
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৬:০২ পিএম
প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের চীন সফর
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন উচ্চতায়
বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে -সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ * চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মানে ভারতের বিরুদ্ধে-এমন নয়, সম্পর্ক হবে নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় -অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট নিরসন এবং তিস্তাসহ নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। দুই দশমিক এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি মিলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এক দেশনির্ভর পররাষ্ট্রনীতির বদলে সৃষ্টি হয়েছে বিকল্প বা বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির ।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ বলেছেন, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হিসাবে এটা তার প্রথম সফর। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সম্পর্ক ৫০ বছর ধরে বিদ্যমান। বাংলাদেশের প্রতিটি সরকারই চীনের সঙ্গে সম্পর্কের প্রতি জোর দিয়েছে। সেই অর্থে এই সফর একটি ধারাবাহিকতা। কিন্তু শেখ হাসিনার শাসনকালের পর ভারতের সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের সম্পর্কের বিষয় বিবেচনায় সফরটির আলাদা তাৎপর্য রয়েছে।
তিনি বলেন, প্রফেসর ইউনূসের ব্যক্তিত্বের কারণে সফরটির মর্যাদা বেড়েছে। পররাষ্ট্রনীতিতে বিকল্প অবশ্যই রাখতে হয়। একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরশীল না থেকে বহুমুখী সম্পর্ক করতে চায়। এটা ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করবে। নিরাপত্তা, বাণিজ্য, পররাষ্ট্রনীতি প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিকল্প থাকলে তার গুরুত্ব বেশি। প্রফেসর ইউনূসের সফরে অর্থনীতির বিষয়ে সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে। চীনের শিল্প বাংলাদেশে স্থানান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। এভাবে চীনের পণ্য পশ্চিমে রফতানি করা সম্ভব। বাংলাদেশও কর্মসংস্থান এবং প্রযুক্তি পাবে। এ ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেছে। এটা একটা বিরাট সফলতা।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম শফিউল্লাহ আরও বলেন, ‘প্রফেসর ইউনূস রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেছেন। চীনের সঙ্গে মিয়ানমারের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। এই সম্পর্ক সামরিক ও অর্থনৈতিক দুই-ই। মিয়ানমারে চীনের বিপুল বিনিয়োগ আছে। চীনের সহায়তায় রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানের সম্ভাবনা অনেক বেশি। তাই আলোচনাও গুরুত্ব বহন করে’।
তিনি বলেন, ‘তিস্তা প্রকল্প নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। ২০১৯ সালে তিস্তা প্রকল্প গ্রহণের লক্ষ্যে একটি সমীক্ষা করার জন্য বাংলাদেশ চীনকে অনুরোধ করে। চীন সেই সমীক্ষা করেছে। তারপর ২০২৩ ও ২০২৪ সালে এ নিয়ে কোনো কাজ হয়নি। ২০২৪ সালে তিস্তা প্রকল্পের জন্য ভারত থেকেও প্রস্তাব আসে। শেখ হাসিনা তখন বলেছেন, তিস্তা প্রকল্পটি ভারত করলেই ভালো হবে। এভাবে তা আটকে ছিল। এখন প্রফেসর ইউনূস চীনকে তিস্তাসহ সব নদ-নদীর জন্য আগামী ৫০ বছরের পরিকল্পনা দেওয়ার অনুরোধ করেছেন।
তিনি বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বরাবরই সব দলের সরকারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রয়েছে। চীনের এক চীন নীতির প্রতি বাংলাদেশের সব দল একমত পোষণ করে। শেখ হাসিনার শেষ আমলে সেই ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এক দেশের ওপর নির্ভরশীল হয়ে যায় পররাষ্ট্রনীতি। বাস্তবে চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মানে আমরা ভারতের বিরুদ্ধে নই। কোনো রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নই। তবে আমরা এক ঝুড়িতে সব ডিম রাখব না। আমাদের কৌশলগত বিকল্প অবশ্যই থাকতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেছেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চীন সফরের একটি প্রতীকী মূল্য আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সম্পর্কের ৫০ বছর উপলক্ষ্যে একটি ধারাবাহিকতার সফর। ধারাবাহিকতার সফর হিসাবে এর চেয়ে বেশি কিছু প্রত্যাশা ছিল না। দুই দশমিক এক বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়া গেলেও বিনিয়োগের পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার ডিসেম্বরে কিংবা জুনে বিদায় নেবে। তারপর নির্বাচিত সরকারকে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন করতে হবে। তাছাড়া, চীনারা মনে করেছিল, প্রফেসর ইউনূসের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটদের ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ভবিষ্যতে তারা ক্ষমতায় আসতেও পারে। সে ক্ষেত্রে তাইওয়ান ইস্যুতে ইউনূসের একটা শক্ত অঙ্গীকার পাওয়া প্রয়োজন ছিল। সেই অঙ্গীকার বাংলাদেশ করেছে। তাইওয়ানকে কেউ চীনের অংশের বাইরের চিন্তা করলে বাংলাদেশ তার বিরোধিতা করবে এমন শক্তিশালী অঙ্গীকার করেছে।
তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গা ইস্যুতে তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা করে সংকট সমাধানের কথা বলেছে। আন্তর্জাতিক সম্মেলনের কথা কোনো উল্লেখ নেই। আরেকটা বিষয় হলো, অনেকে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে চীনের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতাকে মিলিয়ে দেখেন। এটা ঠিক নয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্ক মানে ভারতের বিরুদ্ধে এমন নয়। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক হবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। ভারতের সঙ্গে সম্পর্কও হবে বাংলাদেশের নিজস্ব স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে। সব মিলিয়ে প্রফেসর ইউনূসের চীন সফরের প্রতীকী মূল্য আছে। এই সফর থেকে যেমন প্রত্যাশা ছিল সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে।