
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৪১ এএম
অনেক খারাপের পর আসুক ভালো খবর

হাসান মামুন
প্রকাশ: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
-66e9fdc56ceff.jpg)
গণতন্ত্র
আরও পড়ুন
দেশে ক্ষমতার স্বাভাবিক হস্তান্তর হয়নি। ক্ষমতার স্বাভাবিক হস্তান্তরের পরও ২০০১ সালে আমরা অবশ্য একটা ভিন্ন পরিস্থিতি দেখেছিলাম। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর ব্যাপক হামলা-নির্যাতন ঘটে তখন। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে দায়িত্ব গ্রহণকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার শুরুতেই ব্যাপক রদবদল করে প্রশাসনে। তারপরও অভিযোগ উঠছিল, প্রশাসনে দলীয় প্রভাব রয়েই গেছে। কারণ পূর্ববর্তী সরকার এক মেয়াদেই এত দলীয়করণ করেছিল যে, অদলবদল করে যাকেই বসানো হতো, দেখা যেত, তিনি ওই সরকারের আস্থাভাজন! তা সত্ত্বেও প্রশাসনকে দ্রুত সক্রিয় করে এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হয়নি তখনকার সরকার। নির্বাচন কমিশনও কঠোর অবস্থান নিয়েছিল। সন্ত্রাসী ও গডফাদার দমন করে নির্বাচনের অনুকূল পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন তারা। তবে ওই নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল ক্ষমতা হস্তান্তরকারী আওয়ামী লীগ। তারা বিরোধী দল হিসাবে সংসদে গিয়ে বসেওছিলেন।
স্বাভাবিকভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সেটাই শেষ ঘটনা। এরপর কী পরিস্থিতিতে ‘ওয়ান-ইলেভেন’ সরকার এসেছিল, সেটাও সবার জানা। রাজনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তারাই কিন্তু প্রথম সামনে আনে সংস্কারের প্রশ্ন। সংস্কার না করে নির্বাচন নয়-এমন দাবি সাধারণভাবেও উঠেছিল। বেদনাদায়ক সত্য হলো, সংস্কারে সফল হয়নি সে সরকার। সেটা হলে দেশে আজ যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তা বোধহয় এড়ানো যেত। হালে নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটানো হলো সেই সরকারের, যেটি কিন্তু ওয়ান-ইলেভেন সরকার আয়োজিত নির্বাচনের মাধ্যমেই এসেছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমন, এমনকি নতুন কোনো পক্ষকেও মাঠে দাঁড়াতে না দিয়ে তারা ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার পথ প্রশস্ত করেছিলেন ক্রমে। এটা ছিল এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্বদানকারী একটি দলের হাতে এমনটি ঘটবে, তা সাধারণভাবে কেউ ভেবে উঠতে পারেননি। এ হীন লক্ষ্য অর্জনে ন্যূনতম রাজনৈতিক অধিকারও খর্ব করা হয় এমনকি নতুন কালাকানুন করে। পুলিশসহ প্রশাসনের পরিপূর্ণ দলীয়করণ এবং তাদের মাধ্যমে গুম-খুনের ব্যাপক আয়োজনও করা হয়েছিল। যুদ্ধ করে স্বাধীনতা অর্জনকারী একটি জাতির ন্যূনতম লক্ষ্য গণতন্ত্রকেই হত্যা করা হয়েছিল বললে ভুল হবে না।
এমন পরিস্থিতি থেকে বেরোতে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অবশ্য সংগ্রাম জারি রাখে। একতরফাভাবে আয়োজিত নির্বাচনেও তারা অংশ নেন শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে একটা উত্তরণের দিকে যেতে। সে প্রয়াসও বানচাল করে দেওয়া হয়। তাদের অব্যাহত দমন-পীড়নের মুখে রেখে ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করাই ছিল লক্ষ্য। এর পরিণতি নিয়ে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারটি কখনো ভেবেছে বলে মনে হয়নি। ন্যূনতম সুশাসন নিশ্চিত করাও তাদের মনোযোগের মধ্যে ছিল না। অর্থনীতি পরিচালনায়ও তারা গোষ্ঠীবিশেষের লুণ্ঠনকে প্রাধান্য দিয়েছিলেন। এক ধরনের ‘অলিগার্কিক ক্যাপিটালিজমের’ জন্ম তারা দিয়েছিলেন, যারা স্বাধীনতা-পূর্বকালে ছিলেন বঞ্চিত মানুষের দল। স্বাধীনতা-উত্তরকালে তাদের বলা হতো ‘মাল্টি-ক্লাস পার্টি’। আওয়ামী লীগ বিলুপ্ত করে তো কৃষক-শ্রমিক আওয়ামী লীগেরও (বাকশাল) জন্ম দেওয়া হয়েছিল। বাকশালের আবরণে সেটা অবশ্য ছিল একদলীয় ব্যবস্থাই। উদ্যোগটি অবশ্য দ্রুতই মর্মান্তিক পরিণতি বরণ করে। এরপর জনগণ যে অভিজ্ঞতা অর্জন করে, সেটাও কম দুর্ভাগ্যজনক হয়নি। কখনো পরিপূর্ণ সামরিক শাসন, কখনো আধা সামরিক শাসনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। এরও অবসান ঘটে দীর্ঘদিন পর-ধাপে ধাপে গড়ে ওঠা আন্দোলনের মাধ্যমে। রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা সেটা নিশ্চিত করে। রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আনতে তখন ‘তিন জোটের রূপরেখা’ও গ্রহণ করা হয়। খুবই খারাপ কথা যে, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা পরবর্তী কোনো সরকারই এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। একে অপরের খারাপ দিকগুলোকেও তারা বরং নিজ অপশাসনের ‘যুক্তি’ হিসাবে ব্যবহার শুরু করে। তাতে রাজনীতির ক্রমাবনতিটাই হয়ে ওঠে একপ্রকার অনিবার্য।
সঠিকভাবেই মনে করা হয়, উল্লিখিত রূপরেখার ৫০ শতাংশের বাস্তবায়ন হলেও ওয়ান-ইলেভেনের অভিজ্ঞতা আমাদের হতো না। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের প্রতি শুরুর দিকে যত জনসমর্থনই থাকুক-এটা তো ঠিক, তখনো ক্ষমতার কোনো স্বাভাবিক হস্তান্তর হয়নি। মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের আগ দিয়ে নানা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটান তখনকার ক্ষমতাসীনরা। এতে যোগ দেন দলীয় রাষ্ট্রপতিও। এসব করে সফল হয়ে গেলে তাদের হাতেই বা দেশের কী পরিণতি হতো, সেটা দেখার সুযোগ অবশ্য হয়নি। ইতিহাস প্রবাহিত হয়েছে ভিন্নধারায়। তাতে শেষতক সুবিধাপ্রাপ্ত হয়েছে রাজনীতির একটি পক্ষ। চাপে পড়েছে তার প্রতিপক্ষ। সেই চাপ স্থায়ী হয়ে যাওয়াটাও দেশের জন্য কল্যাণকর হয়নি। শেষতক দেখা গেল, এটা কল্যাণকর হলো না তিন-তিনটি একতরফা নির্বাচন ও দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রতাপশালী হয়ে ওঠা হাসিনা সরকারের জন্যও। তাদের একের পর এক ‘চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা’ দেখে অনেকে অবশ্য ভেবেছিলেন, অন্তত শেখ হাসিনার জীবদ্দশায় এ শাসনের অবসান হবে না। যুগের পর যুগ কর্তৃত্ববাদী শাসন অটুট থাকার উদাহরণ তো কম নেই। এ সময়কার বিশ্বেও এর কিছু অব্যাহত রয়েছে। হাসিনার নামও সেই কাতারে লিখিত থাকবে বলে অনেকে ভেবেছিলেন। তাদের ধারণা সত্য হয়নি। সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের মতো দাবিকে কেন্দ্র করে সরকারের অন্ধ দমননীতির প্রয়োগ পরিস্থিতির এতটাই অবনতি ঘটায় যে, তাতে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে হাসিনা সরকার। তাকে রীতিমতো পালিয়ে যেতে হয় ভারতে। দেশ পরিচালনায় ভারতকেও তিনি এমনভাবে জড়িয়ে ফেলেছিলেন, যা ছিল নজিরবিহীন। এটাও খুব খারাপ ঘটনা-প্রতিবেশী দুই দেশের জন্যই।
ফেসবুকে একটি ছবি ‘ভাইরাল’ হয়েছে এর মধ্যে। এতে দেখা যাচ্ছে কয়েকজন তরুণকে, যারা একসঙ্গে বসে আছে হাসপাতালের একটি বিছানায়। তাদের প্রত্যেকের একটি করে পা নেই। হাসিনা সরকার পতনের আন্দোলনে পুলিশের নির্বিচার গুলিতে তারা নিহতও হতে পারত। অনেকে বলবেন, সেটা হলেই ভালো হতো তাদের জন্য! তরুণ বয়সে এভাবে পঙ্গু হয়ে যাওয়ার চেয়ে মৃত্যুই হয়তো শ্রেয়। তাহলে তাদের বিষয়ে কী বলা হবে-যারা খালি হাতে আন্দোলনে নেমে দুটি চোখই হারিয়েছে? যে কোনো আন্দোলন দমনে প্রশাসনকে যেনতেনভাবে ব্যবহার করতে করতে বিগত সরকার এমন এক জায়গায় পৌঁছেছিল যে, হত্যাকাণ্ড হয়ে গিয়েছিল তুচ্ছ। রাস্তায় নামা মানুষকে আচ্ছামতো পিটিয়ে দিলে কিংবা মেরে ফেললেই ‘পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে’ চলে আসবে, এমন একটি স্থির সিদ্ধান্তে তারা পৌঁছে গিয়েছিলেন। কিন্তু শেষতক সেটা আর কাজ করেনি। কেননা আওয়ামী লীগের অনুগত অংশটি বাদে ব্যাপক মানুষ এসে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল আন্দোলনে। তাতে কী সব অসাধারণ ঘটনা ঘটেছে, সেটা তো সবাই কমবেশি জানি। বিশ্বসম্প্রদায়ও জানে। দেশে বারবার ইন্টারনেট বন্ধ করে আন্দোলন স্তিমিত করতে চাইলেও সেটা কিন্তু ঘটেনি আর তা গুরুত্বসহ প্রচার করে যাচ্ছিল আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলো। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনও সরকারকে বারবার নিষেধ করছিল ‘অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগে’ আন্দোলন দমনের ব্যাপারে। হাসিনা সরকার তো দলীয় ক্যাডারদেরও নামিয়ে দিয়েছিল পুলিশের সঙ্গে। পুলিশও দলীয় ক্যাডারের মতো আচরণ করছিল। তাদের অনেকে ছিল বিগত সরকারের দীর্ঘ সময়ে পুলিশে চাকরি পাওয়া সাবেক ছাত্রলীগ কর্মী। এখন এটাও বলা হচ্ছে-এদের কারণেও নির্বিচার গুলিবর্ষণ করে আন্দোলন দমানোর ধারা থেকে প্রশাসনকে সরানো যায়নি।
