
প্রিন্ট: ০৫ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:৫৫ এএম
নির্বাচনমুখী রাজনীতি জমজমাট
ঈদের মাঠে ভোটের হাওয়া
বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা ভোটারদের দোয়া চাচ্ছেন * ঈদ পুনর্মিলনী, মতবিনিময় সভা-সেমিনারে অংশ নিয়ে চালাচ্ছেন কৌশলী প্রচারণা

তারিকুল ইসলাম
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ফাইল ছবি
ঈদের মাঠে বইছে ভোটের হাওয়া। এবার বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির সম্ভাব্য প্রার্থীরা এলাকার জনসাধারণের সঙ্গে ঈদ উদযাপন করেছেন। এতে ঈদের পাশাপাশি ভোটের আমেজও সৃষ্টি হয়েছে। এসব রাজনৈতিক দলের নেতারা প্রত্যেকেই আগামী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জনসাধারণের কাছে সহযোগিতা চাইছেন। ঈদ পুনর্মিলনী, মতবিনিময় সভা এবং নানা ধরনের সেমিনারে অংশ নিয়ে তারা কৌশলে নিজের প্রার্থিতা ঘোষণা করছেন। এতে ঈদকেন্দ্রিক ভোটের রাজনীতি জমে উঠেছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কবে হবে, এ নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট নির্দেশনা না পাওয়া গেলেও মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মুক্ত পরিবেশে সাধারণ মানুষসহ কর্মী-সমর্থকদের আরও চাঙা করতে নিজ নির্বাচনি এলাকায় ছুটে গেছেন, দিচ্ছেন নানা প্রতিশ্রুতি। শুভেচ্ছা বিনিময়ের নামে এলাকায় ব্যাপক প্রচার ও গণসংযোগ চালাচ্ছেন। সুনির্দিষ্ট নির্বাচনি রোডম্যাপ দাবির পাশাপাশি ভোটের পক্ষে গণসংযোগে নামাটাই বিএনপি নেতাদের লক্ষ্য। দলের সিংহভাগ নেতাই ঈদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচনি এলাকার মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছেন। সেই সঙ্গে নির্যাতিত ও গুম-খুনের শিকার নেতাকর্মীর পরিবারের পাশেও দাঁড়াচ্ছেন। অন্যদিকে জামায়াতের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও তৃণমূল নেতাকর্মীর সঙ্গে ঈদ আনন্দ ভাগাভাগি করতে এলাকায় গেছেন। লম্বা ছুটি কাজে লাগিয়ে কর্মী-সমর্থকদের আরও চাঙা করতে চাচ্ছে দলটি। বসে নেই তরুণদের নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপির নেতারাও। দলটির অধিকাংশ নেতা এবার নিজ এলাকায় ঈদ উদযাপন করেছেন। এছাড়া তিনটি দলের বাইরে অন্য রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও নিজ নির্বাচনি এলাকায় গিয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যারা ঈদের দিনটি নিজ এলাকায় কাটিয়েছেন, তারা ঈদ উৎসবে যোগদানের পাশাপাশি গণসংযোগ ও মতবিনিময়ের কাজটাও সেরে নিয়েছেন। সবাই দুস্থদের মধ্যে জাকাত ও ফিতরা বিতরণ করেছেন। সামাজিক-রাজনৈতিক-ধর্মীয় অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে, ঈদ কার্ড, এসএমএস পাঠিয়ে এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ব্যানার-পোস্টারের মাধ্যমে গণসংযোগ করছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। ঈদ বকশিশের নামে অনেক প্রার্থী দিয়েছেন নগদ টাকা। নেতাকর্মীর পাশাপাশি সাধারণ ভোটারদের জন্য ঈদের দিন ভোজের আয়োজনও করেছেন অনেকে। চট্টগ্রামের নিজ এলাকায় গেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ফ্যাসিস্টের পতনের পর এখন দেশে নির্বাচনি হাওয়া বইছে। সবার মধ্যে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে। উৎসবমুখর পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। এখন নির্বাচনি হাওয়া বইতে শুরু করেছে। সবার মধ্যে নির্বাচনের উৎসাহ ও আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। সবার মনে হচ্ছে, দেশ নির্বাচনের দিকে যাচ্ছে। এখানে যেভাবে উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হতো, আজ মনে হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষ সেভাবে বহু বছর পর নির্বাচনের সেই আনন্দঘন পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। গণতন্ত্রের স্বাদ পাচ্ছেন। তবে পুরো পরিবেশ আসেনি। এজন্য দ্রুত নির্বাচনি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ঈদের পরদিন গেছেন ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ এলাকায়। সেখানে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতমিনিময় করছেন। ছুটে গেছেন বিভিন্ন জায়গায়, দেখা করেছেন দলমতনির্বিশেষে সব পর্যায়ের মানুষের সঙ্গে। সেখানে দলের পক্ষ থেকে দেওয়া প্রতিশ্রুতিও তারা পালন করবেন বলে জানিয়েছেন। বিভিন্ন অপপ্রচার থেকে সতর্ক থাকার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে দ্রুত নির্বাচন হওয়ার প্রত্যাশার কথা তুলে ধরেন।
ঈদের দিন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান তার নির্বাচনি এলাকায় (ঢাকা-১৫) নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জুলাই আন্দোলনে শহিদপরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করেন তিনি। শহিদপরিবারের বাসা-বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সার্বিক খোঁজখবর নেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার ঈদ করেন নিজ বাড়ি খুলনার ফুলতলা উপজেলায়। শহিদপরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি এলাকাবাসী ও নেতাকর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দীর্ঘ বছর পর খোলা পরিবেশে সব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে ঈদ করতে পেরেছি এবার। এতদিন জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী শিবিরের সব নেতাকর্মীর মনের মধ্যে অজানা ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে চলতে হতো। মানুষের মন থেকে সেই ভয় কেটেছে। ছাত্র-জনতার আন্দোলন এদেশের মুক্তিকামী মানুষের মধ্যে নির্ভয়ে চলার প্রেরণা জুগিয়েছে।
এনসিপির সদস্যসচিব আখতার হোসেন ঈদের আগেই নিজ এলাকা রংপুরে যান। বিভিন্ন এলাকার পাশাপাশি তিনি নিজ নির্বাচনি এলাকা রংপুর-৪ আসনের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। আখতার বলেন, মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করছি। মানুষও ভালোভাবে গ্রহণ করেছে। এভাবেই সবসময় পাশে থাকতে চাই।
এছাড়াও দলটির সিনিয়র যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক আবদুল হান্নান মাসউদ নোয়াখালী-৬, এনসিপির উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম পঞ্চগড়-১, আরেক মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ কুমিল্লা-৪, মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী চাঁদপুরে এবং ঢাকা-১৩ আসনে যুগ্ম সদস্যসচিব আকরাম হুসাইনসহ আরও অন্তত ৪০ নেতা গেছেন তাদের নির্বাচনি এলাকায়।
কুমিল্লা-৪ আসনে এবারের ঈদে চমক সৃষ্টি করেছেন এনসিপির হাসনাত আবদুল্লাহ। চাঁদরাতে র্যালি, ইসলামী সংগীতানুষ্ঠান, নিজ গ্রামে ঈদ উদযাপন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিহত শহিদপরিবারবর্গের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়, ঈদ পুনর্মিলনী, মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করে সাড়া জাগিয়েছেন। আসনটিতে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী সাবেক এমপি ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সীর ছেলে ব্যারিস্টার রিজভীউল আহসান মুন্সী ও কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি। জামায়াতের প্রার্থী সাইফুল ইসলাম শহীদও এলাকায় ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন।
