
২০২৩-২৪ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাবাকারে জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হবে আর মাত্র তিন সপ্তাহ পর। এরই মধ্যে সরকারের বাজেট প্রণয়নে কোন কোন খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত, তা নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। যদিও নিয়ম হচ্ছে, বাজেটটি সংসদে উপস্থাপিত হওয়ার পর প্রায় এক মাস ধরে আলোচনা শেষে সংযোজন-বিয়োজন সাপেক্ষে অনুমোদন লাভ করবে; কিন্তু অভিজ্ঞতা বলে, এক্ষেত্রে সংযোজন-বিয়োজনের তেমন কোনো বিষয় থাকে না, নামমাত্র সংশোধন সাপেক্ষে একতরফাভাবে সংসদে অনুমোদিত হয়ে যায়। এখানে সাধারণ মানুষের কল্যাণ-অকল্যাণের চেয়ে সরকারের চাওয়া-পাওয়াটাই অধিকতর গুরুত্ব লাভ করে এবং তা বাস্তব রূপ পায়।
আসন্ন বাজেটের সম্ভাব্য আকার নিয়ে অনেকেই অনেক রকম অনুমান করছেন। সেক্ষেত্রে বিগত বাজেটগুলোর আকারের প্রবৃদ্ধি দেখা যেতে পারে। ২০২১-২২ অর্থবছরে বাজেটের আকার ছিল ৬ লাখ ৩ হাজার ৬৮১ কোটি টাকা। চলতি বাজেটে ১২ শতাংশ বেড়ে আকার হয় ৬ লাখ ৭৮ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। যদি প্রবৃদ্ধির এই হার বজায় থাকে, তাহলে আসন্ন বাজেটের আকার দাঁড়াবে প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকায়। তবে কেউ কেউ মনে করেন, এবারের বাজেট প্রণয়নে কিছুটা সংযত আচরণ করা উচিত। কারণ আমাদের অর্থনীতি বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ উভয় সংকটে আক্রান্ত। তাই বাজেটের আকার যদি ৩ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ লাখ কোটি টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে তা সুবিবেচনাপ্রসূত হবে।
আকারের পর যে বিষয়টি আলোচিত হচ্ছে তা হলো, কোন বিষয়গুলোকে সরকারের অতীব গুরুত্বপূর্ণ হিসাবে আমলে নেওয়া উচিত। এক্ষেত্রে প্রথমেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের কথা আসে। চলতি অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি নিম্ন ও সীমিত আয়ের মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার একটি বড় কারণ হলো সরকারকে টাকা ছাপিয়ে বাজেট ঘাটতি পূরণ করতে হচ্ছে। পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর মনে করেন, টাকা ছাপিয়ে বাজেটে ভতুর্কি দেওয়া বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে ডলারের সংকটও প্রকট। ডলার সংকট থেকে উত্তরণ না ঘটলে বাজারে পণ্য সরবরাহে ঘাটতি থাকবে, যে কারণে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না; কমবে বিনিয়োগ, কমবে প্রবৃদ্ধি। দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো, বাজার ব্যবস্থাপনায় তদারকির অভাব। যেসব পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহ চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল, সেসব পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির একটি যৌক্তিক কারণ থাকে। কিন্তু কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে বাজারকে অশান্ত করা কাম্য নয়। আমরা দেখেছি, গেল রমজান মাসে সরকার বাজার মনিটরিংয়ে কিছুটা হলেও দক্ষতা দেখাতে পেরেছে। তাই যদি হয়, তাহলে বছরজুড়ে তদারকি করার সমস্যা কোথায়? বাজেটের তৃতীয় চ্যালেঞ্জটি হলো, অপ্রতুল রাজস্ব আয়। এ বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনার দাবি রাখে।
পারিবারিক বাজেট ও জাতীয় বাজেটের মধ্যে একটি গুণগত পার্থক্য আছে। পারিবারিক বাজেটটি হয় আয়ের প্রতি দৃষ্টি দিয়ে। এক্ষেত্রে প্রয়োজনের চেয়ে সামর্থ্যটা মুখ্য ভূমিকা পালন করে; ঘাটতি বাজেটের কোনো সুযোগ নেই। অপরদিকে দেশের জন্য জাতীয় বাজেট প্রণয়নে প্রথমেই প্রয়োজনটাকে আমলে নেওয়া হয়। সেই প্রয়োজন মেটাতে গিয়ে আয়ের পথ তৈরি করা কিংবা খোঁজা হয়। সেক্ষেত্রে ঘাটতি বাজেটেরও প্রচলন আছে। কারণ আমাদের মতো দুর্বল অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার করতে হলে ঘাটতি বাজেট কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সেজন্যই আমাদের মতো অর্থনীতির দেশগুলোয় সুষম বাজেটের পরিবর্তে ঘাটতি বাজেটের প্রচলন দেখা যায়। কিন্তু এখানেই শেষ কথা নয়। ঘাটতি বাজেট প্রণয়ন করা হলেও সেই ঘাটতি পূরণে কার্যকর পদক্ষেপও নিতে হয়। প্রাথমিকভাবে দেশি ও বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ করা হয়। এর পাশাপাশি সরকারের আয়বৃদ্ধির ব্যবস্থাও করতে হয়। তা না হলে একদিন এই ঘাটতির পাহাড়সম চাপ সরকারের তত্ত্বাবধানে ও বদৌলতে সাধারণ জনগোষ্ঠীর ঘাড়ে এসে পড়বে এবং আজ তা পড়ছেও।
এর চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই ঋণের বোঝা বছরওয়ারি বাড়ছেই। ২০১৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ছিল আমাদের মোট জিডিপির ২৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছিল জিডিপির ৩২ শতাংশে। এর মাত্র ৪ বছর পর বর্তমান সময়ে মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে জিডিপির ৪২ শতাংশের সমপরিমাণ। অবস্থাটা আরেকটু খোলাসা করা যাক। বর্তমানে আমাদের জিডিপির আকার হচ্ছে ৪৩৫ দশমিক ৫৩ বিলিয়ন ডলার। এই জিডিপির ৪২ শতাংশের সমান যদি ঋণের পরিমাণ হয়, তাহলে তার আকার হবে ১৮৩ বিলিয়ন ডলার। ১ ডলার সমান যদি ১০০ টাকা ধরা হয়, তাহলে দেশীয় মুদ্রায় মোট ঋণের পরিমাণ হয় ১৮ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। ২০২১ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। সেই মতে আজ যে শিশুটি জন্মলাভ করেছে, পৃথিবীর আলো দেখার আগেই তার ঘাড়ে চেপেছে ১ লাখ ৭ হাজার টাকার ঋণের বোঝা। এই বোঝা কি সে বইতে পারবে?
সরকার তার পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয় করতে গিয়ে যে পরিমাণ দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে ঋণ নিয়ে থাকে, তা অবশ্যই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধযোগ্য। কিন্তু সরকার ঋণ পরিশোধ করবে কীভাবে? সে পথ হচ্ছে তার আহরিত আয়। সে আয়ের আবার দুটি পথ : এক. সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে আহরিত আয় এবং দুই. জনগণের ওপর আরোপিত কর। এই কর আবার মোটা দাগে দুই ধরনের : এক. প্রত্যক্ষ কর, যা নাগরিকদের আয়ের ওপর আরোপ করা হয়; দুই. পরোক্ষ কর, যার সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ ভ্যাট। এ দুই ধরনের করই সরকারের নির্ভরযোগ্য আয়ের উৎস। আমরা এর আগে দেখেছি, বছরওয়ারি সরকারের দেনার দায় বাড়ছে। এর সঙ্গে সংগতি রেখে আনুপাতিক হারে কর বৃদ্ধি পাবে, এটাই তো প্রত্যাশিত। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ঋণ যেভাবে বাড়ছে, আয় সেভাবে বাড়ছে তো না-ই, বরং আয়বৃদ্ধির এই হার কমছে। দেশের অর্থনীতিকে সুচারুরূপে পরিচালনার জন্য সারা বিশ্বেই কর ব্যবস্থাপনা গড়ে উঠেছে। জিডিপির অনুপাতে করের অনুপাত যে দেশে যত বেশি, সেদেশের সরকারের আর্থিক দায় তত কম। আমরা যেসব রাষ্ট্রকে কল্যাণ রাষ্ট্র বলে থাকি, সেসব দেশে উচ্চ আয়ের নাগরিকের কাছ থেকে উচ্চ হারে কর আরোপ করে তা নিম্ন-আয়ের নাগরিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষায় ব্যয় করে আয়বৈষম্য কমিয়ে আনার চেষ্টা করা হয়। সবচেয়ে বড় কর-জিডিপি অনুপাত পাওয়া যায় ইউরোপে। ডেনমার্ক ও ফ্রান্সে কর-জিডিপি অনুপাত ৪৬ শতাংশেরও বেশি। দ্বিতীয় অবস্থান পাই উত্তর আমেরিকার কিউবায়। সেখানে কর-জিডিপি অনুপাত ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ। কর-জিডিপি