছে না। আমার কাছে মনে হয়, নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে একটা এটা বড় রকমের বাধা। আর দ্বিতীয়ত, আমার ধারণা, নির্বাচন নিয়ে যে ধরনের বিতর্কগুলো চলছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে কারও কারও মতে, নির্বাচন আগে হওয়া ভালো, কেউ বলছে, একটু সংস্কার করে নির্বাচন হবে ইত্যাদি। এটা কারও নিজের ইচ্ছার ওপর হবে না। আমার ধারণা, বাংলাদেশের পরিচিতি এমনভাবেই গড়াবে, মোটামুটি সবার সন্তোষজনক সময়ে নির্বাচন হবে। রাজনৈতিক গতিশীলতা এভাবেই হয়। দেশের বিভিন্ন সমস্যার ক্ষেত্রে আমাদের একতা থাকা দরকার।
যুগান্তর : আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। এ বিষয়ে আপনার মন্তব্য কী?
ড. মাহবুব উল্লাহ : কথা পরিষ্কার, ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কবর রচিত হয়েছে। আগামী দিনে তাদের রাজনীতির কবর রচিত হতে হবে। আওয়ামী লীগ পরাস্ত হয়েছে, তবে পিছু হটেনি। এখনো তারা নানা গোলযোগ তৈরির চেষ্টা করছে, দেশের শান্তিশৃঙ্খলা বিনষ্ট করার চেষ্টা করছে, বিভিন্নভাবে গুজব ছড়ানোর চেষ্টা করছে। ফলে আওয়ামী চরিত্র বদল হবে বিশ্বাস করতে পারি না। তাদের চরিত্র বদল যে হবে না, তার বড় সাক্ষ্য হলো, আওয়ামী লীগ জুলাই অভ্যুত্থানে এত লোককে হত্যা করল, এত মানুষকে গুম করার জন্য, লাখ লাখ রাজনৈতিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেওয়ার জন্য, এত মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তোলার জন্য, আয়নাঘর তৈরি করার জন্য, শত শত অপরাধের জন্য এখন পর্যন্ত তাদের ভেতরে কোনো অনুশোচনা কিংবা অনুতাপ অথবা ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা তৈরি হয়নি। কাজেই এত অপরাধের পর তাদের জন্য কোনো সুবিবেচনা করতে কেউ পারে? পারে না। আগে তাদের বিচার হোক, যারা সুনির্দিষ্ট অপরাধী, তাদের শনাক্ত করা হোক, তারপর দেখা যাবে তারা কী করবে না করবে এবং তাদের দলের ব্যাপারে কী করা হবে।
যুগান্তর : অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ ৭ থেকে ৮ মাস হতে চলল, এ সময়ের মধ্যে তাদের কোনো সাফল্য আপনি দেখতে পাচ্ছেন?
ড. মাহবুব উল্লাহ : অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় সাফল্য পররাষ্ট্রনীতিতে। রোহিঙ্গা ইস্যুতে একটি বড় সাফল্য। আপনারা খেয়াল করেছেন কি না জানি না, আটলান্টিক কমান্ডের একজন লেফটেন্যান্ট জেনারেল ঢাকা এসেছেন, এটি তো অভূতপূর্ব একটি সাফল্য। কারণ এর সঙ্গে আরাকানের ব্যাপারটা জড়িত রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, বেশকিছু রোহিঙ্গাকে তাদের বাসস্থানে ফেরত পাঠানোর ক্ষেত্রে সুযোগ তৈরি হতে পারে। তারপর জাতিসংঘ যে রিপোর্টটি বাংলাদেশকে জমা দিয়েছে, এ সরকারের ওপর আস্থা না থাকলে এটি হতো না। বিশেষ করে গণহত্যার বিষয়ে। কাজেই সবদিক বিবেচনা করে বলা যেতে পারে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে এ সরকারের বিরাট সাফল্য রয়েছে। দেশের অভ্যন্তরে কিছুটা সাফল্য না থাকলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলের এ সাফল্য সম্ভব হতো না।
যুগান্তর : প্রতিদিন রাজধানীতে ডজনখানেক আন্দোলন হতে দেখা যাচ্ছে। অন্তর্বর্তী সরকারকে বিভ্রান্ত করতেই কি আসলে এ ধরনের আন্দোলন হচ্ছে?
ড. মাহবুব উল্লাহ : সাড়ে ১৫ বছর তাদের এ দাবিদাওয়া কোথায় ছিল? হাসিনা যখন ছিল, তখন তারা রাস্তায় নামেনি কেন? এখন সবাইকে মিছিল, মানববন্ধন, আন্দোলন, মিটিং করার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা পাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এ সুযোগে সবাই হয়তো ভাবছে আমার দাবিদাওয়াগুলো আদায় করে নিই। এটি একটি কারণ।
অপরদিকে সরকারকেও খড়্গহস্ত দেখাচ্ছে না, সরকার হয়তো ভাবছে, সাধারণ মানুষের দাবিদাওয়াগুলোর প্রতি কঠোর মনোভাবটা না দেখানো উত্তম। এ অবস্থার মধ্যে দেশটা আছে। তবে নিঃসন্দেহে এসব আন্দোলন দেশের অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে, সাধারণ মানুষের চলাচলে বিঘ্নিত হচ্ছে, মানুষের সময় নষ্ট হচ্ছে। এসব আন্দোলনের পেছনেও আওয়ামী লীগের ইন্ধন থাকতে পারে, এটি অস্বীকার করা যাবে না। কিছু কিছু আন্দোলন আছে, প্রকৃত অর্থেই তারা বৈষম্যের শিকার আর কিছু তো অবশ্যই ইন্ধন আছে। যাহোক, দেশকে এগিয়ে যেতে হবে। একটি বিষয় অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে, অতি গণতন্ত্র ভালো নয়, আবার অতি গণতন্ত্রহীনতাও ভালো নয়। আমাদের মধ্যমপন্থা অবলম্বন করতে হবে। আমরা সুস্থভাবে বেঁচে থাকতে পারি, সমাজ পরিচালনা করতে পারি, মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহমর্মিতা বজায় রাখতে পারি এবং দেশে শান্তিপূর্ণ একটা অবস্থা রাখতে পারি-এদিকে বিশ্বের দৃষ্টি দিতে হবে।