Logo
Logo
×

বাতায়ন

স্বতন্ত্র মহিমায় একজন নুরুল ইসলাম

Icon

বদিউর রহমান

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২২, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

স্বতন্ত্র মহিমায় একজন নুরুল ইসলাম

যমুনা গ্রুপের সাবেক চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলাম

দেশের সুপ্রতিষ্ঠিত মানুষকে নিয়ে, ওই গুণিজনদের সম্বন্ধে কম জানা কারও লেখা আমি সমীচীন মনে করি না।

কারণ কারও সম্বন্ধে আলোচনাই হোক, আর সমালোচনাই হোক কিংবা একপেশে প্রশংসাই হোক-নৈর্ব্যক্তিকভাবে (অবজেকটিভ) লিখতে না পারলে তা হিতে বিপরীত হতে পারে।

তারপর আবার মৃত্যু-পরবর্তী লেখা তো আরও কঠিন। কারও কারও ধারণা-মৃত ব্যক্তি সম্বন্ধে লেখা সহজ, কেননা তিনি তো আর ওই লেখা সম্পর্কে বাদ-প্রতিবাদ কিছুই করতে পারবেন না। আমি বলি, তজ্জন্যই মৃত ব্যক্তি সম্পর্কে লেখা জীবিত কারও সম্পর্কে লেখা থেকে অনেক বেশি কষ্টকর এবং এতে উচ্চমাত্রায় দায়িত্বশীলতা প্রয়োজন।

মিথ্যা স্তুতিবাক্য সংবলিত লেখায় হয়তো ক্ষতিকর কিছু আপাতদৃষ্টিতে দেখা যায় না; কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ফলস্বরূপ ওইসব মিথ্যা প্রশংসা বরং ওই মৃত গুণিজনকে অসম্মানিত করারই শামিল বলা চলে।

মৃত্যুর পর ঐতিহাসিক মূল্যায়ন এক বিষয়, যা সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় এবং কালজয়ী হিসাবে টিকে থাকে; আর অযথা তোষামোদি ধরনের লেখা আরেক বিষয়, যা প্রকৃতিগতভাবে খুবই সাময়িক হয়েই শেষ হয়ে যায়। শেখ হাসিনা এখন জীবিত, তার সম্পর্কে কত চাটুকার কতরকম মূল্যায়ন করে থাকবেন; কিন্তু আগামী পঞ্চাশ থেকে একশ বছর পর সে মূল্যায়ন কতটুকু সময়ের পরীক্ষায় টিকে যাবে, তা হবে বড় বিবেচ্য। আমার নিজস্ব বিশ্বাস হচ্ছে, কাউকে ব্যক্তিক (সাবজেকটিভ) মূল্যায়নে যত না আনা যায়, ততই মূল্যয়নটা মেদবিহীন হবে।

আমি কারও সম্বন্ধে সাহসী লেখা লিখতে চাইলে তার জীবদ্দশায়ই লেখা শ্রেয় মনে করি। এই যে আমরা গুণিজনদের অনেককে মরণোত্তর রাষ্ট্রীয় সম্মাননা বা পুরস্কার দিয়ে থাকি, এটা অনেকটা ‘দাঁত থাকতে দাঁতের মূল্য বুঝি না’র শামিল।

তারপরও আমরা মৃত গুণিজনকে নিয়েও স্মৃতিকাতর হই, তাকে সম্মান দেখানোর জন্যও তার জন্ম বার্ষিকী-মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা কিছুটা বলতে চাই। তবে এটা হওয়া উচিত মেদবিবর্জিত এবং তোষামদ-পরিত্যাজ্য। আমরা যারা পত্র-পত্রিকায় একটু-আধটু লেখালেখি করে থাকি, তাদের কাছে পত্রিকার মালিক ও সম্পাদক, সম্পাদকীয় বিভাগের দায়িত্বপালনকারী ব্যক্তিবর্গ আলোচিত হয়ে থাকেন। কেউ বা হয়তো প্রত্যক্ষভাবে, কেউ পরোক্ষভাবে। যুগান্তরে লেখার সুবাদে আমিও পত্রিকাটির মালিক, সম্পাদক এবং সম্পাদকীয় বিভাগের কারও কারও সঙ্গে, এমনকি রিপোর্টারদের কারও সঙ্গেও আলাপ-আলোচনায় সংশ্লিষ্ট হয়েছি। আজ স্মৃতিচারণায় তারই সামান্য আলোকপাত করতে চাই।

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের আগে অন্যান্য ম্যাগাজিন ছাড়া সাপ্তাহিক গণবাংলায় ‘প্রিয়-অপ্রিয়’ নামে একটা কলাম লিখতাম। সানাউল­াহ নূরী সাহেব ছদ্মনাম ‘আলাপী’ ঠিক করে দিয়েছিলেন। কলামের নামটাও তারই দেওয়া।

দৈনিক পূর্বদেশে শিক্ষার্থীর পাতায় এবং উপসম্পাদকীয় কলামেও লিখেছি। ১৯৭৯ সালে সরকারি চাকরিতে এসে ওসব লেখালেখি বন্ধই হয়ে গেল। স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অবসরের পর আবার লেখার ইচ্ছা হলো। তখন আমার সেই গণবাংলাও নেই, পূর্বদেশও নেই। কেন জানি যুগান্তরে লেখার ইচ্ছা হলো। সোজা চলে গেলাম সম্পাদক মরহুম গোলাম সারওয়ারের অফিসে, মতিঝিলে।

তখন স্বেচ্ছায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে অবসরে যাওয়ার পর আমি বেশ আলোচিত-সমালোচিত একজন। সারওয়ার সাহেব সোহরাব হাসান সাহেবকে ডেকে আমার লেখার কথা বললেন। তারা উৎসাহও দিলেন। সোহরাব সাহেবের কক্ষে বসেই আমার কলামের নাম ঠিক করলাম ‘চেতনায় বুদবুদ’। কিন্তু তারা ‘বুদবুদ’ বানানটা যুক্তাক্ষর করে ‘বুদ্বুদ’ করে ফেললেন। ‘একাত্তরের ঝর্ণাতলা’র কলামিস্ট সদ্যপ্রয়াত মহিউদ্দিন স্যার এ যুক্তাক্ষরের বানান পছন্দ করলেন না। কিন্তু আমার নেওয়া প্রথম লেখা ‘‘দু’সম্পাদক ও আমি’’ সারওয়ার সাহেব এবং সোহরাব সাহেব ছাপাতে রাজি হলেন না। তাদের বক্তব্য-অন্য দু’সম্পাদককে নিয়ে লেখা ছেপে তারা নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্টে যেতে আগ্রহী নন। তারপরও ভিন্ন লেখা দিয়ে সেই ২০০৮ সালে যুগান্তরে লেখা শুরু। অবশ্য ‘‘দু’সম্পাদক ও আমি’’ লেখাটি পরে আরেক সাহসী সম্পাদক মতিউর রহমান চৌধুরী তাদের এক সাপ্তাহিকে হুবহু ছেপেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, আমার বিরুদ্ধে লেখা হলেও আমি তা ছাপাব। আমি তাজ্জব হয়েছিলাম। জনাব চৌধুরী প্রকৃতই একজন সাহসী সম্পাদক।

লেখা সূত্রেই একদিন সোহরাব সাহেবের কক্ষে ঢুকলাম। সেখানেই সর্বপ্রথম যুগান্তরের মালিক বীর মুক্তিযোদ্ধা নুরুল ইসলামকে দেখলাম। আমি আগে কখনো তাকে দেখিওনি, কখনো তার সঙ্গে আমার কথাও হয়নি, আলাপ-পরিচয় তো ছিলই না। শিল্পপতি বা পত্রিকার মালিক হিসাবে রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকাকালীন আমার সঙ্গে কারও কারও দেখা-সাক্ষাৎ হলেও এই নুরুল ইসলাম সাহেবের সঙ্গে আমার কখনো দেখা হয়নি।

সোহরাব সাহেবের কক্ষে আমাকে দেখেই নুরুল ইসলাম সাহেব সালাম দিয়ে আমাকে বললেন, স্যার, আপনি এখানে কী মনে করে? আমি চিনে উঠতে না পেরে ইতস্ততভাবে থাকায় সোহরাব হোসেন তার সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি তখন অনেকটা বোকা-বোকাভাবে ভাবছিলাম, আমি এনবিআরের চেয়ারম্যান ছিলাম, অথচ এত বড় একজন শিল্পপতিকে চিনতেই পারলাম না। এর কারণও ছিল, যারা বড় শিল্পপতি বা বড় ব্যবসায়ী হিসাবে কখনো আমার কাছে যাননি বা যাদের যাওয়ার প্রয়োজন হয়নি-নুরুল ইসলাম সাহেব তাদেরই অন্যতম।

আমি যে তাকে চিনতে পারিনি, সোহরাব সাহেব তা আঁচ করে আমি যুগান্তরে লেখা শুরু করেছি বলে আমাকে সহজ করে দিতে সচেষ্ট হলেন। আমি এবার আরও অবাক হলাম, নুরুল ইসলাম সাহেব বললেন, স্যার তো খুব স্পষ্টবাদী, কড়া কথা বলেন, তার লেখা ছাপবেন। আমার ঘোর কাটে না। নুরুল ইসলাম সাহেব বয়সেও আমার বড়, দেশের অগ্রণী শিল্পপতিদের অন্যতম, আমি তখন আর এনবিআর বা সরকারেরও নেই, অবসরে; তিনি কেন আমাকে স্যার বলে সালাম দেবেন? সেই ঘোর আমার আজও কাটেনি।

পরে পত্রিকার জন্ম দিনের ১ ফেব্র“য়ারির অনেক অনুষ্ঠানে গিয়ে বুঝলাম, ওটা তার ভদ্রতা, বিনয়, অন্যকে সম্মান করার এক ভিন্ন আন্তরিক-স্টাইল। পরে যতবারই তাদের অনুষ্ঠানে গিয়েছি, তার আন্তরিক সাদর-সম্ভাষণ আমাকে যারপরনাই মুগ্ধ করেছে।

আমি সচরাচর পেছনের সারিতে বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতাম। সম্পাদক সাইফুল আলম, মাহবুব কামাল, আসিফ রশীদ, বিএম জাহাঙ্গীর, কবীর সাহেব গং আমাকে সামনের সারিতে নেওয়ার জন্য বেশ চাপাচাপি করতেন, আমি যেতাম না। কিন্তু একবার পড়ে গেলাম বাবুল সাহেবের নজরে। তিনি আমাকে হাত ধরে নিয়ে গেলেন সামনের সারিতে। অগত্যা আমাকে যেতেই হলো, নচেৎ আমার বেয়াদবি হতো। আমাকে দেখানো তার সম্মানের প্রত্যুত্তরে এই প্রথম আমি বিনয়াবত হয়ে তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলাম। লক্ষ করলাম, তিনি আমার থেকে আরও বেশি বিনয়ী হয়ে গেলেন। আমি তার মাঝে কোনো ‘আমিত্ব’ দেখলাম না। ৬ ফেব্র“য়ারি, ২০১৭ তারিখে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ছাপানো ছবিতে দেখি এ ছবিটাও এসে গেছে। ক্যামেরাম্যান কোন ফাঁকে যে ছবিটি তুলেছেন, আমি টেরই পেলাম না। এখন স্মৃতি হিসাবে আমি এ ছবিটি সযত্নে রাখলাম। এখন মনে হয়, একটা ছবি তো অন্তত এ ব্যক্তিত্বের সঙ্গে আমার থাকল। অথচ আমাদের এক নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে কয়েকটা অনুষ্ঠানে যোগ দিলেও, কোনোটাতে দীর্ঘসময় পাশাপাশি বসলেও, ছবি তোলার আগেই আমি সরে গিয়েছি। বিয়ের দাওয়াতে তার টেবিলে খেতে সাধলে তো আমি যাই-ইনি। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক গভর্নর ওই নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে সীমিত মেহমানের এক ডিনারে দাওয়াত দিলেও আমি যাইনি।

নুরুল ইসলাম সাহেবের আরেকটা বড় গুণ দেখলাম, যুগান্তরের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে চমৎকার আপ্যায়নের আয়োজন। আমন্ত্রিত অতিথিদের অনেককে তিনি নিজে খাবার টেবিলে সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে বসাতেন। আমি সাধারণত এসব অনুষ্ঠানের ‘রিচ ফুড’ খেতে চাইতাম না। কিন্তু একবার আমি রেহাই পেতে পারলাম না।

খোদ নুরুল ইসলাম সাহেব আমাকে, প্রয়াত মহিউদ্দিন স্যারকে এবং মরহুম সৈয়দ আবুল মকসুদকে সঙ্গে নিয়ে নিজে ভিআইপি টেবিলে বসিয়ে দিলেন। তখন কি আর বেয়াদবি করা যায়? এই ছিল তার অকৃত্রিম আন্তরিকতা। এখন তার অবর্তমানে মূল্যায়ন করলে বুঝতে পারি, তিনি যে মাপের সুপ্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তিনি অনুষ্ঠানের মঞ্চে এরশাদের সঙ্গে বড় কেক কাটার পর আমাদের মতো চুনোপুঁটিকে এভাবে টেবিলে নিয়ে না গেলে কি আতিথেয়তা হতো না?

হতো হয়তো, কিন্তু তার হয়তো নিজস্ব তৃপ্তি থাকত না। তবে একবার এ ধরনের এক খাবারের অনুষ্ঠানে এক মজার কাণ্ড ঘটে গেল। ভিআইপি টেবিলের সব মেহমানের সঙ্গে বিএনপির এক নেতা (এখনো জীবিত) হেঁটে হেঁটে হ্যান্ডশেক করছেন। আমার পাশের একজনের দিকে ওই নেতা হাত বাড়িয়ে দিলেও ওই ভদ্রলোক তার হাতই বাড়ালেন না। ওই নেতা অগত্যা অন্যমনস্কভাবে নিজেকে গুটিয়ে নিলেন। পরে নুরুল ইসলাম সাহেব সে দৃশ্য নিয়ে আমাকে বললেন, রাজনীতিক হলেই যে সবাই তার সঙ্গে হ্যান্ডশেক করবেন-এমন ধারণা সব রাজনীতিকের না থাকাই ভালো। নুরুল ইসলাম সাহেবের এ অসামান্য মন্তব্যে আমি তার জ্ঞানের গভীরতা ও রসিকতা দুটিই টের পেলাম।

যুগান্তরের মান-উন্নয়নের জন্য মাঝে একবার সম্পাদক সাহেব এবং অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে আমাদের অনেক লেখককে নিয়ে আলোচনা-পরামর্শের একটা অনুষ্ঠান চালু হয়েছিল। আমাদের জন্য দুপুরে ভালো খাবারেরও ব্যবস্থা হতো। এর বাইরে অন্যান্য আলোচনা-অনুষ্ঠান তো মাঝে মাঝে হতোই। তখন শুনেছিলাম, এ ধরনের পরামর্শ-আলোচনার উদ্যোক্তা ছিলেন জনাব নুরুল ইসলাম। তিনি পত্রিকাকে তার মালিকানার প্রভাব থেকে নিজস্ব স্বকীয়তায় চালু রাখতে সচেষ্ট ছিলেন। যমুনা টেলিভিশনকেও তিনি মালিক-স্বার্থের গণ্ডিতে আবদ্ধ রাখতে কখনো আগ্রহী ছিলেন না মর্মেই জেনেছি। তখন আমরা বেশ কড়া কড়া লেখাও যুগান্তরে ছাপতে দেখেছিলাম।

আগস্ট মাসের ধারাবাহিক লেখায় আমারও বেশ কড়া এক মন্তব্য যুগান্তর তখন ছেপেছিল। জনাব নুরুল ইসলামের অবর্তমানেও যুগান্তর সব সময় সে সাহস ধরে রাখবে, এটাই প্রত্যাশা। পত্রিকার মতিঝিলের কার্যালয়ে একবার প্রায় এক ঘণ্টা পত্রিকার প্রকাশক সালমা ইসলামের সঙ্গে আলোচনায়ও পত্রিকার স্বাতন্ত্র্য-স্বাধীনতা রক্ষার দৃঢ়তা লক্ষ করেছিলাম। তাই আমি যুগান্তরে লেখা এখনো বন্ধ করিনি। আশা করব, একজন নুরুল ইসলামের স্বাতন্ত্র্যবোধ যুগান্তর বহাল রাখবে।

১৩ জুলাই, ২০২২ দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা তার বিদেহী আত্মর মাগফিরাত কামনা করি। আমি তার জানাজায় উপস্থিত থাকতে পেরে নিজেকে তৃপ্ত ভাবি। তার উত্তরসূরিদের দীর্ঘায়ু কামনা করি।

বদিউর রহমান : সাবেক সচিব, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম