বিশ্লেষকদের অভিমত
অনৈক্যের সুযোগ নেবে পরাজিত ফ্যাসিস্টরা

বিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ছবি: সংগৃহীত
ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তিগুলো ক্ষমতার লোভ আর নানারকম স্বার্থের দ্বন্দ্বে একে অপরের প্রতিপক্ষ হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে পর্দার আড়ালে থাকা এ ধরনের বিরোধ প্রকাশ্যে রূপ নিচ্ছে। মূল দলগুলোর ছাত্র সংগঠনে চরম হিংসা-বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে পরাজিত ফ্যাসিস্টরা নিশ্চিত সুযোগ নেবে। যারা এমনিতে এ ধরনের বিরোধ ও ব্যবধান সৃষ্টির জন্য শুরু থেকে নানাভাবে দেশে-বিদেশে সক্রিয় রয়েছে।
সম্প্রতি খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি বিরোধী সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় বিভেদের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। এ ঘটনার জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ছাত্রদলকে দায়ী করেছে। এছাড়া ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিভেদকে কেন্দ্র করে পালটাপালটি বক্তব্য-বিবৃতি অব্যাহত আছে। এমন প্রেক্ষাপটে যুগান্তরকে দেওয়া প্রতিক্রিয়ায় কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষক এমন মন্তব্য করেন।
তারা বলছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো যে যার মতো নিজস্ব কৌশল নিয়ে এগোবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে এর আগেই নানা ঠুনকো অজুহাতে একপক্ষ আরেকপক্ষকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে, পানি ঘোলা করছে। এতে করে লাভবান হবে পরাজিত ফ্যাসিষ্টরাই। অথচ ৬ মাস আগে এসব শক্তিগুলো ঐক্যবদ্ধভাবে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার হটাতে রাজপথে একসঙ্গে মৃত্যুপণ লড়াই করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পতিত ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ নেতাদের হাতে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ রয়েছে। অর্থের তো শক্তি কম নয়। বিপুল অর্থ ব্যয়ে অনেক কিছু করে ফেলা সম্ভব। এজন্য দেশে-বিদেশে বসে তারা রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরির জন্য নানা ছক কষছে। এরা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে ব্যর্থ করতে চাইবে। ইতোমধ্যে এর আলামতও পাওয়া যাচ্ছে।
সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে, এমনকি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হচ্ছে। এরকম একটি প্রেক্ষাপটে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জয়ী হওয়া রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র-জনতার মধ্যে বিরোধ জনমনে ভুল বার্তা দেবে। তাদের মতে, ফ্যাসিবাদ যাতে কোনো অবস্থায় ফিরে আসতে না পারে সেজন্য যার যার অবস্থান থেকে ঐক্য সুদৃঢ় রাখতে হবে। সব পক্ষকে আরও দায়িত্বশীল এবং সংহত আচরণ করতে হবে।
জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গে গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম শীর্ষ নেতা, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও ডাকসুর সাবেক ভিপি মাহমুদুর রহমান মান্না বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, আমাদের সামনে দুটি বড় উদাহরণ আছে। একটি মিসর, আরেকটি তিউনেশিয়া। মিসরে মুসলিম ব্রাদারহুড ৫০ বছর নিষিদ্ধ ছিল। দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম করে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে তারা জয়ী হয়। কিন্তু অভ্যন্তরীণ দলাদলির কারণে অর্জিত আরব বসন্তের সুফল তারা ঘরে তুলতে পারেনি। অন্যদিকে তিউনেশিয়ায় সামরিক সরকার হটিয়ে গণতন্ত্রী ও হাফ গণতন্ত্রীরা মিলে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা করে দেশ পরিচালনায় সফল হয়। আমাদের এখানে এত বড় আন্দোলনের পর এর সুফল ঘরে তুলতে চাইলে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। তিনি আরও বলেন, বিএনপি বড় দল, এটা যেমন ঠিক; তেমনি বর্তমান বাস্তবতায় জামায়াতে ইসলামীও বড় ফ্যাক্টর। দুই পক্ষ যদি রাজপথে ফয়সালার জন্য নামে তাহলে দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আর শুভবুদ্ধি থাকলে আলোচনার টেবিলে বসে ঐকমত্যে পৌঁছাতে হবে। তা না হলে তৃতীয় পক্ষ সুযোগ নেবে।
গণতন্ত্র মঞ্চের আরেক শীর্ষ নেতা ও বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, স্বৈরাচারী সরকারকে হটাতে রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র-শ্রমিক-জনতার মধ্যে যে বৃহত্তর ঐক্য গড়ে উঠেছিল, নানা অনাকাঙ্ক্ষিত কারণে আমরা সেই ঐক্যটা ধরে রাখতে পারছি না, এটি সত্যিই দুঃখজনক। তিনি আরও বলেন, আমরা একদিকে দেখছি সরকারের পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ, তাদের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহায়তায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। আবার নতুন দল গঠন নিয়েও বিভিন্ন জায়গায় দ্বন্দ্ব-সংঘাতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অন্যদিকে শেখ হাসিনা বিরোধী লড়াইয়ে মাঠে থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিতর্ক, দ্বন্দ্ব, সংঘাত দেখে মনে হচ্ছে দেশে আধা-নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। বিশেষ করে শিক্ষাঙ্গনে যে সহিংস তৎপরতা চলছে, তা আরও ছড়িয়ে পড়লে পরোক্ষভাবে পতিত ফ্যাসিস্টদের জন্যই শক্ত জমিন তৈরি করে দেওয়া হবে, যা কারও জন্যই সুখকর হবে না।
ছাত্র-জনতার নজিরবিহীন আন্দোলনের মুখে গত বছর ৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে দিল্লিতে আশ্রয় নেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা। এই ঘটনার ৩ দিনের মাথায় ফ্রান্স থেকে এসে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেন শান্তিতে নোবেল জয়ী ও গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। ইতোমধ্যে তার নেতৃত্বাধীন সরকার ৬ মাস অতিক্রম করেছে। প্রয়োজনীয় সংস্কার শেষে এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের পথে হাঁটছে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার। তবে এই নির্বাচনের সময় নিয়ে একে অপরের প্রতি সন্দেহ-অবিশ্বাস থেকে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সম্পর্কের টানাপোড়েন বিবাদে রূপ নিয়েছে। এর জের ধরে বাড়ছে পালটাপালটি বক্তৃতা-বিবৃতি। ভোটের রাজনীতির স্বার্থের মারপ্যাঁচে বিএনপির সঙ্গে এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সম্পর্কে টানাপোড়েন বহাল আছে পর্দার আড়ালে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার শাসনের পতনের পর দল দুটির সম্পর্কের এ ব্যবধান আরও বাড়তে থাকে।
সর্বশেষ স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে পরস্পরবিরোধী অবস্থান নিয়েছে বিএনপি ও জামায়াত। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের আগে অন্য কোনো নির্বাচন চায় না। আর জামায়াত আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন চাইছে। দুই বড় দলের এ রকম মতবিরোধের প্রভাব তাদের ছাত্র সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যেও দেখা দিয়েছে।
এখানেই শেষ নয়, জাতীয় নাগরিক কমিটি এবং বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে যে নতুন রাজনৈতিক দল গঠিত হতে যাচ্ছে, সেটি নিয়েও চলছে নানা আলোচনা। সরকারের ছত্রছায়ায় নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে ঘোরবিরোধী বিএনপি। জামায়াতে ইসলামী অবশ্য এ ইস্যুতে বেশ কৌশলী অবস্থান নিয়েছে। ছাত্রদের নেতৃত্বে নতুন দল গঠনে জামায়াতের পরোক্ষ সমর্থন রয়েছে বলে গুঞ্জন আছে।
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সিনিয়র সাংবাদিক মাসুদ কামাল বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, শেখ হাসিনার পতনের দাবিতে কিছুদিন আগেও সব রাজনৈতিক দল এবং ছাত্র-জনতা এক ছিল। কিন্তু দিন গড়াতেই তাদের মধ্যে সেই ঐক্যটা আর দেখা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ ক্ষমতার লোভ। বিএনপি ক্ষমতায় যেতে চায়। জামায়াতে ইসলামীও ক্ষমতায় যেতে চায়। শুধু তাই নয়, ছাত্ররাও এখন স্বপ্ন দেখছেন ক্ষমতায় যাওয়ার। সবমিলিয়ে সবাই এখন স্বার্থের দ্বন্দ্বে জড়িয়ে গেছেন। দিন দিন এটা আরও বাড়বে। ফলে জুলাই-আগস্টের যে মূল আকাঙ্ক্ষা তা অধরা থেকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দেবে। আর যদি তাই হয়, তাহলে তৃতীয় পক্ষ হিসাবে পরাজিত ফ্যাসিস্টরাই নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নাড়াবে। তারা বসে থাকবে না। নানাভাবে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করবে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তী সরকারের আয়ু যত দীর্ঘায়িত হবে, পরাজিতদের ক্ষেত্র তৈরি করা আরও সহজ হবে।