পুরোনো পথে সাম্রাজ্য বিস্তারের ইচ্ছা!

গুইন ডায়ার
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রাচীন সভ্যতায় দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত একটি বিতর্ক চলমান ছিল; প্রশ্ন ছিল, ইতিহাস কি এগোচ্ছে, নাকি শুধু চক্রাকারে ঘুরছে? আরও প্রশ্ন ছিল, এটি কি সরলরেখায় চলছে, নাকি বৃত্তাকারে? কিন্তু সেই বিতর্ক মূলত নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছিল যখন মানুষ তাদের দীর্ঘ অতীত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করল। তারা সিদ্ধান্তে এলো-এটি সরলরেখায় চলছে। এক সময় প্রত্যেক মানুষই ছিল শিকারি-সংগ্রাহক। এখন প্রায় কেউই সে অবস্থানে নেই। বড় দলগুলো ভেঙে যেত বলে এক সময় সমাজে কয়েকশর বেশি মানুষ একসঙ্গে বসবাস করার চিন্তা করত না। এখন মিলিয়ন মিলিয়ন মানুষ একই সমাজে বাসবাস করে। আপনি এটিকে ‘অগ্রগতি’ নাও বলতে পারেন, কিন্তু ইতিহাসের অবশ্যই এর একটা দিকনির্দেশনা রয়েছে। তবে এটাকে পুরোপুরি সরলরৈখিকও বলা যাবে না।
নদী সব সময় নিচের দিকে প্রবাহিত হলেও ঘূর্ণিঝড়ের সময় ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। ইতিহাসের ক্ষেত্রেও মাঝেমধ্যেই এমন ব্যতিক্রমী ঘটনা ঘটে। যুদ্ধের ইতিহাসে ইতোমধ্যে কয়েকবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এখন আবারও তেমন ঘটনা ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কা রয়েছে।
বড় সভ্যতার উত্থানের আগে প্রাগৈতিহাসিককালে ছোট ছোট মানবগোষ্ঠীর মধ্যে অপেক্ষাকৃত কম তীব্রতাসম্পন্ন যুদ্ধ হয়েছে-ঘন ঘন কিন্তু সম্মিলিতভাবে এসব যুদ্ধের ফলাফল খুবই প্রাণঘাতী। নৃতত্ত্ববিদদের ধারণা, প্রতি প্রজন্মে ৩০ শতাংশ পুরুষ (এবং ৫ শতাংশ নারী) যুদ্ধে নিহত হতো। বৃহৎ সমাজের আগমনে বড় আকারে যুদ্ধ সংঘটিত হলেও যুদ্ধের সংখ্যা এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা কমেছে। যখন মোঙ্গলদের মতো যাযাবর জনগোষ্ঠী সভ্য জনপদে আক্রমণ করত, তখন অনেক মানুষ নিহত হতো। কিন্তু ইউরোপের মধ্যযুগীয় যুদ্ধ এবং চীন ও ভারতে এর সমান্তরাল ঘটনাগুলো ১৬০০ সালের আগে তুলনামূলকভাবে কম ছিল। তারপর ইউরোপ উন্মত্ত হয়ে উঠল।
জার্মান ভাষাভাষী অঞ্চলে তিরিশ বছরের যুদ্ধ (১৬১৮-১৬৪৮) প্রধানত ধর্মীয় গৃহযুদ্ধ হিসাবে শুরু হয়েছিল, কিন্তু এটি ভয়াবহ (‘সবাই সবার বিরুদ্ধে’) যুদ্ধ হিসাবে শেষ হয় এবং আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষ মারা যায়-যা ছিল সে সময়ের ইউরোপের জনসংখ্যার প্রায় ১২ শতাংশ এবং এ পরিস্থিতি বেঁচে থাকা ব্যক্তিদের নতুন নিয়ম তৈরি করতে ভয় পাইয়ে দেয়। ১৬০০ সালের মাঝামাঝি থেকে বিদ্যমান দেশগুলো ‘সার্বভৌম’ হয়ে ওঠে এবং পরবর্তী দেড়শ’ বছর পোল্যান্ড ছাড়া কোনো বড় ইউরোপীয় রাষ্ট্র খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত হয়নি। তখন সেনাবাহিনীর আকার ছোট হয়ে আসে এবং পেশাদার হয়ে ওঠে। এ ছাড়া ইউরোপে যুদ্ধ অতিসীমিত হয়ে পড়ে; যা সাধারণ মানুষের জীবনে খুব কম প্রভাব ফেলত।
কিন্তু তারপর এলো ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব এবং এর পরে নেপোলিয়নিক যুদ্ধ, স্বেচ্ছাসেবী বিশাল সেনাবাহিনী, মতাদর্শগত সংঘাত এবং পুরো রাষ্ট্র ভেঙে ফেলা হলো। এমন পরিস্থিতিতে শুরু হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যে যুদ্ধে ১ কোটি ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। সে যুদ্ধে পরাজিত পক্ষের সব শাসক (পাশাপাশি বিজয়ী পক্ষের কিছু) ক্ষমতাচ্যুত হলো।
তারপর শুরু হলো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, যে যুদ্ধে সাড়ে ৪ কোটি মানুষের মৃত্যু হলো এবং শেষে ব্যবহৃত হলো পারমাণবিক অস্ত্র। আবারও পরাজিত পক্ষের সব শাসনব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গেল। আবারও দানবকে বশে আনার চেষ্টা শুরু হলো এবং আশ্চর্যজনকভাবে, এবার সত্যিই তা কাজ করছে বলে মনে হলো।
শেষবার ক্রোধ দমন করতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার পর ৭৯ বছর কেটে গেছে; এবং যুদ্ধে মৃতের সংখ্যা ১৯৪৫ সালে যেখানে প্রতি মাসে ১০ লাখ ছিল; ২০২০-এর দশকের শুরুতে বছরে তা ১ লাখের নিচে নেমে এসেছিল। কিন্তু এখন আবার তা বাড়ছে-সামান্য, হয়তো ২০২৪ সালে ৫ লাখ; কিন্তু এ প্রবণতা উদ্বেগজনক। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, সাম্প্রতিক কয়েক বছরে যুদ্ধ প্রতিরোধ বা সীমিত করার জন্য আমরা যেসব প্রাতিষ্ঠানিক ও অন্যান্য পদক্ষেপ নিয়েছিলাম, তা বাধাগ্রস্ত বা পরিত্যক্ত হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষের ভেটো প্রয়োগে জাতিসংঘ অনেক আগেই দুর্বল হয়ে পড়েছিল, প্রতিষ্ঠানটির দুর্বলতা এখন আরও প্রকট হয়েছে।
১৯৪৫ সালের পরের পুরো (রাষ্ট্রীয়) ব্যবস্থার ভিত্তি ছিল সীমান্তের অখণ্ডতার সুরক্ষা। সে সময়ের পর কোনো সীমান্ত পরিবর্তন যদি জোরপূর্বক করা হয়, তাহলে সেসব বিষয় বাকি পৃথিবী গ্রহণ করবে না। প্রকৃতপক্ষে যে কোনো কারণেই সীমান্ত পরিবর্তনের জন্য বলপ্রয়োগ করা হোক না কেন, তা অবৈধ। শুধু স্বেচ্ছায়, আলোচনার মাধ্যমে এবং কোনোরকম জবরদস্তি ছাড়া পরিবর্তনই গ্রহণযোগ্য। এ নিয়মটি প্রায় সর্বজনীন সমর্থন পেয়েছে। এর মূল কারণ সব প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষ বুঝতে সক্ষম হয়েছে, এভাবেই যুদ্ধের অন্তহীন চক্রের অবসান ঘটানো সম্ভব। কেউই বাধ্য নয় অন্য দেশে গিয়ে আইন ভাঙা বন্ধের জন্য যুদ্ধ করতে। কোনো গোষ্ঠীর এমন বিজয় গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। এমন বিজয় কখনোই বাকি বিশ্বের কাছে স্বীকৃতি পাবে না। তাই তাদের উচিত তেমন ঘটনার সূত্রপাত না ঘটানো। তবে এ নিয়ম এখন সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতা কর্তৃক উপেক্ষিত হচ্ছে। রাশিয়া দাবি করতে পারে, সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘পুরোনো সীমান্ত’ ইউক্রেনকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল এবং চীন অন্তত তাইওয়ানের সঙ্গে জাতিগত সম্পর্ক দাবি করতে পারে; তবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের গ্রিনল্যান্ড, পানামা খাল, কানাডা এবং গাজা দখল-সবচেয়ে কাঁচা ধরনের সাম্রাজ্য বিস্তারের দাবি বলেই মনে হচ্ছে। যদি তিনি এতে সফল হন, তবে এটা হবে আবার পুরোনো অন্ধকারাচ্ছন্ন পথকে স্বাগত জানানো।
ব্যাংকক পোস্ট থেকে ভাষান্তর : মোহাম্মদ কবীর আহমদ
গুইন ডায়ার : ব্রিটিশ-কানাডিয়ান সামরিক ইতিহাসবিদ, সাংবাদিক