
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৫:২৪ পিএম

এটিএম নিজাম, কিশোরগঞ্জ
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

মুঘল আমলের ইসলামি স্থাপত্যকলার অপূর্ব নিদর্শন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম সদরের কুতুবশাহী মসজিদ। পাঁচ গম্বুজবিশিষ্ট এ মসজিদটি বাংলার সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্যে নির্মিত। তবে চরম অযত্ন-অবহেলা আর উপযুক্ত সংরক্ষণের অভাবে এ ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
এ নিয়ে কথা হলে অষ্টগ্রাম রোটারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক সৈয়দা নাসিমা ইসলাম রীতা যুগান্তরকে বলেন, ঐতিহাসিক এই মসজিদটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকলেও তারা যেন শুধু সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রেখেই দায়িত্ব শেষ করেছে। তাদের সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধান ও সংরক্ষণব্যবস্থার অভাবে বেশকিছু সমস্যা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যেমন: বিগত সরকারের আমলে কে বা কার মানতের কথা বলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লোকজন মসজিদ আঙিনায় বড় বড় পিলার স্থাপন করে মসজিদটির আউটলুকিং বা সৌন্দর্যের খর্ব করেছে। এসব থেকে মসজিদটিকে রক্ষা করতে হবে। পরিদর্শনে আসা এক গণমাধ্যমকর্মী বলেন, এমন ঐতিহাসিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণে যে ধরনের ব্যবস্থা থাকা দরকার, সেসব এখানে চোখে পড়েনি।
অষ্টগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দিলশাদ জাহানের সঙ্গে কথা হলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, এ কথা সত্যি যে, এই ঐতিহাসিক পুরাকীর্তিটি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে থাকলেও ছোটখাটো অধিকাংশ বিষয়ই উপজেলা পরিষদ দেখে আসছে। বিশেষ করে তিনি নিজেই সমস্যা অনুভব করে অতিরিক্ত মুসল্লিদের নামাজ আদায়ের জন্য ত্রিপল (শামিয়ানা) টানানো এবং বৈদ্যুতিক সুবিধার জন্য একটি জেনারেটরের ব্যবস্থা করেছেন তার পরিষদের পক্ষ থেকে। এ সময় তিনি আরও জানান, মূলত এলাকাটি সম্পূর্ণ হাওড়বেষ্টিত হলেও ওই ঐতিহাসিক স্থাপনা পরিদর্শনে আসা দর্শনার্থীদের জন্য আশপাশের রাস্তাঘাট চমৎকারভাবে সংস্কার করা হয়েছে। এজন্য দর্শনার্থী-পর্যটকদের কোনো দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে না। কিন্তু ঐতিহাসিক স্থাপনাটিতে এখন মৌলিক কোনো সংস্কার বা পরিবর্তন প্রয়োজন আছে কি না, তা একমাত্র প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরই বলতে পারবে, এটি তাদেরই কাজ।
জানা যায়, কেউ কেউ এ ঐতিহাসিক ইসলামি স্থাপনাকে ১৬ শতাব্দীর নির্মিত বললেও অধিকাংশ ইতিহাসবেত্তা এটিকে ১৭ শতাব্দীতে নির্মিত বলে মনে করেন। ইতিহাসবেত্তাদের মতে, ১৭ শতাব্দীর প্রথমদিকে নির্মিত বলেই মসজিদটিতে সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যের বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়। এমনকি মসজিদটির নামকরণ হয়েছে ওই আমলের বিখ্যাত দরবেশ কুতুব শাহের নামে। ধারণা করা হয়, ওই অঞ্চলটিতে সুলতানি আমলের প্রভাবশালী শাসকদের রাজত্বকালে এমন দৃষ্টিনন্দন ইসলামি স্থাপত্যকলাবৈশিষ্ট্য মসজিদটি নির্মিত হয়। মসজিদটি উত্তর-দক্ষিণে লম্বায় ৪৬ ফুট ১১ ইঞ্চি এবং পূর্ব-পশ্চিমে ২৭ ফুট ১১ ইঞ্চি। বাংলার চৌচালা ঘরের চেয়েও এর কার্নিশগুলো অধিক বক্র। এর চার কোণে আটকোণবিশিষ্ট চারটি মিনার বা কর্নার টায়েট রয়েছে। যেগুলো নকশা করা। মসজিদের ভেতর ও বাইরের দিকেও রয়েছে চোখ জুড়ানো কারুকাজ। মসজিদটির পূর্ব দেওয়ালে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দেওয়ালে দুটি করে চারটি, সর্বমোট সাতটি সুলতানি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ রয়েছে। পূর্ব দেওয়ালের প্রবেশপথের বিপরীতে পশ্চিম দেওয়ালে তিনটি মেহরাব রয়েছে। উপরের দিকে তাকালে বড় একটি গম্বুজ চোখে পড়ে। চারপাশে আরও চারটি ছোট গম্বুজ। গম্বুজগুলোর চূড়ায় আছে নান্দনিক অলংকরণ। মসজিদের দক্ষিণ পাশে কবরসদৃশ একটি স্থাপনা রয়েছে। অনেকের ধারণা, এখানেই কুতুব শাহের সমাধি। শত শত বছর এ অঞ্চলের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মসজিদটিতে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করে আসছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের কারণে ১৯০৯ সালে মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসাবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে পুরাকীর্তিটি রয়েছে। তবে আজ পর্যন্ত লক্ষ করা যায়নি উল্লেখযোগ্য সংরক্ষণ ও সংস্কারকাজ। অথচ অনিন্দ্যসুন্দর ইসলামি স্থাপত্যকলার এ দৃষ্টিনন্দন মসজিদটি দেখতে প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের শত শত পর্যটক এখানে এসে ভিড় করেন। এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির উপযুক্ত সংরক্ষণ ও সংস্কারকাজ এখন সময়ের দাবি।