
প্রিন্ট: ০২ এপ্রিল ২০২৫, ১০:৫৮ পিএম
সিলেটে বিএনপি-জামায়াতের রাজনীতি
ইফতারে শুরু, ঈদে থাকবে সরগরম
নির্বাচনি মাঠ প্রস্তুতের দৌড়ে সম্ভাব্য প্রার্থীরা

সংগ্রাম সিংহ, সিলেট
প্রকাশ: ৩০ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আরও পড়ুন
জাতীয় নির্বাচন যখনই হোক নিজেদের অনুকূলে মাঠ প্রস্তুতে পিছিয়ে নেই সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মাঠে নেই আওয়ামী লীগ। তাই বিএনপি-জামায়াতের মনোনয়নপ্রত্যাশীরাই প্রতিযোগিতার দৌড়ে আছেন। যদিও অনেক আগেই সিলেট বিভাগের ১৯ আসনেই প্রার্থী ঘোষণা করে রেখেছে জামায়াত। অন্যান্য বছরের তুলনায় এবারের রমজানে ইফতারকেন্দ্রিক রাজনীতি বেশ জমে উঠেছে। এর প্রভাব আরও বাড়বে ঈদে। পুরো ঈদে সরগরম থাকবে রাজনীতি। অনেক রাজনীতিকের সঙ্গে আলাপ করে এমন আভাস পাওয়া গেছে।
সিলেট বিভাগের ১৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে আলোচিত কিছু আসন রয়েছে। যেসব আসনে সব সময়ই হেভিওয়েট প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টায় থাকে দলগুলো। সিলেট-১ আসন এর অন্তর্ভুক্ত। বিভাগীয় নগরী থেকে অনেকটা সঞ্চালিত, নিয়ন্ত্রিত হয় বিভাগের রাজনীতিও। বিভাগীয় নগরীতে একই দলে আছেন একাধিক হেভিওয়েট প্রার্থী। তাদের মধ্যে আছে নানা স্নায়ুযুদ্ধ। সেটা আওয়ামী লীগেও ছিল। এখন মাঠে বিএনপি, তাদের মধ্যেও আছে। বিএনপি চেয়ারপারসনের কয়েকজন উপদেষ্টা আছেন বিভাগীয় নগরীসহ সিলেট বিভাগে। তাদের অধিকাংশই আসন্ন নির্বাচনে মনোনয়নপ্রত্যাশী। তাদের বাইরেও আছেন হেভিওয়েটরা। তারাও প্রত্যাশী মনোনয়নের।
সিলেটে সবাইকে ছাড়িয়ে শীর্ষে নিজেকে রাখার প্রাণপণ চেষ্টা সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। পুরো বিভাগের বিএনপির রাজনীতি নিয়ন্ত্রণেও তৎপর। সবার কাছে প্রিয়জন থাকার চেষ্টায় আরিফ পুরো রমজান মাসে ছুটেছেন ইফতার থেকে ইফতারে। মেয়রের চেয়ারে না থাকলেও অঘোষিত একাধিক পিএস, এপিএস রাখছেন সঙ্গে। খুব একটা জরুরি ছাড়া মিডিয়ার লোকজনেরই ফোন ধরেন না প্রায় সময়ই। প্রয়াত অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের হাত ধরে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়া আরিফ এখন পুরো বিভাগে সাইফুর বলয়ের অঘোষিত প্রধান। নির্বাচন সামনে রেখে তিনি মরিয়া। অন্যান্য আসনগুলোতেও নিজ বলয়ের নেতাদের মনোনয়ন নিশ্চিতে তৎপর। এ ব্যাপারে কথা বলতে ফোন দিলে আরিফুল হক চৌধুরী ফোন ধরেননি। তার এক ঘনিষ্ঠজন জানালেন প্রতিদিন অন্তত দুটি করে ইফতারে হাজির থাকার চেষ্টা করেন তিনি। সিলেট নগরী ছাড়াও বিভাগের চার জেলাতেও গিয়েছিলেন দলীয় নেতাদের ডাকে। তিনি জানান, আরিফ সিলেটেই ঈদ করবেন। নগরীর ঐতিহ্যবাহী শাহী ঈদগাহর বর্তমান মুতওয়াল্লির দায়িত্ব নিয়েছেন আরিফ, এজন্য খুবই ব্যস্ত।
বিএনপি চেয়ারপারসনের আরেক উপদেষ্টা শিল্পপতি খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির। তিনি সিলেট বিএনপির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা খন্দকার আব্দুল মালিকের পুত্র। সাইফুরের রাজনৈতিক উত্তরসূরি আরিফ ও খন্দকার মালিকের উত্তরসূরি মুক্তাদিরের মধ্যে দূরত্ব বর্তমান। দলীয়-স্বতন্ত্র ইফতার মাহফিলগুলোতে একজনকে দেখা গেলে আরেকজনকে দেখা যায়নি। দল, রাজনৈতিক আদর্শ, নির্বাচনি মাঠ এক হলেও তারা নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে চলেন। তবে এবার সিলেটের দলীয় ইফতারের আয়োজনগুলোর অধিকাংশেই আরিফের তুলনায় মুক্তাদিরের উপস্থিতি ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। মর্যাদার সিলেট-১ আসনে মনোনয়নের সর্বশেষ চূড়ান্ত লড়াইয়েও এই দুই নেতা মুখোমুখি হবেন এমন কথাই শোনা যাচ্ছে বিএনপি নেতাদের মুখে মুখে। এ ব্যাপারে কথা হয় খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে। তিনি বলেন, রমজানে সিলেটে ছিলাম। প্রতিদিন অনেক দাওয়াত এলেও গড়ে তিনটি ইফতারে হাজির থাকার চেষ্টা করেছি। প্রতিবারের মতো রমজান ও ঈদে গরিব-দুস্থদের পাশে দাঁড়িয়েছি। ঈদও সিলেটে করব। চেষ্টা করব সবাইকে পাশে নিয়ে ঈদ করার।
এদিকে, জামায়াত সিলেট-১ আসনে কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে নিয়ে নির্বাচন মোকাবিলা করতে প্রস্তুত। তারা ইউনিয়ন-ওয়ার্ড পর্যায়ে দলের ভিত্তি শক্ত করার প্রাথমিক কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন করেছে। অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনগুলোর কমিটির কাজ প্রায় সম্পন্ন। রমজানে পাড়া, মহল্লা, কলোনির দুস্থদের মধ্যে ইফতার বিতরণ চলছে। ঈদ উপহার ও আর্থিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে গরিব দুস্থদের। জামায়াত প্রার্থী জুবায়ের ছাত্রাবস্থা থেকে অদ্যাবধি স্বৈরাচারবিরোধীসহ স্থানীয় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তাই সিলেটের সবকিছু তার নখদর্পণে। কমিশন নেওয়া, চাঁদাবাজ লালন করা এমন অভিযোগহীন জুবায়ের বর্তমানে দলের কেন্দ্রীয় গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। তাই তাকে মর্যাদার আসনে নির্বাচিত করার প্রাণপণ চেষ্টা অনেক আগে থেকেই শুরু করেছে জামায়াত। এমন বক্তব্য তার অনুসারীদের। এ ব্যাপারে কথা বলতে এহসানুল মাহবুব জুবায়েরকে কল করলে তার নাম্বার বন্ধ পাওয়া যায়। ৮ ফেব্রুয়ারি বিভাগের ১৯টি আসনের প্রার্থী তালিকা ঘোষণা করেছিলেন এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নিজেই।
সিলেটের বাইরে হবিগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের পুরোনো ঘাঁটি। এই ঘাঁটি দখলে এবার বিএনপি-জামায়াত দুদলই মরিয়া। তবে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের বহর এই রমজানে গেছেন উমরাহ করতে। ওখান থেকে ফিরে মনোনয়নপ্রত্যাশীরা ইফতার মাহফিলে উপস্থিত থাকছেন। জামায়াতের প্রার্থীরা অতীতের চেয়ে এবার আরও গতিশীল। দলের কর্মীদের ধরে যাচ্ছেন ভোটারদের কাছে।
সিলেট-১ আসনের পরই আলোচিত আরেক আসন সিলেট-৬। এই আসনে সব সময়ই শক্ত প্রার্থী দেয় সব দল। গোলাপগঞ্জ-বিয়ানীবাজার নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার কোমর বেঁধে নেমেছেন বিএনপির ফয়সল আহমদ চৌধুরী। এই আসনে অতীতেও দলের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল তাকে। দলের জন্য বারবার ত্যাগ স্বীকার করে আসা শিল্পপতি ফয়সল দুহাত ভরে গরিব-দুস্থদের সাহায্য করছেন রমজানে। ঈদের জন্যও নিয়েছেন বিশাল উদ্যোগ। সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের এই আসনের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য প্রস্তুত ফয়সল। সুনামগঞ্জের ছাতক-দোয়ারা আসন সাত বার দখলে গেছে আওয়ামী লীগের। বর্তমানে আওয়ামী লীগ মাঠে নেই। বিএনপি এই আসন এবার দখলে নিতে চায়। সাবেক এমপি কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন রমজানজুড়ে ছিলেন মাঠে। তিনি জানালেন, নির্যাতিত-নিপীড়িত নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে শত শত মামলা। টানা ১৫ বছরের নির্যাতনের পরিত্রাণ চান তারা। ছাতক-দোয়ারা আসনে তৃণমূলের ভিত এখন অনেক শক্ত। এবার ধানের শীষের জয় হবেই হবে। সুনামগঞ্জ-১ আসন, তাহিরপুর-জামালগঞ্জ-ধর্মপাশা ও মধ্যনগরের প্রত্যন্ত এলাকার নেতাকর্মীদের নিয়ে পুরো রমজান ইফতার করেছেন মনোনয়নপ্রত্যাশী আনিসুল হক। ২০১৮ সালেও তাকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল। তিনি বলেন, মনোনয়ন দলের হাতে আর ভোট জনগণের হাতে। নির্বাচনে এবার ধানের শীষের জয় হবেই এমন বিশ্বাস তার।
মৌলভাবাজারের নির্যাতিত নেতা আলহাজ মুজিবুর রহমান। তিনি বহুল আলোচিত মৌলভীবাজার-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। স্থানীয়রা বলছেন, এই আসন নৌকার ঘাঁটি। কারাগারে বন্দি সাবেক কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ ৭ বার নির্বাচিত হয়েছেন নৌকা প্রতীক আর চা বাগানের ভোটারদের জোরে। মুজিবের অনুসারীরা বলছেন, এবার মাঠ খালি। নৌকার ক্যাডারদের কারণে এখানে সুষ্ঠু ভোট হয়নি অতীতে। এবার সুষ্ঠু ভোট হলে মুজিবই এমপি হবেন। কারণ মুজিবের অতীত নিয়ে কিছু গুঞ্জন থাকলেও এলাকায় শিক্ষা বিস্তার ছাড়াও গরিব-দুস্থদের পুনর্বাসন, সাহায্য-সহযোগিতা লক্ষণীয়। শুধু দল নয়, উপকারভোগীরাও এবার মাঠে নামবেন মুজিবের জন্য।
মাঠের নেতারা বলছেন, নিকট অতীতে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাবস্থায় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মীদের ওপর ছিল মামলার পাহাড়। গত ১৫ বছরে ইফতার, ঈদ করতে পারেননি নেতাকর্মীরা। অনেক বছর পর এবার প্রকাশ্যে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ পেয়েছেন সবাই। এই সুযোগ কাজে লাগাতে রমজানের ইফতার দিয়ে শুরু করা রাজনৈতিক তৎপরতা ঈদে আরও সরগরম হবে, নতুন মাত্রা পাবে।