হাসিনার পতনের পর ভাঙচুরে লন্ডভন্ড
সংসদ ভবন সংস্কারে প্রয়োজন ৩০০ কোটি টাকা
অধিবেশন না থাকায় বরাদ্দ প্রত্যাহার, অপেক্ষা নতুন বাজেটের

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভাঙচুর ও লুটপাটে লন্ডভন্ড হয়ে যাওয়া জাতীয় সংসদ ভবন পুনরায় ব্যবহারোপযোগী করতে আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩০০ কোটি টাকার বেশি। সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ৫ আগস্ট ভাঙচুরের কারণে সংসদ সচিবালয়ের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়। এর ২ দিন পর সংসদ সচিব মন্ত্রী হোস্টেলে কর্মকর্তাদের নিয়ে একটি বৈঠক করেন। এরপর ভবন কিছুটা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ১৮ আগস্ট থেকে আংশিক কার্যক্রম শুরু হয়। তবে প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের অভাবে এখনো সচিবালয়ের স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হয়নি। লুট হওয়া কিছু মালপত্র উদ্ধার হলেও সেগুলোর বেশিরভাগ ব্যবহারের অযোগ্য। ফলে নতুন করে মালপত্র কেনাকাটা এবং ভবনের সংস্কার কাজে বড় বাজেট প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
সংসদ সচিবালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ চেয়ে এরই মধ্যে চিঠি পাঠানো হয়েছে। পুরো সংসদ ভবন মেরামতের জন্য ৩০০ কোটি টাকার বেশি প্রয়োজন হবে। এর মধ্যে বড় কাজ রয়েছে গণপূর্ত বিভাগের। এরপর সংসদ সচিবালয়ের আইটি খাতের। বাকিটা সংসদ সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো করবে। কিন্তু সংসদ সচিবালয়ে এই মুহূর্তে বাজেট নেই। অধিবেশন না থাকায় বেতন-ভাতার বাইরে চলতি অর্থবছরের বাজেটের বড় অংশই ফেরত নেওয়া হয়েছে। ফলে নতুন বাজেটের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
নজিরবিহীন গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনার দিন, ৫ আগস্ট হাজারো ছাত্র-জনতা জাতীয় সংসদ ভবনের ভেতরে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চালায়। এ সময় স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, চিফ হুইপ এবং হুইপদের কক্ষসহ ৯ তলা ভবনের প্রায় সব কক্ষ তছনছ করা হয়। সংসদ এলাকায় মন্ত্রী ও সংসদ-সদস্যদের কার্যালয়, সংসদীয় কমিটির সভাপতিদের অফিস, এমনকি বাসভবনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। লুটপাটকারীরা কম্পিউটার, এসি, আসবাবপত্র থেকে শুরু করে বাথরুমের বালতি, বদনা পর্যন্ত নিয়ে গেছে। বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের তার এবং সাউন্ড সিস্টেমও খুলে নিয়ে যায়।
সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, সংসদ ভবনের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে ৪ সেপ্টেম্বর একটি সভা হয়। ওই সভায় জানানো হয়, সংসদ ভবনে ভাঙচুর এবং লুটপাটের ঘটনায় সরকারি ও ব্যক্তিগত তহবিলসহ প্রায় ৯০ লাখ টাকা লুট হয়েছে। সভায় সংসদ ভবনের অভ্যন্তরে বিভিন্ন অফিস থেকে হারিয়ে যাওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত মালামালের বিস্তারিত তালিকা তৈরির সিদ্ধান্ত হয়। সংসদ সচিবালয় গঠিত কমিটি প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের পাশাপাশি পরবর্তী করণীয় সম্পর্কে সুপারিশ পেশ করে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ ভবনের ভেতরে ক্ষতিগ্রস্ত এসি, স্ট্যান্ড ফ্যান পরিবর্তন ও মেরামতের জন্য ২১৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে। নবম তলার সাব-স্টেশন, এমপি রুম, রিসেপশন, ওয়েটিং রুম, গণপূর্ত সার্কেল অফিসসহ মসজিদসংলগ্ন অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অফিসের বৈদ্যুতিক কাজের জন্য ৯০ লাখ টাকা খরচ হবে। বিভিন্ন ব্লকের মেইন সার্ভিস লাইন, সুইচ, সকেট, পয়েন্ট ওয়্যারিং, এলইডি লাইট, টিউবলাইট, সার্কিট ব্রেকার সরবরাহ ও সংস্কারে তিন কোটি ৮৩ লাখ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। সংসদ ভবনের টেলিফোন ও আইটি নেটওয়ার্ক নতুনভাবে স্থাপন করতে হবে। অধিবেশন কক্ষসহ ভবনের সাউন্ড সিস্টেম নতুন করে চালু করাও জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সংযোগ পুনঃস্থাপনের জন্য প্রয়োজন হবে নতুন সরঞ্জাম। দরজা-জানালা, বিভিন্ন দপ্তরের মেরামত ও আসবাবপত্র কেনাকাটাও সংস্কার কার্যক্রমের অংশ।
এছাড়া রাস্তা, মাঠ, গেট, লেক, সিকিউরিটি লাইট, ফোকাস লাইট, স্ট্রিট লাইট, গার্ডেন লাইট, সার্ভিস লাইন, সার্কিট ব্রেকার সংস্কারে তিন কোটি ৪৭ লাখ টাকা; সিকিউরিটি গেট, পোস্টের মেটাল গেট ও গার্ডেনের বৈদ্যুতিক সংস্কারের জন্য ৮৭ লাখ টাকা খরচ হবে। বিভিন্ন ব্লকের লিফটের যন্ত্রাংশ, এডিআর, সড়কবাতি ও ফ্লাডলাইট, সিসিটিভি পরিবর্তনসহ আনুষঙ্গিক বৈদ্যুতিক কাজের জন্য আরও দুই কোটি ৯৩ লাখ টাকা ব্যয় হবে।
এর বাইরে সংসদ ভবনের সচিব হোস্টেল, এলডি হল, মেডিকেল সেন্টার, মিডিয়া সেন্টার, টিডি স্টুডিও, ব্যাংকের বৈদ্যুতিক সংস্কারের জন্য চার কোটি ৮৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে। সচিব ও যুগ্ম সচিব হোস্টেল, কর্মচারী কোয়ার্টারের বাসার বৈদ্যুতিক স্থাপনার মেরামত ও বৈদ্যুতিক কাজের জন্য তিন কোটি ৭৬ লাখ টাকা লাগবে। ভবনের গেট নম্বর ১, ৬, ৭, ১২-এর জন্য স্ক্যানার, আর্চওয়েসহ অন্যান্য সিকিউরিটি ডিভাইসের বৈদ্যুতিক সংস্কারে প্রয়োজন হবে আরও ছয় কোটি ১১ লাখ টাকা। প্ল্যানারি হলের ক্ষতিগ্রস্ত কনফারেন্স সিস্টেম পরিবর্তন এবং বিভিন্ন কমিটি কক্ষের কনফারেন্স সিস্টেম পরিবর্তনে ২২ কোটি ৫০ লাখ টাকা খরচ হবে। ভবনের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার, উচ্চমান আবাসিক ভবনের ১০টি বাসার ক্ষতিগ্রস্ত বৈদ্যুতিক স্থাপনা মেরামতের জন্য দুই কোটি ৯২ লাখ টাকা এবং এমপি হোস্টেলের ১৯২টি রুমের বৈদ্যুতিক সংস্কারের জন্য আরও ছয় কোটি ৮৩ লাখ টাকা খরচ হবে।