ক্ষমা ও করুণার রাত শবেবরাত

ফয়জুল্লাহ রিয়াদ
প্রকাশ: ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
পাপ কাজের প্রতি তীব্র আকর্ষণ মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। এভাবেই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে। মানুষ পাপে নিমজ্জিত হলেও, আল্লাহতায়ালা অতিশয় দয়ালু ও পরম ক্ষমাশীল। তিনি বান্দাকে ক্ষমা করতে ভালোবাসেন। মানুষ যখন পাপের কারণে অনুতপ্ত হয়ে তার দরবারে ফিরে এসে লুটিয়ে পড়ে ক্ষমা চায়, তিনি তখন খুশি হন এবং বান্দার সব গোনাহ ক্ষমা করেন। আল্লাহতায়ালা বান্দাকে ক্ষমা করার উপায় খোঁজেন। এজন্য তিনি বছরের বিভিন্ন দিন ও রাতকে ফজিলতপূর্ণ এবং মহিমান্বিত করে মানুষের প্রতি রহমত বর্ষণ ও ক্ষমতাপ্রাপ্তির সুযোগ করে দিয়েছেন। যেমন-প্রতিদিন শেষ রজনিতে আল্লাহতায়ালা বান্দাকে ডাকতে থাকেন, আছে কি কোনো অনুতপ্ত বান্দা, যে ক্ষমাপ্রাপ্তির সুসংবাদ নেবে? আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত, যে বিপদ থেকে মুক্তি পেতে চায়? আছে কি কোনো জীবিকা অন্বেষী, যে আমার অফুরন্ত ভান্ডার থেকে জীবিকার নিশ্চয়তা নেবে? এমনভাবে মানুষের ছোটখাটো আমলের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা তাদের বড় বড় পুরস্কার প্রদান করেন এবং তাদের পাহাড়সম পাপরাশি ক্ষমা করতে থাকেন। হাদিস শরিফে এসেছে, মানুষ যখন ওজু করে, প্রতিটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে প্রবাহিত পানির সঙ্গে তার গোনাহগুলো ধুয়েমুছে সাফ হতে থাকে। এমনভাবে অন্য আমলের মাধ্যমেও মানুষের পাপরাশি ঝরতে থাকে। ক্ষমা লাভের এমনই একটি সুযোগ হলো শাবান মাস। এটি রমজান মাসের ইবাদত-বন্দেগির ভূমিকা। মহানবি (সা.) এ মাসে বরকত লাভের দোয়া করতেন। হাদিস শরিফে, হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন ‘রাসূলুল্লাহ (সা.) রজব মাস আগমনে পর এ দোয়া করতেন, হে আল্লাহ! রজব এবং শাবানে আপনি আমাদের বরকত দান করুন এবং আমাদের রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।’ (শুআবুল ইমান, হাদিস : ৩৮১৫)। শাবান মাসের ১৫ তারিখ শবেবরাত। শব শব্দটি ফার্সি, এর অর্থ হলো রাত। বরাত শব্দটি আরবি ও ফার্সি উভয় ভাষায় ব্যবহৃত হয়। তবে দুই ভাষার অর্থের মধ্যে একটু পার্থক্য রয়েছে। বরাত শব্দটি আরবি ‘বারাআতুন’ থেকে ব্যবহৃত হলে এর অর্থ হবে মুক্তি। এক্ষেত্রে শবেবরাত অর্থ হবে মুক্তির রজনি। ফার্সিতে বরাত অর্থ ভাগ্য। সুতরাং শবেবরাত অর্থ হবে ‘ভাগ্যরজনি’। শব্দের উৎপত্তি যেখান থেকেই হোক এটা নিশ্চিতভাবেই বলা যায় যে, শবেবরাত শব্দটি কুরআন ও হাদিসে ব্যবহৃত কোনো শব্দ নয়। বরং এ রাতের ফজিলতের প্রতি লক্ষ রেখে কেউ এ নামটি উদ্ভাবন করেছেন, পরবর্তী সময়ে লোকমুখে তা প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। সরাসরি হাদিসের পরিভাষায়, এ রাতকে ‘অর্ধ শাবানের রাত’ বলা হয়েছে। শবেবরাতের বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলত রয়েছে। এ রাতে মুশরিক এবং বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেওয়া হয় মর্মে হাদিস শরিফে ঘোষণা এসেছে। হজরত মুয়াজ ইবনে জাবাল (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা অর্ধ শাবানের রাতে (শবেবরাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ছাড়া সবাইকে ক্ষমা করে দেন’। (সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস : ৫৬৬৫)। অন্য হাদিসে হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যখন অর্ধ শাবানের রাত আসে, তোমরা এ রাতে ইবাদত করো এবং দিনে রোজা রাখ। এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহতায়ালা প্রথম আসমানে আসেন এবং ঘোষণা করেন, আছে কি কোনো ক্ষমাপ্রার্থী? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো জীবিকা অন্বেষী? আমি তাকে জীবিকা দেব। আছে কি কোনো বিপদগ্রস্ত? আমি তাকে বিপদ থেকে রক্ষা করব। এভাবে সকাল পর্যন্ত আল্লাহতায়ালা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে বলে ডাকতে থাকেন’ (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ১৩৮৮)। সুতরাং, আমাদের উচিত বিশেষ এ রাতে আল্লাহতায়ালার কাছে তওবা, ক্ষমাপ্রার্থনা, কান্নাকাটি ও দোয়ার মাধ্যমে নিজেদের পাপ মোচন করা এবং আল্লাহর রহমত প্রত্যাশী হওয়া। রাসূলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামরা (রা.) প্রতিরাতেই বিভিন্ন ধরনের নফল ইবাদতে লিপ্ত থাকতেন। মহানবি (সা.) প্রতি রাতের ইবাদতের প্রতি সাহাবিদের উদ্বুদ্ধ করতেন। যেমন-হাদিস শরিফে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘হে লোক সকল! সালামের ব্যাপক প্রচলন ঘটাও, লোকদের খানা খাওয়াও, রাতে মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন নামাজ আদায় কর, তাহলে জান্নাতে নিরাপদে প্রবেশ করবে’। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৪৮৫)। প্রতি রাতে ইবাদতে অভ্যস্ত হওয়া সত্ত্বেও রাসূলুল্লাহ (সা.) যখন এ রাতের বিশেষ ফজিলতের কথা বর্ণনা করেছেন, স্বভাবতই তখন এ রাতের আলাদা গুরুত্ব সাহাবিদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। তবে এ রাতের ইবাদত যেহেতু একান্ত নির্জনে করা হতো, তাই তাদের আমল ও ইবাদতের কথা ব্যাপকভাবে হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়নি। তবে একেবারেই যে বর্ণিত হয়নি, তাও কিন্তু না। রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকেও এ রাতের বিশেষ আমল প্রমাণিত রয়েছে। যেমন-হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, ‘কোনো এক রাতে আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)কে (বিছানায় আমার পাশে) না পেয়ে বের হলাম এবং (খুঁজতে খুঁজতে) জান্নাতুল বাকিতে গিয়ে তাকে পেলাম। তিনি বললেন, তোমার কি এ আশঙ্কা হয়েছে যে, আল্লাহ ও তার রাসূল তোমার হক বিনষ্ট করবেন? আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ধারণা হয়েছে যে, আপনি হয়তো অন্য কোনো স্ত্রীর কাছে গমন করেছেন। মহানবি (সা.) তখন বললেন, অর্ধ শাবানের রাতে আল্লাহতায়ালা দুনিয়ার আসমানে আসেন এবং কালব গোত্রের বকরির পশমের চেয়ে বেশি গোনাহ মাফ করে দেন’। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ৭৩৯)। এমনভাবে এ রাতের আরও অন্য আমল ও ফজিলতের কথা বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। এজন্য প্রতি মুমিনের উচিত, এ রাতে একান্ত গোপনে আল্লাহর দরবারে হাজিরা দেওয়া। বিভিন্ন ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার দয়া, ক্ষমা ও অনুগ্রহ অন্বেষণ করা এবং এ রাতে ইবাদত বন্দেগি নিয়ে বাড়াবাড়ি না করা। আমাদের দেশে শবেবরাত এলে ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি বানান এবং তা প্রতিবেশী ও ফকির-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ প্রথাটা সুদীর্ঘ অতীত থেকে চলে এসেছে। এ হালুয়া-রুটি আমাদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সাহিত্যের অংশে পরণিত হয়েছে। হালুয়া-রুটি উপাদেয় খাবার কোনো সন্দেহ নেই। হালুয়া-রুটি নিজেরা খাওয়া, গরিব-মিসকিনদের মাঝে বিতরণ করা সওয়াবের কাজ তাতেও কোনো বাধা নেই। কিন্তু কোনো বিশেষ খাবার নির্দিষ্ট দিনে খেতে হবে এবং বিতরণ করতে হবে ইসলামি শরিয়তে এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই এবং এ ধরনের বিশ্বাস বিদআতের শামিল বলেই মুহাক্কিক আলিমদের অভিমত। শবেবরাতকে কেন্দ্র করে আমাদের সমাজে সব থেকে খারাপ যে কাজ হয় তার মধ্যে অন্যতম হলো পটকা ফুটানো ও আতশবাজি। এগুলো নিষিদ্ধ ও হারাম।