
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:২২ পিএম
কিডনির চিকিৎসাব্যয় কমানো প্রয়োজন

ড. আবু জাফর সাদেক
প্রকাশ: ১৩ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রতীকী ছবি
আরও পড়ুন
আজ ১৩ মার্চ বিশ্ব কিডনি দিবস। কিডনি স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি ও কিডনি রোগের ভয়াবহতা কমানোর লক্ষ্যে ২০০৬ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী এ দিবস পালিত হয়ে আসছে। বিশ্ব কিডনি দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য : ‘আপনার কিডনি কি সুস্থ? দ্রুত শনাক্ত করুন ও কিডনির স্বাস্থ্য সুরক্ষা করুন’।
ইন্টারন্যাশনাল সোসাইটি অব নেফ্রোলজির তথ্যমতে, বর্তমানে সারা বিশ্বে বিভিন্ন পর্যায়ের কিডনি রোগীর সংখ্যা প্রায় ৮৫ কোটি, যা মোট ডায়াবেটিস রোগীর দ্বিগুণ এবং ক্যানসার রোগীর ২০ গুণেরও বেশি। সাম্প্রতিক সময়ে পৃথিবীতে বয়স্ক মানুষের মৃত্যুর প্রধান কারণ কিডনি রোগ। বিশ্বব্যাপী কিডনি রোগীর হার পুরুষের ক্ষেত্রে ১০.৪ শতাংশ এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ১১.৮ শতাংশ। তবে অপেক্ষাকৃত কম উন্নত বা উন্নয়নশীল দেশে এ হার উভয় ক্ষেত্রেই কিছুটা বেশি।
কিডনি রোগ দীর্ঘস্থায়ী এবং এর চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। এ রোগে অনেক ক্ষেত্রেই নির্দিষ্ট চিকিৎসার বাইরে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিসসহ নানা মাত্রিক ওষুধ খেতে হয়, যার প্রায় প্রতিটিই অত্যন্ত উচ্চমূল্যের। দীর্ঘস্থায়ী কিডনি রোগ ব্যবস্থাপনা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য বড় চাপ। দি ল্যানসেট জার্নালে ২০২৪ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধের তথ্যমতে, উন্নত ও উন্নয়নশীল মিলিয়ে ৩১টি দেশে কিডনি রোগের চিকিৎসা ব্যয় ২০২২ থেকে ২০২৭ সালের মধ্যে ৯.৩ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে, যা বেশ উদ্বেগজনক। উন্নয়নশীল দেশে কিডনি রোগ চিকিৎসার মূল সমস্যা হলো দেরিতে রোগ নির্ণয়, সঠিক মাত্রায় চিকিৎসা ব্যয় নির্বাহ করার অসমর্থতা, ডায়ালাইসিস সেবার অপ্রতুলতা, কিডনি প্রতিস্থাপনের সীমিত সুযোগ ইত্যাদি। এসব দেশে নিয়মিত কিডনি পরীক্ষা না করার কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রে কিডনি রোগ ধরা পড়ে অগ্রসরমান স্তরে, যা নিয়ন্ত্রণ বেশ জটিল। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, প্রাথমিক পর্যায়ে কিডনি রোগের তেমন কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। ফলে রোগী তা অনুমান করতে পারে না, অন্যদিকে যখন উপসর্গ প্রকাশ পায়, তখন তা মারাত্মক রূপ ধারণ করে।
বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যমতে, বাংলাদেশে বিভিন্ন পর্যায়ের কিডনি রোগীর সংখ্যা ৩ কোটিরও বেশি, যা মোট জনসংখ্যার হার বিবেচনায় সমসাময়িক উন্নয়নশীল দেশের চেয়ে বেশি। দি ওপেন ইউরোলজি অ্যান্ড নেফ্রোলজি জার্নালে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর ৪০ হাজারের বেশি মানুষ শেষ স্তরের কিডনি রোগে প্রবেশ করেন, অন্যদিকে বছরে মাত্র ৯ হাজার থেকে ১০ হাজার নতুন রোগীর হেমোডায়ালাইসিস করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা একেবারেই অপ্রতুল।
কিছুদিন আগে বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, দেশে শেষ পর্যায়ে কিডনি বিকল হওয়ার কারণে যত রোগীর ডায়ালাইসিস প্রয়োজন হয়, তার ৯০ শতাংশই এক বা দুবার ডায়ালাইসিস করার পর ব্যয় সামলাতে না পারার কারণে তা আর চালিয়ে যেতে পারে না। এতদসঙ্গে, দেশে কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ একেবারেই হাতেগোনা। অর্থাৎ ডায়ালাইসিস গ্রহণ উপযোগী রোগীর সংখ্যা বাড়ছে হুহু করে।
আশার কথা হলো, অনেক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দেশের প্রায় প্রতিটি বড় বা পুরোনো সরকারি হাসপাতালে কিডনি রোগীদের জন্য ডায়ালাইসিস ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে, এর বাইরেও ব্যক্তিগত চেম্বারে বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠিত হাসপাতালগুলোয় বিশেষজ্ঞদের সেবা নেওয়ার সুযোগ আছে। কিডনি রোগীর বিশাল চিকিৎসাব্যয় ও সংশ্লিষ্ট পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ডায়ালাইসিস-সল্যুশনের আমদানি, উৎপাদন ও বিতরণ পর্যায়ে এবং ইরাইথ্রোপয়েটিন ও সাইক্লোস্পোরিনের শুধু আমদানি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করের শিথিলতা আরোপ করেছে, যা কিডনি রোগীদের কিছুটা স্বস্তি দিলেও প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল।
একজন ডায়ালাইসিস গ্রহণকারী রোগী গড়ে সর্বনিম্ন ৫ থেকে ৭টি ওষুধ নিয়মিত সেবন করেন, যার প্রতিটিই উচ্চমূল্যের এবং জীবনের শেষপর্যায়ে এসে এ ব্যয়নির্বাহ অনেকের পক্ষেই সম্ভবপর হয়ে ওঠে না। তাই ইরাইথ্রোপয়েসিস্ স্টিমুলেটিং এজেন্ট, হাইপোক্সিয়া-ইনডিউসিবল ফ্যাক্টর প্রোলাইল হাইড্রোক্সিলেজ ইনহিবিটর, ফসফেট বাইন্ডার ও ইমুনোসাপ্রেসান্টসহ ডায়ালাইসিসসংশ্লিষ্ট সব ওষুধের আমদানি, উৎপাদন ও বিতরণের প্রতিটি পর্যায়ে মূল্য সংযোজন কর প্রত্যাহার করা গেলে চিকিৎসাব্যয় ন্যূনতম ২০ শতাংশ কমে আসবে।
উপরোল্লোখিতভাবে চিকিৎসাব্যয় কমানো গেলে আর্থিক কারণে ডায়ালাইসিস সেবার বাইরে থাকা অনেক রোগী ডায়ালাইসিসের সুযোগ পাবে, যা কিডনি রোগীর চিকিৎসা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে বিশাল ভূমিকা রাখবে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করি।
ড. আবু জাফর সাদেক : ফার্মাসিস্ট; সাবেক পরামর্শক, বিশ্বব্যাংক, ঢাকা অফিস
azs_sohel@yahoo.com