
প্রিন্ট: ২৮ মার্চ ২০২৫, ১১:৩৭ এএম
গোলটেবিল বৈঠকে ড. আলী রীয়াজ
সংস্কার না হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে
রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন করে গড়তে এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে -ড. বদিউল আলম

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২১ মার্চ ২০২৫, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের ভেতর দিয়ে কর্তৃত্ববাদী আওয়ামী শাসন অবসানের পর জনমনে রাষ্ট্র সংস্কারের যে গভীর আকাঙ্ক্ষা সৃষ্টি হয়েছে সেই কাজটি সুসম্পন্ন হওয়া জরুরি। সংস্কার না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রধান ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘সংস্কার শুধু সরকারের ইচ্ছার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক দল এবং নাগরিকদের বহুল আকাঙ্ক্ষিত বিষয়। তাই সংস্কারের বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা ও নাগরিক সনদ প্রণয়ন করতে হলে নাগরিকদের সোচ্চার হতে হবে।’ বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে সুজন আয়োজিত ‘রাষ্ট্র সংস্কারে রাজনৈতিক ঐকমত্য ও নাগরিক ভাবনা’ শীর্ষক গোলটেবিলে এসব কথা বলা হয়েছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদারের সভাপতিত্বে গোলটেবিলে বক্তব্য রাখেন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সদস্য বিচারপতি এমদাদুল হক, সাবেক সচিব আবদুল আউয়াল মজুমদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী, প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. আসিফ মোহাম্মদ সাহান, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, ইউনিভার্সিটি প্রেসের স্বত্বাধিকারী মাহ্রুখ মহিউদ্দিন প্রমুখ। লিখিত প্রবন্ধ পাঠ করেন সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘১৫ বছরে বাংলাদেশে ভঙ্গুর প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরও ভঙ্গুর করে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার পর গত ৫৪ বছরে কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দেখেছি, গত ১৫ বছরে বিচার বিভাগকে কীভাবে ধ্বংস করা হয়েছে। সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন না হলে, প্রশাসন ও বিচার বিভাগকে পুনর্গঠিত করা না হলে সুষ্ঠু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠিত হলেও ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ফিরে আসতে পারে। তাই ভবিষ্যতে স্বৈরতন্ত্রের পুনরুত্থান ঠেকাতে কাঠামোগত পরিবর্তন করতে হবে, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে হলে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে।’ ড. রীয়াজ বলেন, সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা বাইরে থেকে হচ্ছে, ভেতর থেকেও হচ্ছে। যারা মনে করে, বর্তমান কাঠামো অব্যাহত রাখা দরকার। বিশেষ করে যারা পরাজিত শক্তি, তারা এটা মনে করে। তাই সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, নাগরিকদের অংশগ্রহণ, চাপ ও অন্তর্ভুক্তি ছাড়া কোনোভাবেই সংস্কার প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়া যাবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর পর নাগরিকদেরও মতামত নেওয়া হবে।’
ড. আলী রীয়াজ বলেন, ‘যে অভাবনীয় রক্তপাতের মধ্য দিয়ে এ জায়গায় এসেছি, সেখান থেকে খালি হাতে ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করা না গেলে নির্বাচন হলেও আগের পরিস্থিতি হবে। তাই কাঠামোগত সংস্কারের আর কোনো বিকল্প নেই। বর্তমান কাঠামোগত ব্যবস্থায় স্বৈরতন্ত্রের মোকাবিলা করা যাবে না।’ ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “শেখ হাসিনা দেশে স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এই ব্যবস্থায় পৌঁছাতে তার ১৫ বছর লেগেছে। শেখ হাসিনার পলায়নের পর আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে নতুন করে গড়ে তোলার জন্য এক অপূর্ব সুযোগ তৈরি হয়েছে। এ লক্ষ্যে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন কাজ করছে, যাতে একটি ‘নাগরিক সনদ’ তৈরি করা যায়।” তিনি বলেন, ‘বর্তমান সরকারের তিনটি ম্যান্ডেট। একটি হলো, স্বৈরাচারী ব্যবস্থা যাতে আবার ফিরে আসতে না পারে সেজন্য কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করা, দ্বিতীয়ত মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষীদের বিচারের আওতায় আনা, তৃতীয়ত একটি সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন আয়োজন করা। এগুলো একই সঙ্গে হতে পারে, এগুলো পরষ্পরের সঙ্গে সংঘর্ষিক নয়।’
বিচারপতি এমদাদুল হক বলেন, ‘আমি মনে করি, সংস্কার একটি চলমান প্রক্রিয়া। কিন্তু এখন সময় এসেছে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের।’ ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সত্যিকার অর্থেই ধর্মনিরপেক্ষ। এখানে সুফিবাদের মাধ্যমে ইসলামের প্রচার ও প্রসার হয়েছে। কিন্তু তারপর সংস্কার কমিশনের জরিপে ৮৫ শতাংশ মানুষ ধর্মনিরপেক্ষতার বিপক্ষে মতামত দিয়েছেন। এর অন্যতম কারণ হলো জর্জ ডব্লিউ বুশের সময়ে শুরু হওয়া ওয়ার অন টেরর বা সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি মৌলবাদী রাষ্ট্রে পরিচিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে।’
আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, ‘মূল সমস্যা হলো পারস্পরিক আস্থা না থাকা। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই আমাদের সামনের দিকে এগোতে হলে সামাজিক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।’