
প্রিন্ট: ২৮ মার্চ ২০২৫, ০৪:৫১ পিএম
করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকা করার সুপারিশ সিপিডির
রাজস্ব আয়ে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে * রাজনৈতিক সরকার পরিস্থিতি উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রত্যাশা

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আগামী অর্থবছরের বাজেটে ব্যক্তি শ্রেণির করমুক্ত আয়ের সীমা আরও ৫০ হাজার টাকা বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা করার সুপারিশ করে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, পরোক্ষ করের পরিবর্তে সরকার প্রত্যক্ষ নির্র্ভরতা বাড়াতে হবে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। ধানমন্ডিতে প্রতিষ্ঠানের কার্যালয়ে রোববার এই ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। বক্তব্য রাখেন বিশেষ ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান।
অর্থনীতির বেশিরভাগ সূচক নেতিবাচক। কমছে রাজস্ব আদায়। মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে। বছর শেষে রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতি, প্রশাসনিক ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি বলে মনে করে সংস্থাটি। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকার পরিস্থিতি উন্নয়নে আরও কার্যকর পদক্ষেপ নেবে বলে আশা করছে সিপিডি।
ড. মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প প্রশাসন ক্ষমতা নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্নভাবে কর বসাচ্ছে। এই শুল্কযুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক যে প্রবৃদ্ধি তার ওপর একটি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধির ওপরেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রেও মূল্যস্ফীতি হবে এবং সাধারণ জনগণের যে চাহিদা সেটিও কমবে। ফলে আমরা যারা মার্কিন বাজারে রপ্তানি করছি সেখানেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। এতে রপ্তানির সুযোগ কিছুটা সীমিত এবং স্তিমিত হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা আছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, জুলাই-ফেব্রুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি ঊর্ধ্বমুখী ছিল। খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতির তুলনায় খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার বেশি। এছাড়া, শহরের চেয়ে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতির হার অনেক বেশি। সাধারণ মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে করমুক্ত আয়সীমা বাড়ানো যৌক্তিক বলে আমরা মনে করি। আগামী অর্থবছর এটি বাড়িয়ে ৪ লাখ টাকা নির্ধারণ করা উচিত। চলতি বাজেটে যা রয়েছে সাড়ে তিন লাখ টাকা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক জুন শেষে মূল্যস্ফীতির হার ৭-৮ শতাংশে নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনার কথা বলেছে, সেটি অর্জন করা কঠিন হবে। তিনি বলেন, এনবিআরের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং নীতি, প্রশাসনিক ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন জরুরি। এ ব্যাপারে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। তার মতে, বাংলাদেশকে ৪ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ঋণের জন্য আইএমএফের শর্তগুলোর মধ্যে একটি ছিল নীতি এবং বাস্তবায়ন পৃথক করা। এমন উদ্যোগ নীতি-স্বাধীনতা এবং নীতি-সারিবদ্ধতা উভয়কেই উন্নত করবে এবং কর ব্যবস্থার দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা নিশ্চিত করবে।
ফাহমিদা খাতুন আরও বলেন, বর্তমানে দেশে রাজস্ব আদায়ে ব্যাপক দুর্বলতা রয়েছে। বিশেষ করে সহজ কর নীতি দরকার। পাশাপাশি করের আওতা বাড়াতে হবে। বর্তমানে রাজস্ব আদায়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩২ দশমিক ২০ শতাংশ। তাহলে লক্ষণীয় যে, বাস্তবতার সঙ্গে অর্জনের বিস্তর ব্যবধান রয়েছে। এটা প্রতিবছর করা হয়। এটি দূর করতে হলে সামনে আদায়ের প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৫৫ দশমিক ৫৫ শতাংশ। যা আদায় করা অসম্ভব। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় কিছুটা গতি পেয়েছে। এদিকে জুলাই থেকে ডিসেম্বর সময়ে রাজস্ব ঘাটতি ২৯ হাজার ৫২৭ কোটি টাকা। আর গত বছর সেই ঘাটতি ছিল ৭ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। এই ঘাটতি পূরণে বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে বেশি অর্থ নেওয়া হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় মনে হচ্ছে, রাজস্ব আদায়ে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে।
মূল্যস্ফীতির বিষয়ে তিনি বলেন, চলতি অর্থবছরের জুলাই থেকে ফেব্রুয়ারি সময়ে গড়ে মূল্যস্ফীতি কমেছে। যা ছিল প্রায় ৯ শতাংশের কাছাকাছি। তবে গ্রামে এর চেয়ে বেশি ছিল। পক্ষান্তরে শহরে মূল্যস্ফীতি খানিকটা কম লক্ষ্য করা গেছে। আবার খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের বেশি ছিল। তবে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন পেলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। তখন মূল্যস্ফীতির নিম্নমুখী ধারা থাকবে না। আর মূল্যস্ফীতির চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য কোনোভাবে অর্জন করা যাবে না। ফাহমিদা খাতুন বলেন, দেশের বৈদেশিক মুদ্রায় একটা স্থিতিশীলতা এসেছে। যদিও বৈদেশিক বিনিয়োগ সম্প্রতি কমেছে। তবে রপ্তানি আয়ে ভালো সাড়া মিলেছে। চলতি অর্থবছরে রেমিট্যান্সের প্রবৃদ্ধি প্রায় ২২ দশমিক ২৬ শতাংশ। মূলত বৈদেশিক খাত পুনরুদ্ধারের লক্ষণ দেখা গেছে। এতে বৈদেশিক বাণিজ্য ঘাটতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। আগামী বাজেটে বিদেশি অর্থায়ন পাওয়া কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।