
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১০:২৪ এএম

ড. মো. আবদুল লতিফ ও শিরিন সুলতানা
প্রকাশ: ২৬ জানুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্ব রাজনীতিতে আবারও ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তনের আলোচনায় সরগরম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্ব। ২০ জানুয়ারি ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বাজারগুলো ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির একটি নতুন তরঙ্গের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে। অভিবাসন থেকে বাণিজ্য সব ক্ষেত্রেই তিনি এসেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটানোর ঘোষণা নিয়ে। তার ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ দর্শন যে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিই নয়, বরং বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের গতিপ্রকৃতিতে নতুন যুগের সূচনা ঘটাতে পারে, সেই পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে এখন থেকেই। যেহেতু অর্থনৈতিক স্বার্থ ও ভূ-রাজনৈতিক (জিওপলিটিক্স) বন্দোবস্ত একে অপরের পরিপূরক, তাই ট্রাম্প ২.০ পর্বে সাপ্লাই চেইন পুনর্বিন্যাসের সম্ভাব্য দিক ও পরিণতি বিশ্ব বাণিজ্যের মানচিত্রকে আমূল বদলে দিতে পারে। এ নিবন্ধে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন ও সাপ্লাই চেইন নেটওয়ার্কের ওপর ডোনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য বাণিজ্য শুল্কের প্রভাব অন্বেষণসহ বৈশ্বিক নয়া সাপ্লাই চেইনে বিনিয়োগ সম্ভাবনার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে।
ট্রাম্প ২.০-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শননির্ভর নীতি কাঠামো পর্যালোচনা
ট্রাম্প ২.০-এর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দর্শননির্ভর নীতি কাঠামোর এ পর্যালোচনায় প্রথমে তার মৌলিক আদর্শকে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, নীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত নিরাপত্তা ও কঠোর অভিবাসন আইন, যার মাধ্যমে তিনি আমেরিকার জাতীয় স্বার্থকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করবেন। মূল্যবোধের পুনঃসংজ্ঞায়ন করতে বিশ্বায়নকে মূলত মার্কিন কর্মসংস্থান কমিয়ে দেওয়ার কারণ হিসাবে দেখানো হতে পারে। এর ফলে দেশীয় উৎপাদন ও শ্রমশক্তি পুনর্গঠনের মাধ্যমে এক ধরনের অভ্যন্তরীণ ‘ইকোনমিক ন্যাশনালিজম’ চাঙা করা হতে পারে। এ ধরনের নীতির প্রভাবে পুরোনো মিত্র ইউরোপ বা জাপানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কাঠামোগত সম্পর্ক বজায় রাখা হলেও চীন ও রাশিয়ার মতো শক্তির সঙ্গে বৈরী ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান জোরদার হতে পারে।
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে অতীতের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা এবং নির্বাচনি সমর্থকদের অগ্রাধিকারকে গুরুত্ব দিয়ে মার্কিন উৎপাদন খাতকে সুরক্ষামূলক বাণিজ্যনীতি, করছাড় এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ সহায়ক পদক্ষেপের ওপর জোর দেওয়ার সম্ভাবনা উঠে আসে। আমেরিকান উদ্ভাবন ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করতে সরকারি-বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টে (R&D) বিনিয়োগে বিশেষ ভর্তুকি বা করছাড়ের ব্যবস্থা করা হতে পারে। স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালিত গাড়ি, বায়োটেক, উদীয়মান প্রযুক্তি, এমনকি এআই খাতে ব্যাপক বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হতে পারে। অভ্যন্তরীণ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে ও সৃজনকৃত কর্মসংস্থানের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে ট্রাম্পের করনীতি, অভিবাসন সীমিতকরণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বিকাশে আর্থিক ও পরিবেশ খাতে নিয়ন্ত্রণ কমানো হতে পারে। তার প্রশাসন আমেরিকান কোম্পানি ও শ্রমবাজারকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে উচ্চ শুল্কারোপ বা শুল্ক বৃদ্ধি করে বিদেশি প্রতিযোগীদের জন্য মার্কিন বাজারে প্রবেশের পথে বাধা সৃষ্টির চেষ্টা করতে পারে। সম্ভাব্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তিতে উচ্চ শুল্কের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশে কড়াকড়ি শর্ত আরোপ করা হতে পারে। এছাড়া, উচ্চ শুল্ক আর বাণিজ্য চুক্তি পুনঃআলোচনার মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানি ও দেশগুলোর ওপর চাপ বাড়িয়ে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা গ্রহণ করা হতে পারে। এসব পদক্ষেপের লক্ষ্য হলো যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানিকে দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধিতে উৎসাহিত করা এবং ভোক্তাদের মধ্যে ‘দেশি পণ্য ক্রয়ে’র মনোভাব গড়ে তোলা।
ট্রাম্প ২.০-এ বাণিজ্যযুদ্ধ ও কৌশলগত বিবাদ আরও বাড়তে পারে বলে অনেক বিশেষজ্ঞ আশঙ্কা করছেন। বড় অর্থনীতির দেশগুলো থেকে সাপ্লাই চেইন সরিয়ে আনতে বা নতুন কাউকে শক্তিশালী করতে যেসব পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে, তার ফলাফল হবে গভীর ও বহুমাত্রিক।
বাণিজ্য ঘাটতি, শুল্কযুদ্ধ ও আঞ্চলিক ভারসাম্য রক্ষায় বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনের পুনর্বিন্যাস
৭ জানুয়ারি প্রকাশিত মার্কিন ব্যুরো অব ইকোনমিক অ্যানালাইসিস এবং মার্কিন সেন্সাস ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, ২০২৪ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মাসিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পেয়েছে। রপ্তানির চেয়ে আমদানি বেশি হওয়ায় নভেম্বর, ২০২৪-এ পণ্য ঘাটতি ৫.৪ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ১০৩.৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক আয় বৃদ্ধি না পাওয়ায় এবং পণ্যের ক্ষেত্রে বড় আকারের ঘাটতি থাকায় ২০২৪ সালের তৃতীয় প্রান্তিকে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য এবং আয়ের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের চলতি হিসাবের ঘাটতি ৩৫.৯ বিলিয়ন ডলার (১৩.১ শতাংশ) বেড়ে ৩১০.৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।
এছাড়া, অফিস অব দ্য ইউনাইটেড স্টেটস ট্রেড রিপ্রেজেন্টেটিভের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৭.০ ট্রিলিয়ন ডলারেরও বেশি পণ্য ও পরিষেবা রপ্তানি ও আমদানি করে চীনের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য দেশ এবং বিশ্বের বৃহত্তম পণ্য আমদানিকারকের স্থান দখল করে। ২০২২ সালে সারা বিশ্ব থেকে মার্কিন পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ৩.২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং চীন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পণ্যের শীর্ষ সরবরাহকারী, যা মোট পণ্য আমদানির ১৬.৫ শতাংশ। ২০২২ সালে মার্কিন পণ্য আমদানির শীর্ষ পাঁচ সরবরাহকারী হলো, চীন (৫৩৬.৩ বিলিয়ন ডলার), মেক্সিকো (৪৫৪.৮ বিলিয়ন ডলার), কানাডা (৪৩৬.৬ বিলিয়ন ডলার), জাপান (১৪৮.১ বিলিয়ন ডলার) এবং জার্মানি (১৪৬.৬ বিলিয়ন ডলার), যাদের কাছ থেকে দেশটি অধিকাংশ পণ্য আমদানি করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আমদানিকৃত পণ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে অপরিশোধিত পেট্রোলিয়াম, গাড়ি, সম্প্রচার সরঞ্জাম, কম্পিউটার এবং প্যাকেজজাত ওষুধ, যা মূলত এসব দেশ থেকে আসে। ২০২২ সালে আমেরিকা ও চীনের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ আনুমানিক ৬৯০.৬ বিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র আমদানি করে ৫৩৬.৮ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, রপ্তানি করে ১৫৩.৮ বিলিয়ন ডলার; ফলে প্রায় ৩৮৩ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য ঘাটতি তৈরি হয়। উল্লেখ্য, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক আয় বৃদ্ধি এবং পণ্যের ক্ষেত্রে বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাসে ট্রাম্প ১.০ মেয়াদে উচ্চ শুল্কারোপ করা হয়েছিল, যা ট্রাম্প ২.০-এ আরও শক্তিশালী মাত্রায় গৃহীত হতে পারে। চীনভিত্তিক সরবরাহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি হ্রাস করতে আবারও বিভিন্ন পণ্যে উচ্চ শুল্ক বসানো হতে পারে। চীন থেকে আমদানি হওয়া পণ্যে ৬০ শতাংশ কিংবা বিশ্ববাজার থেকে আমদানিতে ১০-২০ শতাংশ শুল্কের মতো পরিকল্পনা তার কঠোর অবস্থানের প্রমাণ।
বিশ্ব বাণিজ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা বরাবরই প্রভাবশালী হওয়ায় প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে একক শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখা এবং কৌশলগত প্রযুক্তি যেমন-সেমিকন্ডাক্টর, টেলিকম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ (এআই) গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ক্ষেত্রে চীনের অগ্রগতি ঠেকাতে মার্কিন প্রশাসন আরও কড়া নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। চীনা প্রযুক্তি ব্র্যান্ড হুয়াওয়ের ওপর ট্রাম্প ১.০ মেয়াদে নিষেধাজ্ঞা আরোপের নজির দেখা গেছে। একই ধাঁচে চীনের উদীয়মান বা গুরুত্বপূর্ণ স্টার্টআপ, মোটরগাড়ি, ড্রোন ও বায়োটেক শিল্পেও নিষেধাজ্ঞা প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এতে চীন থেকে আমদানি নিরুৎসাহিত হওয়ার পাশাপাশি প্রযুক্তিসহ কৌশলগত খাতে বিনিয়োগের দিকে বেশি নজর দিতে পারেন ট্রাম্প। চীনের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধ তীব্র হলে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বিকল্প উৎসের সন্ধানে ভিয়েতনাম, ভারত, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা মেক্সিকোর মতো দেশে সাপ্লাই চেইন সরানোর চেষ্টা আরও ব্যাপক হতে পারে। এ স্থানান্তরের গতি কোম্পানিভেদে ভিন্নতর হতে পারে; তবে গার্মেন্টস, ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলি ইত্যাদির মতো শ্রমনির্ভর খাতে সবচেয়ে বেশি পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। ভৌগোলিক নৈকট্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে সহজ প্রবেশাধিকার থাকার কারণে ইতোমধ্যে মেক্সিকোতে আমেরিকান কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগ ব্যাপক পরিমাণে বেড়েছে এবং মেক্সিকো থেকে যুক্তরাষ্ট্র ক্রমবর্ধমান হারে ইলেকট্রনিকস, গাড়ির যন্ত্রাংশ, কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্য আমদানি করে যাচ্ছে। ভিয়েতনামের শ্রমনির্ভর শিল্প যেমন-টেক্সটাইল, ইলেকট্রনিকস অ্যাসেম্বলি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে দ্রুত গুরুত্ব পাচ্ছে। চীননির্ভরতা কমানোর লক্ষ্যে ট্রাম্প প্রশাসন এ ধরনের তুলনামূলক ছোট কিন্তু উদীয়মান অর্থনীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। এছাড়া, জনবহুল ভারতের দ্রুত বর্ধনশীল অভ্যন্তরীণ বাজার, তুলনামূলক সস্তা শ্রমবাজার, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং বিশেষভাবে কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির জন্য বিকল্প উৎপাদন কেন্দ্র হিসাবে দেশটিকে বেছে নেওয়ার আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে পারে।
ন্যাটো জোটের সম্প্রসারণ ও ভূ-রাজনৈতিক বিবেচনায় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর ইউরোপের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় আমেরিকান প্রভাব আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হওয়ায় বাণিজ্য ক্ষেত্রে ট্রাম্প ২.০ মেয়াদে এ সুযোগ কাজে লাগানো হতে পারে। প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপকে বড় অঙ্কের ব্যয় করতে চাপ দেওয়া হতে পারে এবং বাণিজ্য চুক্তিতে দাবি-দাওয়ার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ব্রেক্সিট-পরবর্তী যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে ট্রাম্পের সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক কিংবা নতুন কোনো চুক্তির চাপ এলে যুক্তরাজ্যকে আবারও কঠিন সমীকরণে পড়তে হতে পারে।
মার্কিন কৃষক, কৃষি ব্যবসার সুবিধার্থে উত্তর আমেরিকার খাদ্য ও কৃষি বাণিজ্যকে আধুনিকীকরণ এবং শক্তিশালী করা, মার্কিন বুদ্ধিভিত্তিক পরিষেবাকে সুরক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মার্কিন পরিষেবা বাণিজ্যের সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ট্রাম্প ১.০ মেয়াদে উত্তর আমেরিকা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তিকে (NAFTA) যুক্তরাষ্ট্র-মেক্সিকো-কানাডা চুক্তিতে (USMCA) রূপান্তরিত করা হয়েছিল, ট্রাম্প ২.০ মেয়াদে এ ধরনের আঞ্চলিক চুক্তিকে আরও একবার সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে পুনর্বিন্যাসের চেষ্টা করা হতে পারে।
বৈশ্বিক নয়া সাপ্লাই চেইনে বিনিয়োগ সম্ভাবনা
ট্রাম্পের ২.০ প্রশাসনের নবায়নকৃত শুল্ক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পণ্য সরবরাহকারীদের পণ্যের মূল্য নিশ্চিতভাবে বাড়িয়ে দেবে। এতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা অথবা নতুন সরবরাহকারী সৃষ্টি হতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী সোর্সিংয়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসতে পারে। চীনের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে সার্কিট, সেমিকন্ডাক্টর, আইটি সাপ্লাই চেইনে যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে নতুন বিনিয়োগের উদ্যোগ গ্রহণ করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র গ্লোবাল সার্ভার, ক্লাউড সেবা, সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদিতে এখনো শীর্ষস্থান ধরে রাখলেও ক্লাউড হার্ডওয়্যার ও নেটওয়ার্ক যন্ত্রাংশের উৎপাদনে বাংলাদেশ, ভিয়েতনাম কিংবা অন্যান্য দেশে দ্রুত অ্যাসেম্বলি স্থাপন ও বিনিয়োগের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, কৌশলগত পণ্য ও যন্ত্রাংশের সাপ্লাই চেইন সুরক্ষায় সার্বক্ষণিক উৎপাদন-সহযোগিতা নিশ্চিতকরণে উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসাবে গণ্য করে এর সাপ্লাই চেইনকে ঝুঁকিমুক্ত করার প্রচেষ্টায় ফার্মাসিউটিক্যাল চেইনের ভ্যাকসিন, ওষুধ, জীবপ্রযুক্তি ও জিনোম গবেষণায় বিনিয়োগ করা হতে পারে। ওষুধের কাঁচামাল, পিপিই এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় মেডিকেল সরঞ্জামের ক্ষেত্রে ভারত, ভিয়েতনাম বা লাতিন আমেরিকার দেশগুলোকে উৎস হিসাবে ব্যবহারের প্রবণতা বাড়তে পারে। বৈদ্যুতিক গাড়ি ও স্বয়ংক্রিয় গাড়ির বাজার বিশ্বে দ্রুত বাড়ায় এ খাতসহ এর অত্যাবশ্যক যন্ত্রাংশ (যেমন-ব্যাটারি সেল, রেয়ার আর্থ মিনারেলস ইত্যাদি) উৎপাদনে করছাড় প্রদানের মাধ্যমে বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সহায়তা করা হতে পারে। ট্রাম্প ২.০ মেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির পক্ষে নমনীয় নীতি গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ‘দেশীয় উৎপাদন’ নিশ্চিত করতে একইসঙ্গে আমেরিকান কোম্পানিগুলোকে Wind, Solar, HVAC, Hydro ইত্যাদিতে নির্দিষ্টভাবে উৎসাহ দেওয়া হতে পারে।
পরিশেষে, ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পণ্যের কাঁচামাল থেকে চূড়ান্ত যন্ত্রপাতি উৎপাদন অর্থাৎ সম্পূর্ণ সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা মার্কিন সরকারের নীতিতে প্রতিফলিত হতে পারে, যা বৈশ্বিক অর্থনীতির গতি-প্রকৃতিকে বহুভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একদিকে নিষেধাজ্ঞা বা শুল্ক যুদ্ধের দ্বারা সাপ্লাই চেইনগুলো সংক্ষিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে বিকল্প বাজারে বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় নতুন সমীকরণ সৃষ্টি হতে পারে, যাতে নতুন সম্ভাবনার দ্বারও উন্মোচন হবে বলে আশা করা যেতে পারে। এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সর্বদাই নিবিড় পর্যবেক্ষণ, যথাযথ বিশ্লেষণসহ কৌশলী হওয়া প্রয়োজন।
ড. মো. আবদুল লতিফ : অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)
শিরিন সুলতানা : গবেষণা সহযোগী, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট (বিআইজিএম)