
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:১২ পিএম
দুই যুগে সারা দেশে সাড়ে ৭ হাজার মামলা
বিচার বিলম্বের সুযোগ নিচ্ছে জালনোট চক্র
১৪ বছরে ঢাকায় নিষ্পত্তি মাত্র ৪টি, সাজা ১৩টিতে * দুর্বল আইন, মনিটরিংয়ের অভাব ও সাক্ষী না আসা

ঈদ-পূজা বা কোনো উৎসবকে কেন্দ্র করে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় জোরদার হয় জাল নোটবিরোধী মৌসুমি অভিযান। মাসখানেকের অভিযানে ধরা পড়ে চক্রের একাধিক মূল হোতাসহ অর্ধশত সদস্য। উদ্ধার হয় বিপুল পরিমাণ জাল নোট, নকল বিদেশি মুদ্রা ও তৈরির সরঞ্জাম। দেখা যায়, গ্রেফতার ব্যক্তিদের বেশির ভাগই আগেও বিভিন্ন সময়ে ধরা পড়েছেন। বিচারিক বিলম্ব ও যথাসময়ে শাস্তি না হওয়ায় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে জামিনে বেরিয়ে ফের জড়িয়ে পড়েছেন একই কারবারে।
২০০১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত গত দুই যুগে দেশের বিভিন্ন থানায় জাল নোটসংক্রান্ত সাড়ে ৭ হাজারের মতো মামলা হয়েছে। এর মধ্যে ২০১০ থেকে ২৪ সাল পর্যন্ত শুধু রাজধানীর ৫০টি থানায় হয়েছে ৭শর বেশি মামলা। এই ১৪ বছরে নিষ্পত্তি হওয়া মামলার সংখ্যা মাত্র ৪টি আর সাজা হয়েছে মাত্র ১৩টিতে। বাকিগুলোর কোনোটি চার্জশিট প্রদান পর্যায়, অভিযোগ গঠন, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং কোনোটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রয়েছে। এসব মামলায় দু-একটি বাদে সব আসামিই এখন জামিনে মুক্ত।
মূলত দুর্বল আইন, লঘু শাস্তি, মামলা পরিচালনায় মনিটরিং না থাকা, সাক্ষীর অভাব, সরকারি আইন কর্মকর্তাদের গাফিলতিসহ বিভিন্ন কারণে বছরের পর বছর অনিষ্পন্ন অবস্থায় পড়ে আছে জাল নোটসংক্রান্ত মামলাগুলো। দ্রুত নিষ্পত্তি ও যথাযথ শাস্তি নিশ্চিত করা না গেলে কখনোই এ চক্রকে রোধ করা যাবে না। এক্ষেত্রে খসড়া আইনটি দ্রুত প্রণয়নসহ যথাসময়ে বিচার নিষ্পত্তি করতে হবে।
২০১৩ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ২ হাজার ৪৮৬টি নতুন মামলা হয়েছে। এ সময়ে নিষ্পত্তি হয়েছে মাত্র ৯৭৭টি। এই সময়ে সব থেকে বেশি মামলা হয় ২০১৫ সালে ৪৩৯টি। তবে ওই বছর নিষ্পত্তি হয় মাত্র ৪৯টি মামলা। অন্য বছরগুলোতে নিষ্পত্তির চেয়ে নতুন মামলা দায়ের কয়েকগুণ বেশি। ২০২৪ সালে নতুন ১২৪টি মামলাসহ মোট মামলার সংখ্যা ৬৯৪০টি। এর মধ্যে ১৫২টি নিষ্পত্তি হয়েছে। বর্তমানে ৬৭৮৮টি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে।
২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন থানায় জাল নোটসংক্রান্ত মোট মামলা হয়েছে ৭০৮টি। এই সময়ে মোট গ্রেফতার হয়েছে ১ হাজার ৩০৭ জন। এই ১৪ বছরে নিষ্পত্তি হওয়ার মামলার সংখ্যা মাত্র ৪টি। চার্জশিট দেওয়া হয়েছে ৬৪৩টি মামলায়। এছাড়া সাজা হয়েছে ১৩টি মামলায়।
একাধিক আইনজীবী অভিযোগে বলেন, অনেক ক্ষেত্রে জাল নোটসংক্রান্ত মামলা করার সময় পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করে দেওয়া হয়। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে অপরাধীর জামিন লাভের সুবিধার্থে দুর্বলভাবে এজাহার লেখা হয়। চার্জশিট দেওয়ার ক্ষেত্রে আসামিদের স্থায়ী ঠিকানা সঠিকভাবে লিপিবদ্ধ করা হয় না। যে নামে গ্রেফতার করা হয় সে নাম ও বর্তমান ঠিকানা থানায় রেকর্ড করা হয়। আসল নাম, পরিচয় ও স্থায়ী ঠিকানা উল্লেখ না থাকায় জামিনে বেরিয়ে ঠিকানা পরিবর্তন করে ফেলে আসামিরা। আবার কখনো সাজা হলেও সেই সাজাও আর কার্যকর হয় না।
মামলার ফাঁকফোকর ছাড়াও জাল নোট কারবারিবাদের জামিনের জন্য আদালতে রয়েছে চক্রের নিজস্ব কিছু আইনজীবী। আসামি পক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে কোনো কোনো পাবলিক প্রসিকিউটরের ঘনিষ্ঠতা থাকে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে জালিয়াত চক্রের সদস্যদের চুক্তিতে কারামুক্ত করা হয়। ফলে অপরাধীরা ধরা পড়লে কিংবা মামলা হলেও আর শাস্তি হয় না। তেমনি কখনো শাস্তি হলেও কার্যকর হয় না। জাল নোট প্রতিরোধে সার্বিক সচেতনতা জোরদারসহ শাস্তি নিশ্চিতের বিষয়টিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
ডিবির একাধিক মামলা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ঘুরেফিরে একই চক্র জাল নোট কারবারে। একবার ধরা পড়ার পর কিছুদিন জেল খেটে জামিনে বেরিয়ে স্থান পরিবর্তন করে বড় পরিসরে কারবার শুরু করে। হুমায়ুন কবির নামে এক ব্যক্তি ২০০২ সাল থেকে পরবর্তীকালে অন্তত ১০ বার ধরা পড়েছেন। চলতি ১৫ ও ১৬ মার্চ রাজধানীর ওয়ারী, কামরাঙ্গীরচর ও নারায়ণগঞ্জে অভিযান চালিয়ে ৫ জনকে ধরে ডিবি ও থানা পুলিশ। তারাও একাধিকবার গ্রেফতার হন। ২ মার্চ চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় গ্রেফতার হওয়া শাহ আলম তার স্ত্রী জান্নাত আরাকে নিয়ে জাল নোটের ব্যবসা করেন। তারাও বেশ কয়েকবার গ্রেফতার হয়েছেন। ৫ স্ত্রীকে নিয়ে জাল নোট প্রস্তুতকারী চক্রের আরেক হোতা বাবুল মিয়া গ্রেফতার হয়েছেন অন্তত ৬ বার।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) রেজাউল করিম মল্লিক যুগান্তরকে বলেন, কোনো উৎসব ঘিরে জাল নোট কারবারিরা তৎপর হলে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয়। তবে নানা ফাঁকফোকর গলে জামিনে বেরিয়ে আবারও একই কারবার শুরু করায় তাদের নির্মূল করা যায় না। এক্ষেত্রে দ্রুত সময়ে মামলা নিষ্পত্তি ও অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী মো. ফয়জুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, আলাদা আইন না থাকায় বর্তমানে দণ্ডবিধির-১৮৬০ এর ৪৮৯(ক)-(ঘ) ধারা এবং বিশেষ ক্ষমতা আইন-১৯৭৪ এর ২৫(ক) ধারা অনুযায়ী জাল নোটসংক্রান্ত অপরাধের বিচার হয়। এ আইনে কাউকে শাস্তি দিতে গেলে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হয়। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে হয়রানির ভয়ে প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী পাওয়া যায় না আবার সাক্ষীরা ঠিকমতো আসতে চান না। একাধিক আইনজীবী বলেন, এ সমস্যা নিরসনে একটি আইনের খসড়া প্রণয়নে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি হয়। ওই কমিটি ‘জাল মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ আইন-২০১৭’-এর খসড়া তৈরি করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠায়। পরে খসড়া আইন চূড়ান্ত করতে বহু বৈঠক হলেও এখনো নতুন আইন হয়নি।