মারাত্মক ক্ষতিকর এই ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’

ড. এস কে আকরাম আলী
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি সমাজের মানুষকে সহজে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ব্যবহৃত হলেও এটি শান্তি ও স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে মারাত্মক ক্ষতি ডেকে আনে। এ নীতি ছোট বা বড়, যে কোনো গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা যেতে পারে। আমরা ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতের ক্ষেত্রে এর সফল প্রয়োগ দেখেছি, যেখানে ভারতীয় মুসলমানরা ছিল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। ব্রিটিশরাই সম্ভবত বিশ্বের বিভিন্ন উপনিবেশে এ প্রশাসনিক কৌশলটি ব্যবহার করেছিল, যতদূর সম্ভব সমাজকে বিভক্ত রেখে শাসন করা তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল।
আমরা ভারত শাসনের ক্ষেত্রে এ নীতির কার্যকর প্রয়োগ প্রত্যক্ষ করেছি। ব্রিটিশদের বিভাজনের নীতি পুরো একশ নব্বই বছর ধরে সফলভাবে কার্যকর থেকেছে, যার ফলে তারা স্থানীয় জনগণের ওপর অনায়াসে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে পেরেছে। কিন্তু এ নীতির অবসান ঘটে যখন ভারতীয় জনগণ বুঝতে পারে, ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ তাদের জন্য ধ্বংসাত্মক।
ঐতিহাসিকভাবে ভারত ছিল একটি বৃহৎ দেশ, যেখানে প্রধানত হিন্দু ও মুসলমানরা বাস করত। দীর্ঘদিন ধরে তারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে ছিল। মুসলমান শাসনামলেও তারা একই সমাজে ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখে বসবাস করত, বিশেষত মুসলিম শাসনক্ষমতা ধরে রাখার সময় পর্যন্ত। মুসলমানরা একাদশ শতকের শেষদিকে ভারতে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং কয়েকশ বছর সফলভাবে রাজত্ব করে। মুসলিম শাসকরা সাধারণত উদারপন্থি ও ধর্মনিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন। তারা কখনো জোরপূর্বক ধর্মপ্রচার করেননি, বরং সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি সহনশীল মনোভাব দেখিয়েছেন। শাসকশ্রেণি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো বড় ধরনের সমস্যা ছিল না, যতক্ষণ না মুসলমানরা ক্ষমতায় ছিল।
কিন্তু ব্রিটিশরা শাসনের শুরু থেকেই বিভাজনের নীতি অনুসরণ করে। প্রথমে বাংলায় এবং পরে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে তারা এ কৌশল প্রয়োগ করে। তারা সব সময় হিন্দু সম্প্রদায়কে সুবিধা দিয়েছে, অন্যদিকে মুসলমানদের অবহেলিত রেখে গেছে। ফলে বিভাজনের নীতি কার্যকর হয় এবং সমাজে ফাটল সৃষ্টি হয়।
দুঃখজনকভাবে, স্বাধীনতার পর বাংলাদেশেও আমরা এ বিভাজন নীতির শিকার হয়েছি। জনগণ এমন একটি সমাজ চেয়েছিল, যেখানে বৈষম্য ও শোষণ থাকবে না, কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিশ্বের অন্যান্য সমাজের মতো বাংলাদেশেও মধ্যবিত্ত শ্রেণিই সব সময় শাসক শ্রেণির শোষণের শিকার হয়েছে। রাজনৈতিক অভিজাতরা নিজেদের স্বার্থের জন্য মধ্যবিত্তের দুর্ভোগকে কাজে লাগিয়েছে। ফলে সমাজের উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্তের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান তার শাসনকে স্থায়ী করতে জাতিকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ’ নামে দুই ভাগে বিভক্ত করার উদ্যোগ নেন। ফলে জাতীয় ঐক্যের পরিবর্তে সমাজে স্থায়ী বিভেদ সৃষ্টি হয়। ভারত এতে স্বার্থ দেখল এবং বাংলাদেশকে চিরতরে বিভক্ত রাখার জন্য একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করল, যাতে এদেশ কখনো শান্তি ও সমৃদ্ধি উপভোগ করতে না পারে।
শুধু জিয়াউর রহমানই একজন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা হিসাবে ভারতের কৌশল ও উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেছিলেন। ভারত চেয়েছিল বাংলাদেশকে বিভক্ত ও নির্ভরশীল করে রাখতে, যাতে দেশটি উন্নতি না করতে পারে এবং জনগণ চিরদিন অনৈক্যের অভিশাপে ভুগতে থাকে। জিয়াউর রহমান জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে পেরে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ ধারণার মাধ্যমে জাতিকে একত্রিত করার প্রচেষ্টা চালান। প্রথমবারের মতো দেশবাসী একত্রিত হয়ে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করতে শুরু করে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকলেও ২০০৮ পর্যন্ত সমাজে একটি সৌহার্দময় পরিবেশ বজায় ছিল।
কিন্তু শেখ হাসিনা ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় ক্ষমতায় এসে আবারও বিভাজন নীতিকে শক্তিশালীভাবে ফিরিয়ে আনেন। তিনি র-এর পরামর্শে জাতিকে স্থায়ীভাবে বিভক্ত করার জন্য মরিয়া হয়ে কাজ করেন এবং তার বাবার নীতি অনুসরণ করে সমাজকে ‘মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষ’ শিবিরে বিভক্ত করেন। এবার তিনি ভারতের প্রত্যক্ষ সমর্থন নিয়ে একক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার দিকে এগিয়ে যান। ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনা তার ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতিকে স্থায়ী রূপ দিতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। বিশেষ করে, ভারতের নির্দেশে তিনি জামায়াতকে নির্মূল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন এবং এ দলের নেতাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালানো হয়। অনেক শীর্ষ নেতা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হন। একমাত্র পরীক্ষিত জাতীয়তাবাদী শক্তি বিএনপিও সীমাহীন নির্যাতনের শিকার হয়। জিয়াউর রহমানকেও শেখ হাসিনার প্রচারণার শিকার হতে হয়, তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধবিরোধী’ আখ্যা দিতে পর্যন্ত দ্বিধা করেননি তিনি। ভারত জন্মলগ্ন থেকেই বিএনপিকে সন্দেহের চোখে দেখে এবং কখনোই এ জাতীয়তাবাদী শক্তিকে বিশ্বাস করেনি।
কিন্তু সাম্প্রতিক জুলাই বিপ্লব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পরিবর্তন করেছে এবং জনগণের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করেছে। এখন প্রশ্ন হলো, ‘নতুন বাংলাদেশ’ তৈরি করবে কে? ইতিহাস বলে, বিপ্লবের পর একটি বিপ্লবী সরকার গঠিত হয়, যা সমাজে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও এ পরিবর্তন আনার মতো সক্ষম নয়। এখন সংস্কার ও নির্বাচনের আলোচনা শুরু হয়েছে এবং মনে হচ্ছে, প্রয়োজনীয় সংস্কারের পর এ বছরের শেষের দিকে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আপাতদৃষ্টিতে এটি ইতিবাচক মনে হলেও ভারত সুযোগের সন্ধানে আছে এবং বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে প্রবেশের পথ খুঁজছে। বিএনপি ও জামায়াতকে এখন পরিপক্বতার পরিচয় দিতে হবে এবং নিজেদের মধ্যে দোষারোপ বন্ধ করতে হবে। জাতীয় স্বার্থে তারা যেন বিভক্ত না হয়, বরং প্রতিযোগিতামূলক রাজনীতি বজায় রাখে। এ দুই দলের মধ্যে বিভাজন জাতীয় জীবনে চরম বিপর্যয় আনবে।
ভারত গভীরভাবে অপেক্ষা করছে, কখন তারা বাংলাদেশের নির্বাচনি রাজনীতিতে হস্তক্ষেপ করতে পারবে। যদি রাজনৈতিক দলগুলো বিভক্ত থাকে, তবে ভারত সুযোগ নিয়ে ‘ডিভাইড অ্যান্ড অ্যানেক্স’ নীতি প্রয়োগ করবে, যা ব্রিটিশদের পুরোনো ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতির চেয়েও ধ্বংসাত্মক হবে।
শিক্ষার্থীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ অবশ্যই স্বাগত, তবে তাদের ধৈর্য ধরতে হবে। বিদেশি সহায়তা নিয়ে ক্ষমতা দখলের কোনো তড়িঘড়ি চেষ্টা জাতির জন্য শুভ ফল বয়ে আনবে না, বরং ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে। আমাদের জাতিগত আবেগ প্রবল, কিন্তু একই সঙ্গে আমরা সহজেই ভুল করতে পারি। সতর্ক ও বিচক্ষণ না হলে পথভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিভক্তি নয়, জনগণের ঐক্যই পারে জাতিকে এ সংকট থেকে মুক্তি দিতে।
প্রফেসর ড. এস কে আকরাম আলী : রাজনৈতিক বিশ্লেষক