অনুপাতে তৃতীয় অবস্থানে আছে এশিয়া। সেখানে ইসরাইলের কর-জিডিপি অনুপাত ৩২ দশমিক ৭ শতাংশ। এর পরের অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকা। সেখানে ব্রাজিলের কর-জিডিপি অনুপাত ৩২ দশমিক ২ শতাংশ। এর পরের অবস্থান আফ্রিকা মহাদেশের। সেখানকার তিউনিসিয়ায় কর-জিডিপি অনুপাত ৩২ দশমিক ১ শতাংশ। আরও ছোট পরিসরে যদি বলি, তাহলে দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ কর-জিডিপি ভুটানে-১৪ শতাংশ। এই চিত্রের পাশাপাশি বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত হতাশাজনক এবং তা ক্রম নিম্নহার। ২০১৪ সালে আমাদের কর-জিডিপি অনুপাত ছিল ৯ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৮ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশে। আর ২০২৩ সালে এই হার মাত্র ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রশ্ন হচ্ছে, কর-জিডিপির ন্যূনতম মানদণ্ড কত? আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) গবেষণা বলছে, যে কোনো দেশের অর্থনীতিকে সন্তোষজনক মাত্রায় পরিচালিত করতে হলে কর-জিডিপির অনুপাত হতে হবে কমপক্ষে ১২ শতাংশ। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে, এক্ষেত্রে আমরা প্রয়োজনীয় মাত্রার অনেক নিচে অবস্থান করছি।
আয়ের তুলনায় ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে চাপ পড়বে ঋণ পরিশোধে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, আমাদের চলতি অর্থবছরের বাজেটে কেবল ঋণের সুদ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছিল ৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। এতেও শেষ রক্ষা হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। কারণ, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৮ মাসে এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৫৬ হাজার ২২২ কোটি টাকা, যা কি না মোট বরাদ্দের ৭০ শতাংশ। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বছরের বাকি অংশে এই ব্যয় আরও বাড়তে পারে। পাশাপাশি আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ অনেকখানি বেড়ে যাবে। বিদেশি ঋণনির্ভর প্রকল্পগুলোর গ্রেস পিরিয়ড এরই মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। তখন বিদেশি ঋণ, বিশেষ করে রাশিয়া, চীন ও ভারত থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধের বাড়তি চাপ সামাল দিতে হবে।
সংবাদমাধ্যমের বরাতে জানতে পেরেছি, অতি দ্রুত কোটিপতি হওয়ার প্রবণতা যে ১০টি দেশে সবচেয়ে বেশি, তার মধ্যে অন্যতম হলো বাংলাদেশ। সেই বাংলাদেশে করপ্রবৃদ্ধি নিম্নগামী হওয়ার কোনো কারণ নেই। এ প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলমের বক্তব্য হলো, দেশের অর্থনীতির আকার অনেক বড় হয়েছে। মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ছে, জিডিপির প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। কিন্তু সে অনুপাতে রাজস্ব আয় না বাড়াটা অস্বাভাবিক। আইএমএফ কর-জিডিপির অনুপাত বাড়ানোর জন্য তাগিদ দিচ্ছে। আমি মনে করি, আমাদের নিজেদের স্বার্থেই এটি বাড়ানো দরকার। রাজস্ব বাড়লে বিদেশি ঋণ পাওয়া আরও সহজ হয়।
এ সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের কর ব্যবস্থাপনা ও কর কাঠামোতে ব্যাপক সংস্কার আনতে হবে। কর আহরণের পরিধি সম্প্রসারণ করতে হবে। অনিয়ম, দুর্নীতি ও অদক্ষতা দূর করতে হবে। একথা সত্য, কর কাঠামোর সংস্কার রাতারাতি করা সম্ভব নয়। সরকার আন্তরিক হলেও ২-৩ বছর সময় লাগবে। তারপরও শুরু তো করতে হবে। কারণ, ভালো কিছু কোনোদিন না হওয়ার চেয়ে বিলম্বে হলেও ভালো।
মুঈদ রহমান : অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়