
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৮:৩০ এএম
আন্তন চেখভ-এর হাসির গল্প
বহুরূপী
পুরো নাম আন্তন পাভলোভিচ চেখভ। জগদ্বিখ্যাত রুশ নাট্যকার, গল্পকার ও চিকিৎসক। বিশ্বের দেশে দেশে ছড়িয়ে আছে আন্তন চেখভের অসংখ্য পাঠক। বিচ্ছুর চলতি সংখ্যায় পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো তার একটি হাসির গল্প।

যুগান্তর ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
পুলিশ ইন্সপেক্টর ওচুমেলভ হেঁটে যাচ্ছিলেন বাজারের মধ্য দিয়ে। গায়ে ওভার কোট, হাতে পুঁটলি এবং পেছনে এক কনস্টেবল। চুলের রং লাল, হাতের চালুনিটা ভর্তি হয়ে গেছে বাজেয়াপ্ত করা গুজবেরিতে। কোথাও কোনো সাড়া-শব্দ নেই। বাজার একেবারে খালি। ছোট ছোট দোকান আর সরাইখানার দরজাগুলো যেন একেবারে ক্ষুধার্ত মুখের মতো দিন-দুনিয়ার দিকে হা করে তাকিয়ে আছে। ধারে কাছে একটি ভিখিরি পর্যন্ত দাঁড়িয়ে নেই।
হঠাৎ একটি অচেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো, ‘কামড়াতে এসেছ হতচ্ছাড়া, বটে? ওকে ছেড় না হে। কামড়ে বেড়াবে সে আইন নেই আর। পাকড়ো! হেই!’
কুকুরের ঘ্যান ঘ্যান ডাকও শোনা গেল একটা। ওচুমেলভ সেদিকে তাকিয়ে দেখতে পেলেন পিচুগিন দোকানির কাঠগুলো থেকে বেরিয়ে এসে একটি কুকুর তিন ঠ্যাঙে লাফাতে লাফাতে ছুটছে আর তার পিছু পিছু তাড়া করছে একটি লোক। লোকটার গায়ে মড়মড়ে ইস্ত্রির ছাপা কাপড়ের জামা, ঝুল কোটের বোতাম সব খোলা, সারা শরীর ঝুঁকে পড়েছে সামনের দিকে। হুমড়ি খেয়ে পড়ে লোকটা কুকুরের পেছনের পা-টা চেপে ধরল। কুকুরটা আবার ঘেউ ঘেউ করে উঠল। আবার চিৎকার ভেসে এলো, ‘পাকড়ো! পাকড়ো!’
দোকানগুলো থেকে উঁকি মারতে লাগল নানা তন্দ্রাচ্ছন্ন মুখ। কনস্টেবল বলল, ‘বে আইনি হল্লা বলে মনে হচ্ছে হুজুর।’
ওচুমেলভ ঘুরে দাঁড়িয়ে দুমদুম করে এগিয়ে গেলেন জটলার কাছে।
কাঠগোলার ফটকটার ঠিক সামনেই তার নজরে পড়ল বোতাম খোলা ঝুল কোট পরা সেই মূর্তিটি দাঁড়িয়ে ডান হাত উঁচু করে তার রক্তমাখা একটি আঙুল সবাইকে দেখাচ্ছে। তার মাতাল চোখ যেন বলছে, ‘শালাকে দেখে নেব।’
লোকটাকে অবশ্য ওচুমেলভ চেনেন। স্যাকরা খ্রিউকিন। ভিড়ের ঠিক মাঝখানটায় বসে আছে আসামি। বর্জোই জাতের একটা বাচ্চা কুকুর। চোখা নাক, পিঠের ওপর একটা হলদে ছাপ। সর্বাঙ্গ কাঁপছে। সামনের দু’পা ফাঁক করে বসে আছে। সজল দুই চোখে ক্লেস আর আতঙ্কের ছাপ।
ভিড় ঠেলে ঢুকতে ঢুকতে ওচুমেলভ জিজ্ঞেস করলেন, ‘ব্যাপারটা কী? কী লাগিয়েছ তোমরা? আঙুল তুলে রেখেছিস কী জন্য খ্রিউকিন? চিল্লাচ্ছিস কে?’
খ্রিউকিন মুঠো করা হাতের ওপর একটু কেশে নিয়ে শুরু করল, ‘আমি হুজুর হেঁটে যাচ্ছিলাম নিজের মনে। কারোর কোনো ক্ষতি না করে। ওই তো ওই রয়েছে মিত্রি মিত্রিচ, ওর লাকড়ির দরকার ছিল। তা হুজুর, খামোখা এ কুত্তার বাচ্চাটা এসে কামড়ে দিল আমাকে। বুঝুন হুজুর, মেহনত করে খেতে হয় আমাদের। আমার ব্যবসার কাজটিও তেমন সাদামাটা নয় হুজুর, এর জন্য ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করুন হুজুর। যা অবস্থা তাতে আঙুল তো আর সপ্তাহখানেক নড়াচড়া করা যাবে না। আইনে তো এসব নাই হুজুর, এসব বুনো জানোয়ারদের অত্যাচার আমাদের সহ্য করতে হবে! সব কিছু যদি কামড়াতে লেগে যায় তবে জীবনের সুখ বলে তো কিছু থাকে না হুজুর।’
‘হুম, বটে!’ গলা খাঁকারি দিয়ে ভুরু কুঁচকে ওচুমেলভ বললেন কড়া সুরে, ‘বটে আচ্ছা, কার কুকুর এটা? আমি এত সহজে ছাড়ছি না। কুকুর ছেড়ে রাখার মজা দেখিয়ে ছাড়ব আজ। যেসব ভদ্রলোক আইন মেনে চলতে চায় না তাদের ওপর নজর দেওয়ার সময় হয়েছে। শালার ওপর এমন জরিমানা করব যে শিক্ষা হয়ে যাবে। যত রাজ্যের গরু, ভেড়া, কুকুর সব ছেড়ে রাখার মানে কী! কত ধানে কত চাল টের পাওয়াচ্ছি আজ।’
কনস্টেবলের দিকে তাকিয়ে ওচুমেলভ বললেন, ‘এলদীরিন, খোঁজ লাগাও হে কার কুত্তা! আর একটা এজাহারও লিখে ফেল। যা মনে হচ্ছে এ কুকুর ক্ষেপা না হয়ে যায় না। ওটাকে সাবাড় করে ফেলা দরকার এখনই। কার কুকুর এটা, জবাব দাও কার কুকুর?’
ভিড় ঠেলে কে যেন বলে উঠল, ‘মনে হচ্ছে এটা জেনারেল ঝিগালভের কুকুর।’
‘জেনারেল ঝিগালভ! হুম, এলদীরিন, আমার কোর্টটা খুলে দাও। উহ্! কী গরম! মনে হচ্ছে বৃষ্টি হবে আজ।’ এই বলে ওচুমেলভ খ্রিউকিনের দিকে তাকালেন, ‘কিন্তু একটা ব্যাপার আমার মাথায় ঢুকছে না। তোকে কামড়াল কী করে! একেবারে হাতে আঙুলে গিয়ে কামড়াল এটা কী রকম ব্যাপার! এটুকু একটা বাচ্চা কুকুর আর তুই বেটা জোয়ান মদ্দ লোক। আলবত এ আঙুলে তুই পেরেক-টেরেক খুঁচিয়ে এখন মতলব করছিস ক্ষতিপূরণ আদায়ের। তোদের চিনতে তো আমার বাকি নেই। শয়তানের ঝাড় এক একটা।’
‘ও লোকটা হুজুর তামাশা করে কুকুরের মুখে সিগারেটের ছ্যাঁকা দিতে গিয়েছিল। কুকুরটাও অমনি কামড় বসিয়ে দিয়েছে। ওই খ্রিউকিন চিরকালই বদমায়শি করে বেড়ায় হুজুর।’ কেউ একজন বলল।
‘মিছে কথা বলছিস ট্যারা চোখ কোথাকার। আমাকে ছ্যাঁকা দিতে দেখেছ! তবে মিছে কথা বলছ কেন! হুজুরের বিচার বিবেচনা আছে, তিনি নিশ্চয়ই একটা বিহিত করবেন।’
‘তর্ক কর না, তর্ক কর না বলছি।’
‘উঁহু, এটা জেনারেল ঝিগালভের কুকুর না।’ কনস্টেবল বলল বিচক্ষণের মতো, ‘অমন কোনো কুকুরই নেই ঝিগালভের। ওনার সবকটা শিকরি কুকুর।’
‘ঠিক জানিস?’
‘জি হুজুর।’
‘ঠিকই বটে। আমি তাই ভাবছিলাম। ঝিগালভের কুকুরগুলো সব দামি উঁচু জাতের। আর এটার দিকে তাকাতেই ইচ্ছা করছে না। অমন কুকুর কেউ পোষে নাকি! তোদের মাথা খারাপ!
মস্কো কি পিটার্সবার্গে ওরকম কুকুর দেখা গেলে কী হতো জান? আইন দেখত না ছাই পেলেই দফা শেষ করে ছাড়ত। খ্রিউকিন, তোমাকে কামড়েছে, মনে রেখ সহজে আমি ছাড়ব না।
শিক্ষা দেওয়া দরকার। অনেক বেড়েছে এরা! জবাব দাও এটা কার কুকুর...?’