দুর্নীতিবাজদের দায়মুক্তি
এ প্রবণতা রোধে দুদকের সংস্কার জরুরি

সম্পাদকীয়
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

দুর্নীতি দমনের দায়িত্বে থাকলেও বিগত সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ছিল বড় দুর্নীতিবাজদের ‘রক্ষাকবচ’। গতকাল যুগান্তরে প্রকাশিত শীর্ষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময়ে ‘রাঘববোয়াল’ হিসাবে পরিচিত প্রায় ৩ হাজার ব্যক্তিকে দায়মুক্তি বা ‘ক্লিনচিট’ দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে রয়েছেন পতিত সরকারের সাবেক মন্ত্রী, সংসদ-সদস্য, সরকারি কর্মকর্তা, পুলিশ, ব্যাংকার ও ব্যবসায়ী।
সবচেয়ে বেশি দায়মুক্তির ঘটনা ঘটেছে ইকবাল মাহমুদ কমিশনের আমলে। তিনি ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দুদকের চেয়ারম্যান ছিলেন। অভিযোগ আছে, সে সময় মোটা অঙ্কের টাকা ঘুসের বিনিময়ে দায়মুক্তি দেওয়া হতো। ঘুস লেনদেন হতো ডলারে। প্রভাবশালী অনেকেই তিন-চার দফায় দায়মুক্তির সনদ বাগিয়ে নিয়ে বহাল তবিয়তে ছিলেন। এসব তথ্য থেকেই বোঝা যায়, বিগত সরকারের আমলে দেশে কেন দুর্নীতির ভয়াবহ বিস্তার ঘটেছিল।
বিভিন্ন সময়ে দুদকের শীর্ষ পদে যারা আসীন হয়েছেন, তারাই ক্ষমতার ছায়া অনুসরণ করেছেন বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির কয়েকজন কর্মকর্তা। দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রে ক্ষমতাবানরা ক্ষুব্ধ হন, এমন কোনো পদক্ষেপ কেউ নেননি। কাজ করেছেন সরকারের মর্জিমাফিক। আবার দুদকের একজন সাবেক মহাপরিচালক জানিয়েছেন, সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকেই সব সরকারই এটিকে নিজেদের মতো করে চালানোর চেষ্টা করেছে।
এসব বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, নামে স্বাধীন হলেও দুদকের কর্মকর্তারা কার্যত ছিলেন পরাধীন। তারা প্রভাবমুক্ত হয়ে কাজ করতে পারেননি। এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। দুদককে প্রকৃতই স্বাধীনভাবে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে বড় ভূমিকা রাখার সুযোগ এসেছে। রাজনৈতিক প্রভাব এবং তদবির বাণিজ্যের বাইরে রাখতে পারলে দুদককে শক্তিশালী ও কার্যকর করা সম্ভব। এ লক্ষ্যে দুদক সংস্কার কমিশনের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে।
বস্তুত বিগত সরকারের সময়ে দুদকের কতিপয় কর্মকর্তা-কর্মচারী যে রক্ষকের বদলে ভক্ষকের ভূমিকায় ছিলেন, এমন অভিযোগ বারবার উঠেছে, গণমাধ্যমেও তা প্রকাশ পেয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর দুদককে কার্যকর করার জন্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরিতাপের বিষয়, তা আদৌ কার্যকর হয়েছে বলে পরিলক্ষিত হচ্ছে না। সম্প্রতি যুগান্তরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সংস্থাটি এখনো পুরোনো পথেই হাঁটছে।
এখনো সংস্থাটিতে একের পর এক প্রেষণে নিয়োগ পাচ্ছেন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের কর্মকর্তারা, যাদের মধ্যে দুর্নীতির মামলার আসামিও রয়েছেন। শুধু তাই নয়, বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থা থেকে প্রেষণে আসা অন্তত অর্ধশত কর্মকর্তা এখনো দুদকে বহাল তবিয়তেই আছেন। প্রশ্ন হলো, যারা দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তারা যদি দুদকে বহাল তবিয়তে থাকেন, তাহলে দুর্নীতি দমনে দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাটি আদৌ নিজ দায়িত্ব পালনে সফল হবে কি?
সংস্কারের মাধ্যমে শর্ষের এই ভূত দূর করতে না পারলে দুদকের কাজে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সফল হতে হলে দুদককে যথার্থই স্বাধীন ও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসাবে গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনে দুদক আইনে আনতে হবে সংশোধনী, যাতে যখন যারাই ক্ষমতায় থাকুক, কেউ যেন সংস্থাটির কাজে হস্তক্ষেপ করতে বা প্রভাব খাটাতে না পারে।