সেসব পুলিশ সদস্য এখন হত্যা মামলার আসামি। তাদের নির্দেশদাতা কর্মকর্তাদেরও অনেকে গ্রেফতার হচ্ছেন। হত্যাকাণ্ড চালিয়ে আন্দোলন দমনের পরিকল্পনাকারীদেরও করা হচ্ছে গ্রেফতার। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর নামে দায়ের হচ্ছে একের পর এক হত্যা মামলা। সঙ্গে অনেক আসামি। এসব মামলার ধরন নিয়ে অবশ্য কম প্রশ্ন উঠছে না। হত্যা মামলায় ঢালাওভাবে যুক্ত করা হচ্ছে এমনকি সাংবাদিকসহ পেশাজীবীদেরও। রাজনৈতিক সমর্থন আর অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে এক করে দেখা হচ্ছে কিনা, সে প্রশ্নও উঠছে। এগুলো ‘টেকনিক্যাল ইস্যু’ সন্দেহ নেই। তদন্তের মাধ্যমে এর নিষ্পত্তি করা হবে বলেও অন্তর্বর্তী সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে। জুলাই-আগস্টে ঘটে যাওয়া নজিরবিহীন ঘটনাবলি, বিশেষত মানবাধিকার লঙ্ঘনের দিকটি তদন্ত করে দেখছে জাতিসংঘও। তথ্যানুসন্ধানে আসা তাদের দ্বিতীয় টিমটি এখন ঢাকায়। সরকার নিজেই তাদের আমন্ত্রণ জানিয়েছে ‘স্বাধীনভাবে তদন্ত’ পরিচালনা করতে। ‘নিজস্ব পদ্ধতিতে’ তদন্ত অনুষ্ঠানের পর তাদের রিপোর্ট আর সুপারিশ দেখার অপেক্ষায় আমরা থাকব নিশ্চয়ই।
নজিরবিহীন গণঅভ্যুত্থানে একটি চরম স্বেচ্ছাচারী সরকারের পতন ঘটিয়ে গণতন্ত্র ও সুশাসনের দিকে যাত্রা জাতির জন্য গৌরবের বৈকি। এ ধরনের শাসনে ধুঁকে ধুঁকে মরা নিশ্চয়ই গৌরবের ছিল না। এটাও ঠিক, বারবার গৌরবময় ঘটনা ঘটিয়ে আমরা কিন্তু অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে যাই। এ আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারীদের ভেতর থেকে বলা হচ্ছে, একাত্তর ও নব্বই ব্যর্থ হয়েছে। চব্বিশে সৃষ্ট পরিবর্তনের ধারাটিকে তাই কোনোভাবেই ব্যর্থ হতে দেওয়া যাবে না। কিন্তু সাফল্য অর্জন তো কঠিন। অন্তর্বর্তী সরকার প্রত্যাশামতো কাজ করতে পারছে বলে অনেকেই মনে করছেন না। আন্দোলনকারী নেতাদের মধ্যেও কিছু অনৈক্য দৃশ্যমান। মতপার্থক্য আর অনৈক্য অবশ্য এক নয়। মতপার্থক্যের মাঝেও মূল প্রশ্নে ঐক্য ধরে রাখা যায়। সেটা জরুরি বটে। মুক্তিযুদ্ধের পরও বিজয়ীদের মধ্যে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। তার ফল ভালো হয়নি। গণঅভ্যুত্থানের সুফল ধরে রাখতে সেনাবাহিনী অবশ্য দৃঢ়ভাবে সমর্থন জুগিয়ে যাচ্ছে সরকারকে। প্রতিষ্ঠান হিসাবে সেনাবাহিনী ঘুরে দাঁড়ানোয় হাসিনা সরকারের পতনও হয়েছে ত্বরান্বিত। এখন আবার প্রশ্ন উঠেছে সংস্কারের। আবার বলা হচ্ছে, জরুরি সংস্কারের পর তবেই নির্বাচন। ওয়ান-ইলেভেনের পর উচ্চারিত দাবিগুলোই ঘুরেফিরে আসছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। নতুন দাবিও আছে। কেননা রাষ্ট্রকে তো আরও গভীরভাবে বিকৃত করা হয়েছে বিগত তিন মেয়াদে। এটা খুব খারাপ খবর বৈকি। তবে এটা নিশ্চয়ই ভালো খবর যে, দেশে একটি অসাধারণ গণঅভ্যুত্থান হয়েছিল আর তা সফল হয়েছে। এমনও তো হতে পারত-গণঅভ্যুত্থানটি সফল হলো না; ‘স্মার্ট’ শেখ হাসিনা ও তার টিম সব সামলে নিলেন! সেক্ষেত্রে কিন্তু দেশকে গণতান্ত্রিক উত্তরণের দিকে নিয়ে যেতে এখন যা যা হচ্ছে, তার বিপরীতটাই ঘটত। মামলার পর মামলা হতো গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের নামে! ইতিহাস এভাবেই এগিয়ে চলেছে।
হাসান মামুন : সাংবাদিক, বিশ্লেষক