
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১১:০৩ পিএম

আবুল খায়ের, কুমিল্লা
প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কুমিল্লায় স্বাস্থ্য খাতে চরম অব্যবস্থাপনা ও নৈরাজ্য চলছে। গেল এক সপ্তাহে জেলায় ভুল চিকিৎসায় তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া অব্যবস্থাপনার কারণে মারা গেছেন আরও একজন। এ নিয়ে বিচার পাওয়া তো দূরের কথা অভিযুক্ত চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে মুখ খুলে উলটো হামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন নিহতদের স্বজনরা। হামলা থেকে রক্ষা পায়নি গণমাধ্যমকর্মীরাও। কতিপয় চিকিৎসক ও ইন্টার্ন চিকিৎসকের এমন আচরণে হতবাক সচেতন মহল।
জানা গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালে রোগীদের প্রতি অবহেলা-অব্যবস্থাপনা, কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকের অসদাচরণ, দালালদের দৌরাত্ম্য ও ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর ঘটনা ঘটেই চলেছে। অন্যদিকে বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে কতিপয় চিকিৎসকের স্বেচ্ছাচারিতা, কমিশন বাণিজ্য এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষা, আইসিইউ ও সিসিইউর নামে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। রোগীর মৃত্যুর পরও আইসিইউতে রেখে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের ঘটনাও ঘটেছে। ভুক্তভোগীরা জানান, নগরীর অশোকতলার আহমেদ আলীর স্ত্রী পারুল আক্তার কিডনির সমস্যা নিয়ে ২০ মার্চ কুমেক হাসপাতালে ভর্তি হন। পরদিন একাধিক ভুল ইনজেকশন পুশ করায় তার মৃত্যু হয়। এ নিয়ে অভিযোগ করায় পারুলের স্বজনদের পিটিয়ে রক্তাক্ত করে কুমেকের ইন্টার্ন চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা। খবর সংগ্রহ করতে গেলে যমুনা টেলিভিশনের কুমিল্লা ব্যুরো প্রধান রফিকুল ইসলাম খোকন, চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের প্রতিনিধি জাহিদুর রহমানসহ ৪ গণমাধ্যমকর্মীকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে মোবাইল ও ক্যামেরা ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এ ঘটনায় কুমেকের পরিচালকসহ ১৫০ জনের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন সাংবাদিক খোকন।
নিহত পারুলের ছেলে তারেক হোসেন বলেন, একাধিক ভুল ইনজেকশন পুশ করে আমার মাকে মেরে ফেলা হয়েছে। পরে জানতে পারি ইনজেকশনগুলো ছিল অন্য রোগীর।
মুরাদনগর উপজেলার ভাগলপুরের তাছলিমা আক্তার তার নবজাতক শিশুর খিঁচুনিজনিত সমস্যায় ১৮ মার্চ তাকে কুমেক হাসপাতালে ভর্তি করান। ভুল ইনজেকশন পুশ করায় শিশুটিও মারা যায়। তাছলিমা বলেন, যে চিকিৎসক ভুল ইনজেকশন দিয়েছে আমি তার নাম জানতে চাইলে উলটো আমাকে নাজেহাল করা হয়। আমি বিষয়টি নিয়ে অভিযোগ করায় চিকিৎসক ও নার্সরা আমাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছে।
শিশুটির মামা মো. মানিক মোল্লা বলেন, ইনজেকশন পুশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাগনির পুরো শরীর কালো হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরই তার মৃত্যু হয়।
এছাড়া ৭ মার্চ ওসমান গনি নামে এক রোগী এ হাসপাতালের পাঁচতলার বারান্দা থেকে পড়ে মারা যায়। এ নিয়ে হাসপাতালের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছে তার স্বজনরা। তারা জানান, দালাল চক্রের মাধ্যমে ওই রোগীকে ভর্তি করে বারান্দায় রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছিল।
এদিকে ১৬ মার্চ নগরীর ট্রমা প্রাইভেট হসপিটালে ভুল চিকিৎসায় ইমরান হোসেন (২১) নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে নিহতের স্বজনরা হাসপাতালটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করে। নিহত ইমরান নগরীর ১৪ নম্বর ওয়ার্ডের দ্বিতীয় মুরাদপুরের প্রবাসী হুমায়ুন মিয়ার ছেলে। স্বজনরা জানান, ইমরান শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যার কারণে ডা. আতাউর রহমানের কাছে চিকিৎসা নিতে যান। চিকিৎসক তাকে অপারেশনের পরামর্শ দেন। ১৪ মার্চ সকালে রোগীকে সার্জারির উদ্দেশ্যে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। চার ঘণ্টার অপারেশন বলা হলেও শেষ হতে সময় লাগে ৭ ঘণ্টা। পরে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) স্থানান্তর করা হয়। সেখানে দুদিন রাখার পর তার মৃত্যু হয়েছে বলে জানানো হয়।
নিহত ইমরানের মা নাজমা বেগম বলেন, ভুল চিকিৎসায় আমার ছেলে মারা যাওয়ার পরও তাকে আইসিইউতে রেখে আমাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত প্রায় তিন লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের পরিচালক ডা. মাসুদ পারভেজ এবং ট্রমা হসপিটালের মালিক ডা. আব্দুল হককে রোববার একাধিকবার ফোন করলেও তারা রিসিভ করেননি।
এ বিষয়ে সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর বশির বলেন, ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর এসব অভিযোগ আমরা তদন্ত করছি। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাছাড়া মেডিকেল কলেজের বিষয়গুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে তদারকি করা হয়।
বেসরকারি হাসপাতালের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো প্রাইভেট হসপিটাল কর্তৃপক্ষ যদি রোগীদের কাছ থেকে আইসিইউ, সিসিইউ ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার নামে অতিরিক্ত টাকা আদায় করে তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এসব বিষয়ে ভুক্তভোগীরা যদি আমাদের কাছে সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ করে তাহলে তদন্ত এবং ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হবে।