এনসিপির সারজিস আলম পঞ্চগড়-১ আসনে ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। এলাকাজুড়ে শুভেচ্ছা সংবলিত পোস্টার সবার নজর কেড়েছে। শুধু তাই নয়, সারজিস বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইফতার পার্টিতে যোগদান করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। ঈদের দিন তিনি নিজ গ্রাম থেকে রওয়ানা দিয়ে পঞ্চগড় কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে যান। সেখানে নামাজ শেষে উপস্থিত মুসল্লিদের সঙ্গে সৌহার্দ বিনিময় ও কোলাকুলি করেন। একই আসনে প্রচার-প্রচারণায় কম যাননি বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার নওশাদ জমির। জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই প্রত্যন্ত এলাকায় ব্যাপক জনসংযোগ চালিয়ে যাছেন। রমজানজুড়ে আলোচনা সভা, ইফতার মাহফিলসহ আগাম নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণায় ব্যস্ত সময় পার করেছেন। এছাড়া জামায়াতে ইসলামীও কোনো অংশে কম যায়নি। দলটি ফেব্রুয়ারিতেই তাদের প্রার্থী হিসাবে জেলা আমির মাওলানা ইকবাল হোসাইনকে মনোনীত করে রেখেছে এবং সে অনুযায়ী তিনি আগাম নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন।
কুমিল্লা-১১ আসনে জামায়াতের নায়েবে আমির সাবেক এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ও বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা নিয়াজ মাখদুম মাসুম কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে পৃথকভাবে এলাকায় ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করছেন। ফলে সম্ভাব্য প্রার্থীদের পদচারণায় এখনো মুখরিত দেশের সব নির্বাচনি এলাকা।
এদিকে বিএনপির গয়েশ্বর চন্দ্র রায় (ঢাকা-৩), মির্জা আব্বাস (ঢাকা-৮ ও ৯), সালাউদ্দিন আহমেদ (কক্সবাজার-১), বরকতউল্লা বুলু (নোয়াখালী-৩), খায়রুল কবির খোকন (নরসিংদী-১), শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি (লক্ষ্মীপুর-৩), রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু (নাটোর-২), জহির উদ্দিন স্বপন (বরিশাল-১), ব্যারিস্টার কায়সার কামাল (নেত্রকোনা-১), অ্যাডভোকেট আব্দুস সালাম আজাদ (মুন্সীগঞ্জ-২), রকিবুল ইসলাম বকুল (খুলনা-৩), আজিজুল বারী হেলাল (খুলনা-৪), ফজলুল হক মিলন (গাজীপুর-৫), কাজী সাইয়েদুল আলম বাবুল (গাজীপুর-১), আমিরুল ইসলাম খান আলিম (সিরাজগঞ্জ-৫), কাদের গণি চৌধুরী চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি, সাইফুল ইসলাম ফিরোজ (ঝিনাইদহ-৪), আমিনুল হক (ঢাকা-১৬), শহিদুল ইসলাম বাবুল (ফরিদপুর-৪), এসএম জাহাঙ্গীর (ঢাকা ১৮)-সহ ৩০০ আসনেই এবারের ঈদে সম্ভাব্য প্রার্থীরা দলীয় নেতাকর্মী ও সমর্থক এবং নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল স্থানীয় প্রায় ৫ হাজার দুস্থ-অসহায় দরিদ্র পরিবারের মাঝে ঈদের নতুন জামাকাপড় বিতরণ করেন। এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নানা সমস্যা নিয়ে হাজির হয়েছিলেন, সেগুলো সমাধানেরও আশ্বাস দেন তিনি। বকুল বলেন, ‘দেড় যুগ পর খুলনায় ঈদের নামাজ পড়েছি। ইতঃপূর্বে খুলনা-৩ (খালিশপুর-দৌলতপুর) সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেছি। এ এলাকার গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা রয়েছে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনামলে কখনোই প্রকাশ্যে ঘুরতে পারিনি। এবছর সেটা সম্ভব হয়েছে।’
জামায়াত নেতাদের মধ্যে মাওলানা শামসুল ইসলাম চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, এটিএম মাছুম কুমিল্লা, অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জম হোসাইন হেলাল বরিশালের নিজ এলাকায় সর্বসাধারণের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান (সিরাজগঞ্জ-৪), মাওলানা মুহাম্মদ শাহজাহানও (চট্টগ্রাম-১০) নিজ নির্বাচনি এলাকায় নানা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেন।