
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৭:০২ পিএম
ড. ইউনূস-শি জিনপিং বৈঠক
২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি
ঢাকা-বেইজিং ৯ চুক্তি ও সমঝোতা * বাংলাদেশে বিনিয়োগ ও উৎপাদন প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরে উৎসাহিত করবে চীন-শি জিনপিং * চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান প্রধান উপদেষ্টার

বাসস
প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ঐতিহাসিক চীন সফরে দেশটির সরকার ও কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে ২১০ কোটি মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি পেয়েছে বাংলাদেশ। এছাড়া ঢাকা-বেইজিং একটি চুক্তি এবং আটটি সমঝোতা স্মারকে সই করেছে। এর মধ্যে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছে অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতার বিষয়ে। আর সমঝোতা স্মারকগুলোর মধ্যে রয়েছে দুই দেশের কালজয়ী সাহিত্য ও শিল্পকর্মের অনুবাদ ও সৃজন, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও খবর আদান-প্রদান, গণমাধ্যম, ক্রীড়া এবং স্বাস্থ্য খাতে বিনিময় সহযোগিতা। ড. ইউনূসের চীন সফরে শুক্রবার বেইজিংয়ে এসব চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেস সচিব আব্দুল কালাম আজাদ মজুমদার এবং ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
এদিন সকালে বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে ড. ইউনূস ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় চীনকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। অন্যদিকে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ এবং চীনা উৎপাদন প্রতিষ্ঠান স্থানান্তরে সে দেশের উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করবেন বলে আশ্বাস দিয়েছেন শি জিনপিং।
এদিকে চুক্তি ও সমঝোতা স্মারকের পাশাপাশি বিনিয়োগসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরুর জন্য পাঁচটি ঘোষণাও এসেছে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক থেকে। বাংলাদেশে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি নথি স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন ও সম্প্রসারণের জন্য একটি বাণিজ্যিক চুক্তি করেছে দুই দেশ। চীন বাংলাদেশে একটি রোবট ফিজিওথেরাপি ও পুনর্বাসনকেন্দ্র প্রতিষ্ঠায় সহযোগিতা দেবে। পাশাপাশি অনুদান হিসাবে একটি কার্ডিয়াক সার্জারি ভেহিকল দেবে। এ বিষয়েও দুই দেশের মধ্যে নথি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
দ্বিপাক্ষিক বৈঠকের পর প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম সাংবাদিকদের বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং আশ্বস্ত করেছেন, বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগ উৎসাহিত করা হবে এবং চীনের শিল্পকারখানা বাংলাদেশে স্থানান্তরে সমর্থন দেওয়া হবে। তিনি বলেন, প্রধান উপদেষ্টা এবং চীনের প্রেসিডেন্টের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক অত্যন্ত সফল হয়েছে।
শফিকুল আলম বলেন, আলোচনা ছিল উষ্ণতাপূর্ণ এবং অত্যন্ত গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ। প্রেসিডেন্ট জিনপিং প্রধান উপদেষ্টা ও তার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি চীনের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
প্রেস সচিব বলেন, বৈঠকে বাংলাদেশ যেসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছে, চীন সেসব বিষয় ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করবে বলে জানিয়েছে। এ বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল চীনের ঋণের সুদের হার হ্রাস এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চীনের সহযোগিতা প্রদান।
শফিকুল আলম জানান, প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং তার দুবারের বাংলাদেশ সফর সম্পর্কে কথা বলেছেন। শি বলেছেন, যখন তিনি ফুজিয়ান প্রদেশের গভর্নর ছিলেন, তখন ক্ষুদ্রঋণ সম্পর্কে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি বাংলাদেশি আম ও কাঁঠাল দেখেছেন এবং সেগুলো খুব সুস্বাদু। শফিকুল আলম জানান, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে এ দুটি ফল বড় পরিসরে চীনে রপ্তানি করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
অধ্যাপক ইউনূস তার বক্তব্যের শুরুতে বাংলাদেশের জনগণের পক্ষ থেকে চীনের প্রেসিডেন্টকে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানান। বাংলাদেশে জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই অভ্যুত্থান ‘নতুন বাংলাদেশ’ গঠনের পথ সুগম করেছে। চীনের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, তিনি সেখানে গ্রামীণ ব্যাংক ও সামাজিক ব্যবসার প্রচলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বৈঠকের সময় তিনি রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করেন এবং মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবর্তনে চীনের শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
২১০ কোটি ডলারের বিনিয়োগ ঋণ ও অনুদানের প্রতিশ্রুতি : ঢাকায় চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চীনের প্রায় ৩০টি কোম্পানি বাংলাদেশের বিশেষ চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১০০ কোটি ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। এটা প্রধান উপদেষ্টা বেসরকারি খাতকে বাংলাদেশের উৎপাদন শিল্পে বিনিয়োগ করতে আহ্বান জানানোর পর এসেছে। চীন মোংলা বন্দর আধুনিকীকরণ প্রকল্পে প্রায় ৪০ কোটি ডলার ঋণ প্রদান, চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫ কোটি ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা হিসাবে আরও ১৫ কোটি ডলার বরাদ্দ প্রদানের পরিকল্পনা করেছে। বাকি অর্থ অনুদান ও অন্যান্য ঋণ সহায়তা হিসাবে আসবে।
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, এই সফর বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ঢাকা ও বেইজিং জলবিদ্যুৎ পূর্বাভাস এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ সহযোগিতা জোরদার করবে : বাংলাদেশ ও চীন জলবিদ্যুৎ, পূর্বাভাস, বন্যা প্রতিরোধ ও দুর্যোগ হ্রাস, নদী খনন, পানিসম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, পানিসম্পদ উন্নয়ন এবং সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি বিনিময়ের ক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদার করতে সম্মত হয়েছে। শুক্রবার উভয় পক্ষ ইয়ারলুং জাংবো-যমুনা নদীর জলবিদ্যুৎ তথ্য বিনিময় সংক্রান্ত সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) বাস্তবায়ন পরিকল্পনা স্বাক্ষরকে ইতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করেছে।
বাংলাদেশ ও চীনের পক্ষ থেকে যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তিস্তা নদীর সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনঃসংস্কার প্রকল্পে চীনা কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণকে বাংলাদেশ স্বাগত জানিয়েছে। উভয় পক্ষ জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং নীল অর্থনীতিতে সহযোগিতার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে সম্মত হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীন সমুদ্র সংক্রান্ত বিষয়ে বিনিময় জোরদার করতে এবং উপযুক্ত সময়ে সামুদ্রিক সহযোগিতা সংক্রান্ত নতুন সংলাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
বিবৃতিতে বলা হয়, চীন সব সময়ই বাংলাদেশের জনগণের প্রতি সুপ্রতিবেশীসুলভ নীতির অনুসারী এবং বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারকে কার্যকর শাসন পরিচালনা, জাতীয় ঐক্য ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং দেশকে উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে সমর্থন দিয়ে আসছে। চীন রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় তার সামর্থ্যরে সর্বোচ্চ সহযোগিতা অব্যাহত রাখবে বলে যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
প্রধান উপদেষ্টা শি জিনপিং এবং চীনের জনগণকে তার ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের প্রতি উষ্ণ আতিথেয়তার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি উভয় পক্ষের সুবিধাজনক সময়ে চীনা নেতৃত্বকে বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানান।
চীনা বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান : বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতি বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি চীনা বিনিয়োগকারীদের উদ্দেশে বলেছেন, আপনারা বাংলাদেশের ব্যবসার সম্ভাবনার সুবিধা গ্রহণ করতে পারেন। শুক্রবার বেইজিংয়ের ‘দ্য প্রেসিডেন্সিয়াল’-এ চীনা ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে এক বিনিয়োগ সংলাপে তিনি এসব কথা বলেন। সরকারপ্রধান উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ চীনের পর বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক উৎপাদনকারী দেশ। এছাড়া বাংলাদেশ এমন একটি চমৎকার ভৌগোলিক অবস্থানে রয়েছে, যেখানে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রসহ বড় নদীগুলো প্রবাহিত হয়েছে।
বাংলাদেশের রূপান্তর প্রসঙ্গে সরকারপ্রধান বলেছেন, বাংলাদেশ সম্প্রতি এক সম্পূর্ণ নতুন দেশে পরিণত হয়েছে। অনুষ্ঠানে বিডা চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন বক্তৃতা করেন। সংলাপে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন, জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, প্রধান উপদেষ্টার উচ্চ প্রতিনিধি ড. খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ের এসডিজিবিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক লামিয়া মোরশেদ এবং প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম উপস্থিত ছিলেন।