Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

নিষিদ্ধ না করে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে

Icon

সাঈদ খান

প্রকাশ: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নিষিদ্ধ না করে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে হবে

প্রতীকী ছবি।

ভলতেয়ার বলেছেন, ‘তোমার মতের সঙ্গে আমি একমত নাও হতে পারি; কিন্তু তোমার মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য আমি আমার জীবন পর্যন্ত উৎসর্গ করে যাব।’ এ উক্তিটি শুধু ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের স্বাধীনতার গুরুত্বকে নয়, বরং সমাজে ভিন্নমতের সম্মান ও মৌলিক অধিকার রক্ষারও পক্ষে দাঁড়ায়।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা একটি সুষ্ঠু ও কার্যকর গণতন্ত্রের প্রধান ভিত্তি। এটি মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর একটি, যা নাগরিকদের নিজেদের চিন্তা, মতামত এবং ধারণা প্রকাশ করার স্বাধীনতা দেয়। এ অধিকার ছাড়া গণতন্ত্র কেবল একটি নামমাত্র ব্যবস্থা হয়ে থেকে যায়। গ্রিক দার্শনিক থেলিস বলেছেন, ‘মানুষের চিন্তাভাবনা তাদের নৈতিকতা এবং কর্মের মধ্যে প্রকাশিত হয়।’ সক্রেটিস স্বাধীন চিন্তা ও প্রশ্ন করার স্বাধীনতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তার এ বক্তব্য থেকে ‘মতপ্রকাশের স্বাধীনতা’ রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য অপরিহার্য, যা গণতন্ত্রের মূলশক্তি হিসাবে প্রতীয়মান হয়। তাই গণতন্ত্রের মূল শক্তি হলো উন্মুক্ত আলোচনা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ না করে আইনসংগতভাবে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেওয়া উচিত।

গণতন্ত্রের মূল ধারণা হলো জনগণের ক্ষমতায়ন। জনগণ যদি তাদের মতামত, চাহিদা বা সমস্যাগুলো প্রকাশ করতে না পারে, তাহলে একটি দেশের শাসনব্যবস্থা কখনোই জনগণের প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারে না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মাধ্যমে জনগণ তাদের সমস্যাগুলো তুলে ধরে শাসকদের কার্যক্রমের সমালোচনা করে এবং প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের দাবি জানায়। প্লেটো রাষ্ট্রপরিচালনায় মতবৈচিত্র্য এবং সংলাপের ওপর গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রে মানুষের বক্তব্য শোনা এবং শ্রদ্ধা করা গুরুত্বপূর্ণ।’

রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক অধিকার লঙ্ঘন করে, কারণ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। দল নিষিদ্ধ মানে ভিন্নমত দমনের পথ তৈরি করা, যা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। নিষিদ্ধ দল বা সংগঠন গোপনে কার্যক্রম চালাতে পারে কিংবা উগ্রপন্থার দিকে ধাবিত হতে পারে, যা রাষ্ট্রের জন্য বিপজ্জনক। উদাহরণস্বরূপ, মিসরে ‘মুসলিম ব্রাদারহুড’ নিষিদ্ধ করার পর সহিংসতার হার বেড়েছিল।

যখন কোনো রাজনৈতিক দল বা ছাত্রসংগঠন নিষিদ্ধ করা হয়, তখন একটি জনগোষ্ঠীর মতপ্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়; ফলে গণতন্ত্রের অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইতিহাসে দেখা যায়, শক্তি প্রয়োগ করে দল দমন করা রাজনৈতিক উত্তেজনা ও সংঘাত বাড়ায়। নিষিদ্ধকরণের ফলে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন একচেটিয়া রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়, যা স্বৈরতন্ত্রের ঝুঁকি বাড়ায়। রুশো বলেছেন, ‘গণতন্ত্র তখনই কার্যকর হয়, যখন জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত থাকে।’ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ক্ষুণ্ন হয়, যা গণতন্ত্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ করার বেশকিছু দৃষ্টান্ত রয়েছে। ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান একদলীয় শাসনব্যবস্থা (বাকশাল) চালু করে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করেন। পরবর্তীকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৭৬ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন করেন। ১৯৯০ সালে গণ-আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচার পতনের পর বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা নতুন করে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করে শেখ হাসিনার সরকার এবং পরে ড. ইউনূস সরকারের আমলে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ হয়।

রাজনৈতিক দল ও সংগঠন নিষিদ্ধ করা সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রটি উন্মুক্ত রাখতে হবে-যাতে সব মত ও পক্ষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়। বরং সুষ্ঠু রাজনৈতিক চর্চার মাধ্যমে সংঘাত এড়ানোই উত্তম পথ হতে পারে।

ফরাসি রাজনৈতিক চিন্তাবিদ অ্যালেক্সি ডি টোকভিল তার বিখ্যাত বই ‘ডেমোক্রেসি ইন আমেরিকা’তে লিখেছেন, ‘গণতন্ত্রে জনগণই প্রভাবিত করে এবং রাজনৈতিক দলগুলো জনগণের আত্মনির্ভরশীলতার প্রতিনিধি। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জনগণের নিজস্ব সংগঠন এবং দলের উপস্থিতি অপরিহার্য।’ এ চিন্তাবিদদের মতামতের মাধ্যমে বোঝা যায়, গণতন্ত্রের প্রকৃত অর্থ রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীনতা ও জনগণের মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত রাখা। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ গণতান্ত্রিক সমাজের শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধানে সরাসরি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার কোনো বিধান নেই, তবে কিছু মৌলিক নীতি রয়েছে, যা রাজনৈতিক দলের কর্মকাণ্ডকে নিয়ন্ত্রণ করে। সংবিধানের ধারা ৩৯ অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং পার্টি পলিটিক্সের অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে, যা রাজনৈতিক দল গঠন ও মতামত প্রকাশের অধিকার প্রদান করে। ধারা ১১ অনুযায়ী, বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নাগরিকদের রাজনৈতিক দল গঠন ও তাদের মতপ্রকাশের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা শুধু অনৈতিক কর্মকাণ্ড বা রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রের ক্ষেত্রে হতে পারে, তবে তা অবশ্যই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় এবং আদালতের মাধ্যমে বিচারিক সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হতে হবে।

জন লক বলেছেন, ‘প্রতিটি মানুষ তার মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা রাখে এবং এটি রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।’ গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক বহুদলীয় ব্যবস্থা। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা গণতান্ত্রিক চেতনার বিরুদ্ধে যায়, বরং আইনের মধ্যে দলগুলোকে পরিচালনা করা উচিত।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (HRW) এবং অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বারবার রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়েছে। তারা বলেছে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার ফলে রাজনৈতিক অধিকার খর্ব হয় এবং গণতন্ত্র ব্যাহত হয়। রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা গণতন্ত্রের জন্য দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিকর হতে পারে। বরং আইনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দল পরিচালনা করাই উত্তম পদ্ধতি। শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক সংলাপই সুষ্ঠু ও কার্যকর গণতন্ত্রের গ্যারান্টি দিতে পারে।

ফরাসি দার্শনিক ফ্রানৎস ফানন বলেছেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে হলে সব জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।’ তার মতে, রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধকরণ গণতন্ত্রের আদর্শের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং এটি জনগণের স্বাধীনতার ওপর আঘাত হানে। জন লক তার সামাজিক চুক্তির তত্ত্বে বলেছেন, জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক অধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র পরিচালিত হতে হবে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর মতামত দমন করা হলে তা কর্তৃত্ববাদী শাসনের জন্ম দেয়।

স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘The Third Wave: Democratization in the Late Twentieth Century’ বইয়ে বলেছেন, ‘গণতন্ত্র তখনই টিকে থাকে, যখন রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা অবাধ হয় এবং দলগুলোকে সমান সুযোগ দেওয়া হয়। দল নিষিদ্ধ করা হলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়ে।’ তিনি আরও বলেন, গণতন্ত্রের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ জরুরি, দলগুলোকে আইন ও বিধিবিধানের মধ্যে রেখে পরিচালনা করতে হবে। দল নিষিদ্ধ না করে গণতান্ত্রিক সংলাপ ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা উচিত।

১২ ফেব্রুয়ারি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় (ওএইচসিএইচআর) মৌলিক স্বাধীনতাকে সম্মান করাসহ অবাধ ও সত্যিকারের নির্বাচনের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রকাশিত প্রতিবেদনে আরও বলেছে, কোনো রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টাকে ব্যাহত করতে পারে। দল নিষিদ্ধ হলে জনগণের একটি বড় অংশ কার্যত ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হবে। নির্বাচনের আগে সব দলের জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত করতে হবে। মানবাধিকার লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত নয়, এমন সদস্যদের অন্য ইউনিটে স্থানান্তর করে র‌্যাব বাহিনী বিলুপ্ত করা উচিত।

কার্ল পপার তার ‘The Open Society and Its Enemies’ বইয়ে বলেছেন, ‘গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো-এটি ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। যারা ভিন্নমত সহ্য করতে পারে না, তারা গণতন্ত্রকে ধ্বংস করে।’ রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হলে উন্মুক্ত সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দলগুলোর কার্যক্রম সংবিধান ও আইনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখাই গণতন্ত্রের মূলনীতি।

সাঈদ খান : সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক; সাংগঠনিক সম্পাদক, ডিইউজে

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম