বগুড়ার সাবেক এমপি রাগেবুল
টেন্ডার-পদ বাণিজ্য করেই গড়েন সম্পদের পাহাড়

বগুড়া সদর আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান রিপুর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ রয়েছে। ক্ষমতার অপব্যবহার, টেন্ডার বাণিজ্য, পদ বাণিজ্য, হাটের ইজারাসহ নানাভাবে তিনি এসব সম্পদ করেছেন। ১০ বছরে তিনি আঙুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছেন।
এ সময়ে তার অস্থাবর সম্পদ ১৭ গুণ বেড়েছে। শহরের শিববাটি এলাকায় প্রাসাদোপম ৯ তলা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। কিনেছেন কোটি টাকার গাড়ি। স্ত্রী জোবাইদা আহসান জবাকেও বানিয়েছেন কোটিপতি। ত্যাগী নেতাকর্মীরা ছিলেন বঞ্চিত ও অবহেলিত। ফলে বুধবার রাতে তার গ্রেফতারের খবরে আত্মীয়স্বজন ছাড়া অন্যদের মাঝে তেমন প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা যায়নি।
বগুড়া সদর উপজেলার নামুজা ইউনিয়নের চিঙ্গাসপুর গ্রামের মরহুম ওয়াজেদ আলী তালুকদারের ছেলে রাগেবুল আহসান রিপু দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তিনি ২০১৯ সাল থেকে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
বগুড়া সদর আসনে ২০২৩ সালের ১ ফেব্রুয়ারি উপনির্বাচনে তিনি প্রথমবার সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নৌকার প্রার্থী হয়ে দ্বিতীয়বার সংসদ-সদস্য হন। রিপুর বিরুদ্ধে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবজ্ঞা ও বঞ্চিত করার অভিযোগ রয়েছে। অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনে বিরোধিতা করেছেন। ফলে অনেক কমিটি পূর্ণাঙ্গ ছিল না।
দলের হাইব্রিডদের নিয়ে চলাফেরা করেছেন। ফলে তিনি দিনদিন বন্ধুহীন হয়ে পড়েন। রাগেবুল আহসান ২০১৩ সালে নির্বাচন কমিশনে যে সম্পদবিবরণী জমা দিয়েছিলেন, তাতে নিজেকে কৃষি ও কৃষিপণ্য ব্যবসায়ী উল্লেখ করেন। সেখানে আয়ের তথ্য ছিল না। ৫০ হাজার টাকা নগদ ও কয়েকটি ব্যাংকে ৩১ লাখ টাকা জমা থাকার তথ্য দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া সম্পদবিবরণী অনুযায়ী ব্যাংকে তার ছিল ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা।
সবমিলিয়ে তার ৫ কোটি ২৮ লাখ টাকার অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। আর স্থাবর সম্পদ হিসাবে ২ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি অ্যাপার্টমেন্টের কথা উল্লেখ করেছেন। পৈতৃক সূত্রে ১৫ বিঘা কৃষিজমির পাশাপাশি ৮৫ শতাংশ অকৃষি জমি এবং নয় একর মৎস্য খামারের মালিকানার তথ্য দিয়েছেন। ব্যাংকে ৭৫ লাখ টাকা ঋণের কথাও জানিয়েছিলেন। নামে-বেনামে এই নেতা ও তার স্বজনদের নামে বিপুল সম্পদ রয়েছে বলেও এলাকাবাসী জানান।
অন্যদিকে ১১ বছর আগে রিপুর স্ত্রী জোবাইদা আহসান জবার কোনো সম্পদ ছিল না। এখন তার ২০ ভরি স্বর্ণালংকার রয়েছে। চলতি বছরের ৭ এপ্রিল গভীর রাতে পুলিশ তার ছেলেকে আটক করে। সেসময় তিনি বগুড়া সদর পুলিশ ফাঁড়িতে গিয়ে যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাদের নিয়ে মারধর করে ছেলেকে ছিনিয়ে নেন। ক্ষমতাসীন দলের সংসদ-সদস্য হওয়ায় পুলিশ বাধ্য হয়ে নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিল। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পদত্যাগ ও রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পরপরই বগুড়া শহরের শিববাটি এলাকায় তার নয়তলা ভবনে হামলা চালানো হয়। বাড়ি ও গাড়িতে আগুন এবং ব্যাপক লুটপাট করা হয়।
এ হামলার পর থেকে তার ওই বাড়িতে তালা ঝুলছে। ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডি ডিঅ্যাক্টিভেট করে পরিবার নিয়ে আত্মগোপনে রয়েছেন। দলের এ দুর্দিনে তিনি ও জেলা সভাপতি মজিবর রহমান মজনু আত্মগোপন করায় তৃণমূল নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েন। একের পর এক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার মামলা হওয়ায় নেতাকর্মীরা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক অধ্যক্ষ শাহাদৎ আলম ঝুনুসহ চার নেতা জেলে হৃদরোগে মারা গেছেন। এতে নেতাকর্মীরা আরও হতাশ হয়ে পড়েছেন।
সম্পত্তি বেড়ে যাওয়া প্রসঙ্গে রাগেবুল আহসান সেসময় সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ব্যাংকে জমার পরিমাণ ৩ কোটি ৮১ লাখ টাকা নয়; সেটা ৩৮ লাখ টাকা হবে। কম্পিউটারে কম্পোজের সময় টাকার অঙ্কে ভুল হয়েছে। ২ কোটি ২০ লাখ টাকার যে অ্যাপার্টমেন্টের কথা বলা হচ্ছে, সেটি পৈতৃক সূত্রে পাওয়া বাড়ি বলে জানিয়েছিলেন।