
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৯:১০ এএম

আকতার ফারুক শাহিন, বরিশাল
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বরিশালে ঈদকেন্দ্রিক নির্বাচনি রাজনীতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিএনপির নেতারা। বিশেষ করে ইফতার আর ঈদ উপহারের প্রতিযোগিতা চলছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে। কার ইফতার আয়োজনে কত লোকের উপস্থিতি কিংবা দরিদ্র মানুষের মধ্যে কে বেশি সহায়তা দিচ্ছেন-তাই নিয়ে যেন অলিখিত লড়াই চলছে। কেবল স্থানীয় নয়, লড়াইয়ে জড়াচ্ছেন দলের প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতারাও। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিষয়টি ইতিবাচক হলেও নেতাদের এই যুদ্ধে বিপাকে পড়েছে মাঠ পর্যায়ের কর্মী-সমর্থকরা। মনোনয়ন দ্বন্দ্বে বিভক্ত নেতাদের সঙ্গে তারাও বিভক্ত হয়ে পড়ছেন। তবে বিষয়টিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন না কেন্দ্রীয় নেতারা। তাদের মতে, প্রতিযোগিতায় দলের সাংগঠনিক শক্তি বাড়ছে। তাছাড়া দলীয় মনোনয়ন যে পাবে শেষ পর্যন্ত তার পক্ষেই কাজ করবে নেতাকর্মীরা। কেননা তখন প্রশ্ন আসবে ধানের শীষের সম্মানের।
৫ আগস্টের পর থেকেই নির্বাচনি মাঠে নেমে পড়েন বরিশাল তথা দক্ষিনের মনোনয়নপ্রত্যাশী নেতারা। মাঠ পর্যায়ে সাধারণ ভোটারদের পক্ষে আনার কৌশলও করছেন অনেকে। দলীয় মনোনয়ন প্রশ্নে চলছে ঠান্ডা লড়াই আর গ্রুপিংয়ের ঘটনা। বরিশাল-৩ (বাবুগঞ্জ-মুলাদী) নির্বাচনি এলাকায় দলীয় মনোনয়নের আশায় মাঠে আছেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান ও ভাইস চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন। একজন এলাকায় একটি প্রোগ্রাম করেন তো পরদিনই ছুটে আসেন অন্যজন। ২৪ মার্চ বাবুগঞ্জে অনুসারীদের নিয়ে ইফতার পার্টি করেন সেলিমা রহমান। পরদিন একই উপজেলায় জয়নুল আবেদিন ইফতার আয়োজন করেন। সেলিমা রহমানের ঘনিষ্ঠ বিএনপি নেতা সাবেক এমপি মেসবাহউদ্দিন ফরহাদের সঙ্গে আবার মনোনয়নকেন্দ্রিক দ্বন্দ্ব রয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক রাজিব আহসানের। এই দুজন মনোনয়ন চাইছেন বরিশাল-৪ (হিজলা-মেহেন্দীগঞ্জ) নির্বাচনি এলাকায়। দু’জনার দ্বন্দ্বে এখানেও চলছে পালটাপালটি ইফতার আয়োজন আর ঈদ উপহার বিতরণের লড়াই।
একই চিত্র বরিশাল-১ (গৌরনদী-আগৈলঝাড়া) নির্বাচনি এলাকায়। মনোনয়ন লড়াইয়ে থাকা ৩ নেতা চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি জহিরউদ্দিন স্বপন, কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান ও জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ইঞ্জিনিয়ার আব্দুস সোবাহানের কল্যাণে দফায় দফায় ইফতারের স্বাদ পাচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। ঈদ উপহারের শাড়ি লুঙ্গি বিতরণেও ৩ নেতার মধ্যে চলছে প্রতিযোগিতা। বরিশাল (উত্তর) জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মিজানুর রহমান মুকুল বলেন, নেতাদের এই প্রতিযোগিতায় প্রকারান্তরে উপকৃত হচ্ছে দরিদ্র সাধারণ মানুষ।
বরিশাল সদর আসনে দলীয় মনোনয়নের আশায় মাঠে থাকা নেতারাও পিছিয়ে নেই ঈদকেন্দ্রিক রাজনীতিতে। এমনিতেই এখানে মহানগরের নেতৃত্ব নিয়ে চলছে ৪ গ্রুপের লড়াই। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা সাবেক এমপি, মেয়র ও হুইপ মজিবর রহমান রহমান সরোয়ার অনুসারীদের পাশাপাশি এই লড়াইয়ে আছেন মহানগরের বর্তমান আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান ফারুক ও সদস্য সচিব জিয়াউদ্দিন সিকদার, সাবেক সদস্য সচিব মীর জাহিদুল কবির এবং মহানগরের যুগ্ম আহ্বায়ক আফরোজা নাসরিন। চার পক্ষই এখানে চালাচ্ছে পালটাপালটি ইফতার আয়োজনসহ ঈদ উপহার বিতরণ। দলীয় কর্মসূচিও এরা পালন করে আলাদাভাবে। এতদিন সভা-সমাবেশে মহানগর কমিটির ২৬ জন তার পক্ষে আছেন বলে প্রচার করে আসছিলেন আফরোজা নাসরিন। কিন্তু বৃহস্পতিবার সংবাদকর্মীদের সম্মানে ফারুক-জিয়ার আয়োজন করা ইফতারে ৪২ সদস্যের মহানগর কমিটির ৩২ জনের উপস্থিতি জন্ম দিয়েছে নতুন আলোচনার। নেতৃত্ব নিয়ে কোন্দলের পাশাপাশি মনোনয়ন নিয়েও এখানে রয়েছে নেতাদের দ্বন্দ্ব। সাবেক এমপি সরোয়ার ছাড়াও ধানের শীষ পাওয়ার লড়াইয়ে আছেন কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য ও স্বাধীনতা ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি আবু নাসের মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ, এবায়েদুল হক চান, মনিরুজ্জামান ফারুক, জিয়াউদ্দিন সিকদার ও আফরোজা নাসরিন। ঈদ উপহার বিতরণ প্রশ্নে এখন পর্যন্ত সরোয়ারের তেমন কোনো উদ্যোগ না থাকলেও বাকিরা একাধারে চালাচ্ছেন ‘ইফতার আর উপহারের লড়াই’। ব্যক্তি উদ্যোগে ২০টির বেশি ইফতার পার্টি ও ১৬/১৭টি স্পটে ঈদ উপহার বিতরণ করেছেন রহমতউল্লাহ। ফারুক-জিয়া আর নাসরিন ওয়ার্ড পর্যায়ে করেছেন পৃথক ইফতার মাহফিল। দরিদ্র মানুষের মধ্যে ঈদ উপহার বিতরণও চলছে তাদের।
বরিশালের অন্যান্য জেলাগুলোতেও চলছে নেতাদের ইফতার আর ঈদ উপহার বিতরণের ধুম। পিরোজপুরে ভান্ডারিয়া-কাউখালী-স্বরূপকাঠী এলাকায় প্রায় ২৫ হাজার মানুষের মধ্যে ঈদ উপহার বিতরণ করেছেন সেখানকার মনোনয়নপ্রত্যাশী বিএনপি নেতা ভিপি মাহমুদ হোসেন। ইউনিয়ন এবং ওয়ার্ড পর্যায়ে ইফতার আয়োজনও করেছেন তিনি। এখানে দলের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী আহম্মেদ সোহেল মঞ্জুরও করেছেন ইফতার আয়োজন। পিরোজপুর-১ (সদর-নাজিরপুর-ইন্দুরকানী) আসনে সব ইফতার আয়োজনে অংশ নিচ্ছেন দলের জাতীয় কমিটির সদস্য এলিজা জামান ও জেলা আহ্বায়ক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন। পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া) আসনে ইফতার আর ঈদ উপহারের লড়াই চলছে রুহুল আমীন দুলাল, জাকীর কাজী ও মামুন খানের মধ্যে। ঝালকাঠি-১ (রাজাপুর-কাঁঠালিয়া) আসনে রফিকুল ইসলাম জামাল ও সেলিম রেজা এবং ঝালকাঠি-২ (সদর-নলছিটি)-এ কেন্দ্রীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল হক নান্নু শুরু থেকেই সবার চেয়ে বেশি সময় দিচ্ছেন নির্বাচনি এলাকায়। জাতীয় নির্বাহী কমিটির দুই সদস্য সাবেক এমপি ইলেন ভুট্টো এবং জিবা আমিন খানও সাম্প্রতিক সময়ে যাতায়াত শুরু করেছেন বরিশাল-২’এ।
রমজানের শুরু থেকেই ওয়ার্ড ও ইউনিয়ন পর্যায়ে ইফতার আর দরিদ্র মানুষের মধ্যে শাড়ি লুঙ্গি বিতরণ করছেন বরগুনা-২ (বামনা-বেতাগী-পাথরঘাটা) আসনের মনোনয়ন প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম মনি। এ ছাড়া পটুয়াখালী-৩ (গলাচিপা-দশমিনা) আসনে হাসান মামুন, পটুয়াখালী-৪ (কলাপাড়া-রাঙ্গাবালী) আসনে এবিএম মোশাররফ, ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনে যুবদলের কেন্দ্রীয় সাধারন সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ও সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আলম এবং ভোলায় হায়দার আলী লেনিনসহ অন্যান্য এলাকার মনোনয়ন প্রার্থী বিএনপি নেতাদের মধ্যেও চলছে ঈদকেন্দ্রিক রাজনীতির লড়াই।
এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বড় দলে এই ধরনের প্রতিযোগিতা খুবই স্বাভাবিক। এতে করে সাংগঠনিক শক্তি যেমন বাড়ে তেমনি নেতৃত্বও পরিশোধিত হয়। তাছাড়া এই প্রতিযোগিতাই প্রমাণ করে যে বিএনপি জনরায়ে বিশ্বাসী। জন রায় আর জনগণের ভোট জরুরি বলেই বিএনপির নেতাদেরকে এভাবে জনগণের কাছে ছুটতে হচ্ছে।