
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:০১ পিএম
সাক্ষাৎকার
দেশ টুকরো করার সংস্কারও কি মানতে হবে বিএনপিকে?
সংস্কারের কথা বলে ভোটের অধিকার আটকে রাখা অযৌক্তিক

আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক এমপি নুরুল ইসলাম মনি বলেছেন, ‘সংস্কার কমিশনগুলোর করা প্রস্তাবের মধ্যে এমন সংস্কারের কথাও বলা আছে যাতে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ঝুঁকির মুখে পড়বে। সেক্ষেত্রে বিএনপি দ্বিমত করবে সেটাই তো স্বাভাবিক। এমন তো নয় যে দেশটা টুকরো টুকরো হয়ে যাওয়ার মতো সংস্কার প্রস্তাবও মেনে নিতে হবে বিএনপিকে।’ শনিবার দৈনিক যুগান্তরকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন।
বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী-পাথরঘাটা) আসনে ৩ বারের এমপি নুরুল ইসলাম মনি আসন্ন নির্বাচনেও মনোনয়ন চাইছেন বিএনপির কাছে। ১৯৮৮ এবং ১৯৯১ সালে তিনি এই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে সংসদ সদস্য হন। ২০০১ সালে তিনি এমপি হন বিএনপির মনোনয়নে। চলমান সংস্কার কার্যক্রম, নির্বাচন এবং অন্তর্বর্তী সরকারের নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে তার সঙ্গে খোলামেলা কথা হয় যুগান্তরের।
যুগান্তর : সংস্কার প্রশ্নে বেশ কিছু বিষয়ে দ্বিমতের কথা বলেছে বিএনপি। বিষয়টিকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
নুরুল ইসলাম মনি : সংস্কারের যেসব প্রস্তাব করা হয়েছে তার মধ্যে আমি তেমন কোনো নতুনত্ব দেখছি না। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে বালখিল্য মনে হয়েছে। দেশের জন্য প্রয়োজনীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাব তো আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ২০২৩ সালের ১৩ জুলাই দিয়ে রেখেছেন। আপনি ভাবুন, একজন তারেক রহমান যার এই দেশের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা আছে তিনি নিজেই বলছেন যে, কেউ দুবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না। অর্থাৎ তিনি নিজেই নিজের ক্ষমতাকে সীমিত করে ফেলছেন। এত বছর আমরা কিসের বিরুদ্ধে লড়েছি? দুর্নীতি সন্ত্রাস আর গণতন্ত্রহীনতার বিরুদ্ধে। এসবই আওয়ামী লীগ করতে পেরেছিল তাদের একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরশাসনের সুবাদে। আজ যদি নিয়ম থাকত যে, শেখ হাসিনা ২ বারের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না, তাহলে হয়তো দেশে এমন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হতো না। তাছাড়া তারেক রহমানের এই সংস্কার প্রস্তাব কেবল আমাদের দেশের জন্যই নয়, সারা বিশ্বের জন্য একটা রোল মডেল। অথচ দেখুন, অন্তর্বর্তী সরকারের করা কমিশনগুলো থেকে এমন প্রস্তাবও এসেছে যাতে দেশকে ৪টি প্রদেশে বিভক্ত করার কথা বলা হয়েছে। চিত্তরঞ্জন সুতারের কথা মনে আছে? ’৭৫-এ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর সে খুলনা-যশোর-সুন্দরবনসহ বিশাল একটি এলাকা নিয়ে আলাদা রাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্র করেছিল। মাঝে মধ্যেই শুনি দিনাজপুর-কড়িগ্রাম, আগরতলাসংলগ্ন সিলেট এলাকা, ফেনী আর পার্বত্য চট্টগ্রামকে ঘিরে আলাদা রাষ্ট্র করার ষড়যন্ত্রের কথা। এই ৪ খণ্ড প্রদেশ আর এসব দাবি যদি এক সুতোয় মেলানো হয় তাহলে ভেবে দেখুন সেটা দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের জন্য চরম ঝুঁকি কিনা? এখন এই সংস্কার প্রস্তাবও মেনে নিতে হবে বিএনপিকে? তারেক রহমানের দেওয়া সংস্কার প্রস্তাবেই তো গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তাবনা দেওয়া আছে। তিনি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কথা বলেছেন, আর্টিকেল ৭০ তুলে দেওয়ার কথা বলেছেন। যাতে একজন সংসদ সদস্য সরকার পরিবর্তন ছাড়া অন্য যে কোনো ইস্যুতে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিতে পারবে। আমেরিকায়ও এই বিধান রয়েছে। রিপাবলিকান দলের রাষ্ট্রপতি প্রার্থী জন ম্যাককেইন সংসদে তার দলের বিরুদ্ধে গিয়ে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আনা ওবামা কেয়ার বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন। যে কারণে আজও সেখানকার সাড়ে ৩ কোটি মানুষ চিকিৎসা সুবিধা পাচ্ছে। এছাড়া বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশ পুনর্গঠন প্রশ্নে জাতীয় সরকার গঠনের প্রস্তাবও দিয়ে রেখেছেন। যাতে আমরা সবাই মিলে ধ্বংসপ্রায় দেশকে নতুন করে গড়তে পারি। সংস্কার বলতে যদি গণতন্ত্র আর দেশকে ঝুঁকির মুখে ফেলার আশঙ্কা থাকে, তাহলে বিএনপি মানবে না সেটাই তো স্বাভাবিক।
যুগান্তর : অন্তর্বর্তী সরকার চাইছে সংস্কার শেষ করে নির্বাচন করতে, আর বিএনপির দাবি দ্রুত নির্বাচন, এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কী?
নুরুল ইসলাম মনি : ১৯৯১ সালে আমরা প্রথম অন্তর্বর্তী বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অভিজ্ঞতা পেয়েছি। তখন কী হয়েছিল? সরকারের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন মাত্র ৩ মাসে নির্বাচন সম্পন্ন করেছিলেন। গত ১৬ বছর বাংলাদেশের মানুষ অত্যাচার-নির্যাতনকারী ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে। সর্বশেষ জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে পালিয়ে যায় স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা। ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল দীর্ঘ এই সময়ে আন্দোলনের মূল ইস্যু ছিল গণতন্ত্র ফিরে পাওয়া। সাধারণ মানুষের কোনো ভোটাধিকার ছিল না। রাতের ভোট, কাল্পনিক ভোট, বানানো ভোট আর ভোট ডাকাতি করে ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। এই ভোটের অধিকার আর গণতন্ত্র ফিরে পাওয়ার জন্যই তো এতগুলো বছর অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করে আন্দোলন করেছে মানুষ। গুম ও খুনের শিকার হয়েছে হাজার হাজার জনতা। আয়নাঘরের অন্ধকারে জীবন দিতে হয়েছে অনেককে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রথম দায়িত্ব হচ্ছে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। মানুষের ভোটের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। আমি তথা আমার দল সংস্কারের বিরুদ্ধে নয়। আবার সংস্কারের কথা বলে মানুষের ভোটের অধিকার অনির্দিষ্টকাল আটকে রাখাও অযৌক্তিক। দেশের মানুষ চায় তাদের ভোটে নির্বাচিত সরকার। সংস্কার আমরাও চাই, নিরপেক্ষ নির্বাচন করতে যতটুকু সংস্কার দরকার সেটুকু করে নির্বাচন দিক বর্তমান সরকার। নিজেদের সুবিধার জন্য ১৩০টি আসনের সীমানা পরিবর্তন করা হয়েছে ফ্যাসিস্ট আমলে। নির্বাচন কমিশনকে করে রাখা হয়েছে ঠুঁটো জগন্নাথ। আমলাতন্ত্রকে এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে সাধারণ মানুষ ভোট দিতে পারুক বা না পারুক কিন্তু ক্ষমতায় থাকবে আওয়ামী লীগ। অন্তর্বর্তী সরকার এসব জায়গায় সংস্কার করুক। আর্টিকাল ১২৬’র সংস্কার হোক, নির্বাচনকালীন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যকরভাবে রাখা হোক ইসি’র অধীনে, নির্বাচন প্রশ্নে নির্বাচন কমিশনকে সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী করতে যা যা সংস্কার করা দরকার তাই করুক বর্তমান সরকার। এসবে তো আপত্তি নেই। ১৬ বছর ভোট দিতে না পারা মানুষ উন্মুখ হয়ে আছে একটি নির্বাচনের জন্য। সবাই চায় তাদের পছন্দের কাউকে জনপ্রতিনিধি করার মাধ্যমে দেশে আবার গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হোক। বিএনপি কেবল জনগণের সেই চাওয়া তুলে ধরছে। দেশের বৃহত্তম দল বিএনপি জনগণের প্রতিনিধিত্ব করে। তারা জনগণের কথা বলবে এটাই স্বাভাবিক। আমি মনে করি বর্তমান সরকারের উচিত হবে বিএনপি তথা জনগণের এই দাবির প্রতি সম্মান জানিয়ে দ্রুত নির্বাচন দেওয়া। নয়তো আবার নির্বাচনের এক দফা দাবি নিয়ে আন্দোলনে নামতে হবে বিএনপিকে।
যুগান্তর : নির্বাচন বিলম্বিত হলে কী কী সমস্যা হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
নুরুল ইসলাম মনি : বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের একটি বক্তব্য দিয়েই এই প্রশ্নের উত্তরটা দিতে চাই। একটা অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘দেড়শ’ কোটি মানুষের দেশ ভারতে এমন একজন খুঁজে পাওয়া যাবে না, যিনি তার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলার মতো কোনো কাজ করবেন। অথচ মাত্র ১৮ কোটি মানুষের এই দেশে এমন অনেককে পাওয়া যাবে যারা ব্যক্তিস্বার্থের জন্য দেশ বেঁচে দিতেও দ্বিধা করবে না।’ আমার ভয়টাও এখানেই। নির্বাচিত সরকার না থাকায় দেশে মব জাস্টিস নামে বিচারহীনতার যে সংস্কৃতি আমরা দেখছি এটা কি সাধারণ মানুষ করছে? গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখবেন সেখানেও এর নেপথ্যে রয়েছে ওই দেশ বেচা কীটগুলো। ছিনতাই-ডাকাতিসহ যা যা হচ্ছে তার নেপথ্যে রয়েছে গণ-অভ্যুত্থানে অর্জিত বিজয় নস্যাৎ ও দেশকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র। আজ সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানোর ষড়যন্ত্র চলছে। সেনাপ্রধান, যিনি আন্দোলনে জনতার পক্ষে ছিলেন, যিনি ১৮ মাসের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কথা বলেছেন, তাকে বিতর্কিত করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে। এমন নজির পৃথিবীর কোথাও কী আছে যে ক্ষমতা পাওয়ার সুযোগ পেয়েও একজন সেনাপ্রধান তা দখলের চিন্তা না করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা ভাবছেন? তাকে নিয়ে টানাহেঁচড়া হলো। এসব কিসের আলামত? বাংলাদেশ সেনাবাহিনী আমাদের গৌরবের, অহংকারের। সেনাবাহিনী ধ্বংস হওয়া মানে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হুমকির মুখে পড়া। এই সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করার জন্যই তো পিলখানা ট্র্যাজেডির নামে ষড়যন্ত্র করে ৫৭ জন চৌকশ সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করেছে ভারত। সেনাবাহিনীকে জনগণের মুখোমুখি দাঁড় করানো গেলেই জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানে অর্জিত ফ্যাসিস্টমুক্ত বাংলাদেশকে আবারও ভারতের তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করা যাবে বলে ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হচ্ছে। একটা কথা পরিষ্কার মনে রাখতে হবে যে, ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে গেলেও তার দোসররা এখনো দেশে আছে। তারা বাংলাদেশকে একটি অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত করার ষড়যন্ত্র করছে। যখন একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসবে তখন আর এসব ষড়যন্ত্র কোনো কাজে আসবে না। বাংলাদেশের জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন এবং দেশে সত্যিকার অর্থে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যই যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন দিয়ে জনগণের প্রতিনিধিত্বশীল সরকারের ক্ষমতায় আসা প্রয়োজন। নইলে এদেশকে দাস বানিয়ে রাখার ভারতীয় ষড়যন্ত্র তা ঠেকানো মুশকিল হয়ে পড়বে।