
প্রিন্ট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ০৯:৩৭ এএম
জুলাই গণহত্যা
ছেলের খুনি গ্রেফতার না হওয়ায় থানায় আহাজারি মায়ের
একদিন পরই ঈদ, থামছে না মায়ের কান্না

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আরও পড়ুন
মোবাইল ফোন রিসিভ করা মাত্র ডুকরে কান্নার আওয়াজ শোনা গেল। জীবনের সব আনন্দ যাকে ঘিরে ছিল সেই একমাত্র ছেলে জুলাই আন্দোলনে নিহত হয়েছে। আর একদিন পরেই ঈদ। ছেলের কথা মনে হতেই কাঁদছেন মা বেবি। ছেলে ইমন হোসেন আকাশ হত্যার ৭ মাস পার হতে চললেও এখনো গ্রেফতার হয়নি মূল আসামি। এ নিয়ে প্রায় দিনই থানায় গিয়ে আহাজারি করছেন মা। পুলিশ আশ্বস্ত করলেও আসামি গ্রেফতারে কোনো তৎপরতা নেই বলে অভিযোগ মামলার বাদীর।
বাদী বেবির অভিযোগ, ছেলে হত্যার প্রকৃত আসামি আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতার করছে না পুলিশ। থানায় ধরনা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনে (পিবিআই) অভিযোগ দিয়েছি। অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে পল্লবী থানার অফিসার ইনচার্জ মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আমরা বাদীর অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে আসামি অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতারের চেষ্টা চালিয়েছি। কিন্তু তিনি পলাতক থাকায় গ্রেফতার করা সম্ভব হচ্ছে না। মামলাটি ইতোমধ্যে পল্লবী থানা থেকে পিবিআইতে স্থানান্তরিত হয়েছে। এখন মামলার পুরো কার্যক্রম দেখভাল করছে সংস্থাটি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট মিরপুর বাসস্ট্যান্ডের পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সামনে ছাত্র-জনতার মিছিলে আওয়ামী লীগ নেতারা এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যান আন্দোলনকারী ইমন হোসেন আকাশ। গত ২৭ আগস্ট ইমনের মা বেবি বাদী হয়ে পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেন। মামলা নং ১৫। মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৬৩৭ জনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাত আরও ৬শ জনকে আসামি করা হয়। মামলার এজাহারে দুই জায়গায় জাহাঙ্গীর আলমের নাম রয়েছে। ইতোমধ্যে তাকে শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা করা হচ্ছে বলে থানা সূত্রে জানা গেছে। বাদী বেবি যুগান্তরকে বলেন, আমার ছেলের সঙ্গে আন্দোলনে থাকা ছাত্রদের মাধ্যমে জেনেছি, ঘটনার দিন অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে আমার ছেলের ওপর আক্রমণ করে। তার হাতে থাকা পিস্তলের গুলিতে আমার ছেলে প্রাণ হারায়। আমি প্রকৃত আসামিকে গ্রেফতারে প্রায় দিনই পল্লবী থানায় ধরনা দিচ্ছি কিন্তু পুলিশ তাকে ধরছে না। আমার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে পল্লবী থানা থেকে মামলার কার্যক্রম পিবিআইকে দেওয়া হয়েছে কিন্তু তারাও আসামিকে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নিচ্ছেন না। আমি আমার ছেলের হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি চাই।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিবিআইর দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআইএন্ডও (অর্গানাইজ ক্রাইম)-এর এসআই নুরুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, আমরা এই মামলায় ২৯ জন আসামি গ্রেফতার করেছি। অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমকে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। ঈদের পর জোরালো অভিযান পরিচালনা করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ত্রাণ ও সমাজকল্যাণ উপকমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সদস্য ও কুড়িগ্রাম জেলা আওয়ামী লীগের নির্বাহী কমিটির সদস্য। কুড়িগ্রাম-৪ আসনে ২০১৮, ২০২৪ সালে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন।
মিরপুরের ভূমিদস্যু হিসাবেও তিনি পরিচিত। ঢাকা-১৬ আসনের সাবেক এমপি ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা ও তার বড় ভাই এখলাছ উদ্দিন মোল্লার ভাড়াটে ক্যাডার এই অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলম।
ইমনের মা বেবি কান্নাজড়িত কণ্ঠে যুগান্তরকে বলেন, আর একদিন পরই ঈদ। আমার ছেলেকে যারা মেরে ফেলল তারা সন্তান নিয়ে ঈদ করছে। মার্কেটে গিয়ে কেনাকাটা করছে। অথচ পুলিশ তাদের গ্রেফতার করছে না। তিনি অভিযোগ করে আরও বলেন, পল্লবী থানা থেকে অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমের বাসা মাত্র তিন মিনিটের দূরত্ব। সব সময় বাসায় যাওয়া-আসার মধ্যেই আছেন। বাসার গার্ডরাও সে কথাই বলছে। কিন্তু পুলিশ খুঁজে পাচ্ছে না। আসামিরা এভাবে বীরদর্পে ঘুরে বেড়ালে একদিন তারা আমাকেও হত্যা করবে। আপস করে আসামি না ধরার পেছনে পুলিশের পাশাপাশি পল্লবী থানা বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধেও অভিযোগ করেন তিনি।
এ বিষয়ে জানতে অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার ফোন দিলেও তাকে পাওয়া যায়নি।