বিএনপির বর্ধিত সভা আজ
এজেন্ডায় জাতীয় নির্বাচন ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

দীর্ঘদিন পর মুক্ত পরিবেশে বিএনপির বর্ধিত সভা হচ্ছে আজ। ঘটতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ও তৃণমূল নেতাদের মহামিলন। সকাল ১০টা থেকে রাত পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের এলডি হলসংলগ্ন মাঠে দুই পর্বে হবে এই সভা। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনি প্রস্তুতিসহ দলের পরিকল্পনা সাজানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। জাতীয় সংসদ নির্বাচনই জাতির প্রত্যাশা-এ লক্ষ্যে সাংগঠনিক কর্মসূচি চূড়ান্ত করতে এ সভার প্রধান এজেন্ডায় রয়েছে জাতীয় নির্বাচনের প্রস্তুতি ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা। তৃণমূলের নেতাদের দেওয়া মতামতকে গুরুত্ব দিয়ে তৈরি করা হবে দলের কর্মপরিকল্পনা।
সভায় সংসদ নির্বাচনের প্রস্তুতি, ঐক্য ও শৃঙ্খলা ধরে রাখাসহ নানা দিকনির্দেশনা দেবেন দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। যা মাঠে বাস্তবায়ন করবে তৃণমূলের নেতারা।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা জানান, বিগত আন্দোলনের মূল্যায়নের পাশাপাশি আগামী সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত দলের কর্মপরিকল্পনা কী হবে সে বিষয়ে মতামত নিতেই এই সভা ডাকা হয়েছে। তৃণমূলের নেতাদের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সংশ্লিষ্ট সংসদীয় এলাকার সম্ভাব্য প্রার্থীদের অবস্থান, জনপ্রিয়তা এবং নেতাকর্মীদের সঙ্গে তার যোগাযোগ কেমন, সেই চিত্র উঠে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নেতারা আরও জানান, আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা আছে এমন প্রার্থীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে। তৃণমূলের বক্তব্যে অনেক প্রার্থীর বিষয়ে একটি ‘মূল্যায়ন চিত্র’ পাওয়া যাবে। সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে তৃণমূল নেতাদের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
লন্ডন থেকে ভার্চুয়ালি থেকে সভায় সভাপতিত্ব করবেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। উদ্বোধনী ও সমাপনী পর্বে নেতাদের উদ্দেশে বক্তব্য দেবেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দলটির একজন সিনিয়র নেতা বলেন, সারা দেশে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে এক ধরনের বিশৃঙ্খলা অবস্থা বিরাজ করছে। এ অবস্থা নিরসন এবং সংসদ নির্বাচনমুখী বিএনপির পথচলা কেমন হতে পারে, তার একটি দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনের সময় নিয়ে সরকার বা অন্য কোনো পক্ষ বাড়াবাড়িতে গেলে দলটি মাঠের কর্মসূচি জোরদার করবে। সেক্ষেত্রে এপ্রিল মাসে কেন্দ্র থেকে জেলা পর্যায়ে আরও কর্মসূচি ঘোষণা দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে সংস্কারের নামে ভোটের তারিখ পেছানোর চেষ্টা মেনে নেবে না তারা। কেন্দ্রের এমন সিদ্ধান্তে তৃণমূলের ভাবনাও চাওয়া হবে আজকের সভায়।
বর্ধিত সভার বিষয়ে গত সোমবার বিএনপির স্থায়ী কমিটির বৈঠক হয়। সিদ্ধান্ত হয়, সভার মূলবিন্দুতে থাকবে তৃণমূল নেতারা। তাদের কথা শুনেই নির্ধারিত হবে বিএনপির আগামীর পথচলা। এতে বক্তব্য দেবেন জেলা/মহানগর, উপজেলা/থানা ও পৌরসভা বিএনপির সভাপতি/আহ্বায়ক ও সাধারণ সম্পাদক/সদস্য সচিবরা। কেন্দ্রীয় কোনো নেতা বক্তব্যের তালিকায় থাকবেন না। এতে বিগত আন্দোলনের একটি চিত্র তুলে ধরা হবে। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সাংগঠনিক প্রতিবেদন তুলে ধরবেন। এতে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত তারেক রহমানের ত্যাগ ও সফল নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ দেওয়া হবে। যেহেতু দেশের মানুষ ১৭ বছর ধরে আন্দোলন সংগ্রাম করছে ভোটাধিকারের জন্য তাই বিএনপি বার্তা দেবে যে স্থানীয় নয়, জাতীয় নির্বাচনই জাতির প্রত্যাশা।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরুতে ‘প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। এই প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেছে ‘বর্ধিত সভা বাস্তবায়ন মিডিয়া উপকমিটি’। সভা উপলক্ষ্যে আমরা বিএনপি পরিবার ‘আস্থা’ নামে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ করেছে। সকালে তারেক রহমানের বক্তব্যের পর দুপুরের পর শুরু হবে রুদ্ধদ্বার অধিবেশন, যেখানে তৃণমূলের নেতারা বক্তব্য দেবেন। পরে সমাপনীতে তারেক রহমান নীতিনির্ধারণী বক্তব্য দেবেন। নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপির এ বর্ধিত সভাকে ‘খুবই সময়োপযোগী’ বলে মনে করেন দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি বলেন, তৃণমূল নেতাকর্মীরা দলের প্রাণ। স্থানীয় পর্যায়ের রাজনীতিসহ সামগ্রিক বিষয় তারা গভীরভাবে প্রত্যক্ষ করেন। তাদের কাছ থেকে প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষের চাওয়াটা জানা যায়। ফলে বর্ধিত সভা থেকে সারা দেশে দলের সাংগঠনিক অবস্থা ও জনগণের প্রত্যাশার বস্তুনিষ্ঠ চিত্র উঠে আসবে, যা দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তৈরিতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
বর্ধিত সভা থেকে কী বার্তা আসতে পারে জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, যেসব নেতাকে বর্ধিত সভায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে, তাদের বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে বার্তা আসবে, তারা কী চান। অনেকদিন ধরে আমাদের এত বড় আন্দোলন গেল, আরও নানা বিষয় আছে কী ধরনের প্রস্তাবলি গ্রহণ করা যায় তাদের বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে সেটা আসবে।
বিএনপির কেন্দ্রীয় দপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে যারা দলের প্রার্থী ছিলেন এবং দলের প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েও চূড়ান্ত মনোনয়ন পাননি। অর্থাৎ প্রার্থী নন কিন্তু মনোনয়নের জন্য ‘সেকেন্ডারি’ কাগজ পেয়েছিলেন, তারাও বর্ধিত সভায় থাকবেন। এ ছাড়া বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটি, জাতীয় নির্বাহী কমিটি, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা কাউন্সিলের সদস্য এবং জেলা কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক, সদস্য সচিব; থানা-উপজেলা-পৌর কমিটির সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক অথবা আহ্বায়ক ও সদস্য সচিবরা অংশ নেবেন বর্ধিত সভায়। বিএনপি ছাড়া ১১টি অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরাও থাকবেন। সব মিলিয়ে বর্ধিত সভায় সারা দেশ থেকে প্রায় সাড়ে তিন হাজার নেতা অংশ নেবেন। দলের নেতারা জানিয়েছেন, সর্বশেষ ১৯৯৭ সালে বর্ধিত সভা হয়েছে। এবারের সভায় দলের জাতীয় কাউন্সিলে যারা উপস্থিত থাকেন, তাদের প্রায় সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হবে। দীর্ঘদিন পর ডাকা এই সভা নিয়ে দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
তৃণমূল নেতাদের ভাবনা : বিএনপির কেন্দ্রীয় জলবায়ুবিষয়ক সহসম্পাদক ও জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা বিএনপির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল বলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বিভিন্ন সভা-সমাবেশ ও কর্মী সভায় যে বক্তব্য দিচ্ছেন তার মূল কথা হলো আমাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। দলের ভাবমূর্তি ও মর্যাদাকে রক্ষা করতে হবে। মানুষের সঙ্গে থাকতে হবে, মানুষের পাশে থাকতে হবে। আমার ধারণা বর্ধিত সভায় এই আহ্বানটাই পৌঁছে দেবেন। একই সঙ্গে নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করা, দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখা এবং নির্বাচনে বিপুল বিজয় লাভ, এটা যেন মানুষের সমর্থন ও রায় নিয়ে সম্ভব হয় তার জন্য সব পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেবেন।
কুমিল্লা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইউসুফ মোল্লা টিপু বলেন, রাষ্ট্র মেরামতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ৩১ দফা দিয়েই রেখেছেন। ৩১ দফার আলোকে বর্ধিত সভায় আলোচনা হবে। আবার নতুন কোনো দিকনির্দেশনা হয়তো থাকতে পারে। আমরা যারা দায়িত্বে আছি অবশ্যই মানুষের কল্যাণে কাজ করব। বাংলাদেশ বিনির্মাণে যা যা করা দরকার, যা পদক্ষেপ নেওয়া দরকার তা করব। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সব মিলিয়ে মানুষ এখন জাতীয় নির্বাচন চাচ্ছেন। এ বিষয়গুলো তো অবশ্যই আসবে। নির্বাচনের প্রস্তুতি রয়েছে, যে কোনো সময় নির্বাচন হলে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারব।
মানিকগঞ্জ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য এসএ জিন্নাহ কবির বলেন, দ্রুত নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা না হলে দেশের আইনশৃঙ্খলার যেভাবে দিন দিন অবনতি হচ্ছে, যা আরও বাড়তে থাকবে। তৃণমূলের মানুষ বলছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি শান্ত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারে একমাত্র নির্বাচিত সরকার। জনগণের কাছে দায়বদ্ধ বা জবাবদিহিতামূলক সরকারই তা পারে। তৃণমূলের মানুষ কী চাচ্ছেন সেটাই বর্ধিত সভায় জানাব।
গাজীপুর মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এম মঞ্জুরুল করিম রনি বলেন, আমরা এলাকায় এলাকায় যাচ্ছি, জনগণের সঙ্গে কথা বলছি। তাদের একটাই কথা দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক রাখতে এবং দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে একটি স্থিতিশীল সরকারের প্রয়োজন এবং তার জন্য খুব দ্রুত জাতীয় নির্বাচন দরকার।
বরিশাল মহানগর বিএনপি আহ্বায়ক মনিরুজ্জামান খান ফারুক বলেন, ভোটে নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকার ছাড়া যত সংস্কার বা উন্নয়ন বলেন, অধিকার বলেন কিছুই ফিরে আসবে না। কাজেই সভায় মেসেজ থাকবে আগামী জাতীয় নির্বাচন দ্রুত যেন অনুষ্ঠিত হয়।