
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ১২:৩৮ পিএম
আগামী প্রজন্মের কাছে জাতির প্রত্যাশা

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: ২৫ নভেম্বর ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
সত্যের কাঠিন্যে এটি প্রতিষ্ঠিত যে, সচেতন-অবচেতন মনের আড়ালে নিগূঢ় অশুভ অন্ধকার অন্তরের সচলতাকে কখনো উজ্জীবিত করতে পারে না। আধুনিকতা-মননশীলতা-সৃজনশীলতা-নান্দনিকতা-অসাম্প্রদায়িকতা; সর্বোপরি মানবিকতার বিকাশ ও বিস্তারে তারুণ্যের উচ্ছ্বাসই নির্ভরযোগ্য উৎসস্থল।
সমকালীন বিশ্বে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে তরুণদের মেধা-প্রজ্ঞা-জ্ঞান ও যুক্তিনির্ভর সমাজ বিনির্মাণে মানবপুঁজি হিসাবে বিনিয়োগে চরম অবজ্ঞা-অমনোযোগ পরিলক্ষিত। বিপরীতে কুসংস্কার-কূপমণ্ডূকতা-সাম্প্রদায়িকতার মোড়কে জঙ্গি-মৌলবাদ চাষাবাদে অধিকতর অনুপ্রাণিত করার অপকৌশলের অবলোকন যারপরনাই অজানা আতঙ্ক-আশঙ্কা নির্মাণ করছে।
অধিকন্তু কদর্য পাপাচার-অনাচার-কদাচার মনোবৃত্তির প্রচার-প্রসারে অশোভন বিনোদন-আনন্দের অপসংস্কৃতির গতিপ্রবাহ অত্যধিক গুরুত্ব পাচ্ছে। কথিত সামাজিক যোগাযোগ-ইন্টারনেট-ফেসবুকের প্রোৎসাহে প্রজন্মের সুপ্ত প্রতিভা ও অফুরন্ত বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা-চেতনাকে অবদমন করে সামগ্রিক নষ্টামির প্রাধান্য ভবিষ্যৎকে কোন পথে এগিয়ে নিচ্ছে, সচতেন মহলে তা বোধগম্য নয়।
উল্লেখ্য, অরাজক পরিস্থিতি উত্তরণে বিশ্বকবি রবিঠাকুরের ‘অন্তর মম বিকশিত করো’ অমূল্য কাব্যগাঁথার পঙ্ক্তিগুলো বিশেষভাবে প্রযোজ্য-‘অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে। নির্মল করো, উজ্জ্বল করো, সুন্দর করো হে।/ জাগ্রত করো, উদ্যত করো, নির্ভয় করো হে।/ মঙ্গল করো, নিরলস নিঃসংশয় করো হে।/ অন্তর মম বিকশিত করো, অন্তরতর হে।’
এটি অনস্বীকার্য; শুধু দেশে নয়, সমগ্র বিশ্বে প্রজন্মের ভবিষ্যৎকে প্রগাঢ় নিষ্প্রভ করার ঘৃণ্য উদ্দেশ্যে সৃষ্ট যাবতীয় মানবিক সংকট উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে সভ্যতাকে এগিয়ে নেওয়ার সব অনুষঙ্গকে প্রচণ্ড পর্যুদস্ত করছে। পরিশুদ্ধ আদর্শের আচ্ছাদনে নীতিনৈতিকতা-সততা-সত্যবাদীতায় ঋদ্ধ করার সমূহ সম্ভাবনার প্রজ্বালিত সব প্রদীপ যেন ধীরে ধীরে নিভিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
ক্রমবর্ধমান নৃশংসতা-সহিংসতা-অর্থলোভ-ভোগবিলাস-অবাঞ্ছিত আকর্ষণ তারুণ্যের অপ্রতিরোধ্য শক্তিমানতার অগ্রযাত্রায় নির্মম অন্তরায় দুর্ভেদ্য প্রাচীর হিসাবে কঠিন থেকে কঠিনতর হচ্ছে। অপাঙ্ক্তেয় অবয়বে সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়ায় পরিবার-নিু শ্রেণি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক-আনুষ্ঠানিক জ্ঞানার্জনের অন্তরায় হিসাবে প্রজন্মের প্রাণস্পন্দন-কর্মস্পৃহা অচল করার অপচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
পক্ষান্তরে জনশ্রুতি মতে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সর্বনিকৃষ্ট ব্যক্তিদের অশুভ ক্ষমতায়ন লুম্পেন-অনগ্রসর সমাজের মতো দুর্বলের আধিপত্য পাকাপোক্ত করার অসম প্রতিযোগিতা সর্বত্রই সমাদৃত।
দেশবাসী সম্যক অবগত আছেন, দেশের মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশই তরুণ, যা জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে। এ যুবদের নানামুখী দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির উদ্দেশ্যে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ২০১৭ সালের ১০ এপ্রিল যুব নীতিমালা প্রণয়নে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। যুব উন্নয়নে সরকারের কর্মকৌশল সম্পর্কেও এ নীতিমালায় সুস্পষ্ট গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে। উন্নত যুবসমাজ তৈরিতে এ নীতিমালা কতটুকু বাস্তবায়িত হয়েছে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
বিভিন্ন বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যথার্থ কর্মপরিকল্পনার অভাব, ত্রুটিপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থা, বৈষম্যমূলক নীতি, অপর্যাপ্ত গবেষণা, অপ্রতুল বরাদ্দ ও বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়হীনতাসহ নানা অব্যবস্থাপনা দেশের তরুণদের সামগ্রিক উন্নয়নে প্রধান অন্তরায় হিসাবে বিবেচ্য। বেসরকারি সংস্থা ব্র্যাক, বিআইজিডি এবং ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা সূত্রে জানা যায়, প্রয়োজনীয় দক্ষতার অভাবে বাংলাদেশি তরুণ-তরুণীরা চাকরির বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে আছে।
বাংলাদেশের স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে শিক্ষার্থীরা যে শিক্ষা পাচ্ছে, তাতে তারা চাকরির জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের জরিপে দেশের ৪৭ শতাংশ তরুণের মতামতে প্রতিফলিত হয়েছে, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক সুযোগের অসমতা তাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা।
অর্ধেকের বেশি তরুণদের ধারণা, দেশের নীতিনির্ধারকরা তাদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা নিয়ে ভাবেন না। নীতিনির্ধারকদের বৈষম্যমূলক এই নীতিতে তারা উৎকণ্ঠিত। বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা যায়, স্বনামধন্য একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের ৬৬ বা দুই-তৃতীয়াংশই বেকার।
স্নাতক বা স্নাতকোত্তর শেষ করে চাকরি পেয়েছে মাত্র ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী এবং নিজ উদ্যোগীর সংখ্যা ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত বিশ্বব্যাংক জরিপেও স্নাতক পাশ করা ৪৬ শতাংশ শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের চিত্র ফুটে ওঠে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার ১০ দশমিক ৭ শতাংশ, যা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় ২৮টি দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে প্রকাশ, দেশে শিক্ষিত মানুষের মধ্যে বেকারত্বের হার ৪৭ শতাংশ। প্রতি বছর দেশে শ্রমশক্তিতে যোগ হচ্ছে ২০ লাখ মানুষ। কিন্তু সে অনুপাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বড় একটি অংশ বেকার থেকে যাচ্ছে।
সিডার কর্মসংস্থান ও শ্রমবাজারবিষয়ক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা যত বেশি, তার চাকরি পাওয়ার সম্ভাবনা তত কম। কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে তরুণরা কর্মমুখী হতে না পেরে নানাবিধ সমস্যায় হতাশা থেকে বৈধ-অবৈধ উপায়ে দেশ ত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) ‘ট্যাকলিং দ্য কোভিড-১৯ ইয়ুথ এমপ্লয়মেন্ট ক্রাইসিস ইন এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে করোনা মহামারির প্রভাবে বাংলাদেশে স্বল্পমেয়াদে ১১ লাখ তরুণের কর্মসংস্থান হারানোর আশঙ্কা প্রাক্কলিত হয়েছিল, যা দীর্ঘমেয়াদে ১৬ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওই প্রতিবেদনে সংস্থা দুটি এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ৬৬ কোটি তরুণ জনগোষ্ঠীর জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষা-প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অব্যাহত রেখে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা দূরীকরণে জরুরি ভিত্তিতে বৃহৎ ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণের তাগিদ দিয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ১৩টি দেশে ১ থেকে ১ কোটি ৫০ লাখ তরুণের বেকার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উল্লেখ্য, দেশগুলোর কৃষি, খুচরা বাণিজ্য, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, অভ্যন্তরীণ পরিবহণ, নির্মাণ, বস্ত্র ও পোশাক খাত এবং অন্যান্য সেবা খাতে কর্মসংস্থান হারানো ও বেকার তরুণদের সংখ্যার প্রক্ষেপণে শীর্ষ দেশ হচ্ছে ভারত। চলতি বছর দেশটিতে স্বল্পমেয়াদে ৪০ লাখ ৮৪ হাজার ও দীর্ঘমেয়াদে ৬১ লাখ ১৩ হাজার তরুণ কর্মচ্যুত ও বেকার হতে পারে।
ভারতের পরে অবস্থানকারী পাকিস্তানে স্বল্পমেয়াদে ১৫ লাখ ৬ হাজার ও দীর্ঘমেয়াদে ২২ লাখ ৫৮ হাজার, ইন্দোনেশিয়ায় স্বল্পমেয়াদে ১২ লাখ ৬৩ হাজার ও দীর্ঘমেয়াদে ১৮ লাখ ৮১ হাজার, ফিলিপাইনে স্বল্পমেয়াদে ৬ লাখ ৮৭ হাজার ও দীর্ঘমেয়াদে ১০ লাখ ১৯ হাজার তরুণের কর্মহীন হওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। উল্লেখ্য, খাতগুলোয় দেশের মোট তরুণের ৭৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেকারত্ব বরণের পূর্বাভাস প্রাক্কলিত হয়েছে।
গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন তথ্যসূত্রের পরিসংখ্যানে এটি সুস্পষ্ট যে, বাংলাদেশে ৭৫ লাখেরও বেশি মাদকসেবী রয়েছে। ২০১৯ সালের ২ এপ্রিল বেসরকারি সংগঠন মাদকদ্রব্য ও নেশা নিরোধ সংস্থা মানস-এর তথ্যমতে, দেশের মাদকসেবীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই যুবক; যাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ বেকার এবং ৫০ শতাংশ বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে জড়িত। মাদকের মরণ ছোবলে আক্রান্ত তরুণ প্রজন্ম আজ কঠিন বিপর্যয়ে নিপতিত।
সমাজসেবা অধিদপ্তরের গবেষণা মতে, শহর-গ্রাম থেকে শুরু করে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা প্রতিনিয়ত মাদকাসক্ত হচ্ছে। স্বনামধন্য কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে চলছে রমরমা মাদক বাণিজ্য। নিত্যদিন বসছে নেশার আসর। অনেকে নেশার টাকা জোগাড়ে জড়িয়ে পড়ছে ছিনতাই-চুরি-ডাকাতি-খুনসহ দেহব্যবসার মতো বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে। বিপুল সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থীরা নিজের জীবনকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিচ্ছে। এর ফলে দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ আশা-আকাক্সক্ষার ভরসাস্থল তরুণ প্রজন্ম অন্ধকারের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাচ্ছে।
কোভিড-১৯ অতিমারির চরম দুঃসময়ে শিশু-কিশোর-তরুণ সমাজের অপরাধের ভয়াবহ দৃশ্যপট এই অতিমারির চেয়েও দুর্বিষহ পরিপ্রেক্ষিত তৈরি করে চলছে। রাষ্ট্র-সমাজ-পরিবারসহ সামগ্রিক পরিবেশ-প্রতিবেশকে প্রচণ্ড ক্ষতবিক্ষত করে যুব সমাজের অপরাধের অপ্রতিরোধ্য গতিভঙ্গি ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতি ও মাত্রিকতায় প্রকাশ পাচ্ছে।
গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, কিশোর অপরাধের গতিময়তা হত্যা-ধর্ষণসহ মারাত্মক কুৎসিত অপরাধে কলুষিত। পরিবার-সমাজ কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে প্রয়োজনীয়-পর্যাপ্ত দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হলে এর নেতিবাচক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার চৌহদ্দি নির্ধারণ অসম্ভব হয়ে উঠবে। কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রের তথ্যমতে, কেন্দ্রে অবস্থানরত ১৪-১৬ বছর বয়সি কিশোরদের ২০ শতাংশ হত্যা এবং ২৪ শতাংশ নারী ও শিশু নির্যাতন মামলার আসামি। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, মাদকসেবন, ক্রয় ও বিক্রয়, অস্ত্র ব্যবহার-ব্যবসা ইত্যাদি জঘন্য অপরাধে জড়াতে এরা বিশেষ মহল কর্তৃক প্রতিনিয়ত প্ররোচিত হচ্ছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার ৪ কোটি বা প্রায় ৩০-৩২ শতাংশ শিশু-কিশোর। এদের এক-তৃতীয়াংশের অধিক ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। ফলে অতি সহজেই এদের যে কোনো অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সমূহ আশঙ্কা অতি প্রকট। সূত্রমতে, বরগুনার নয়ন বন্ড তার ০০৭ গ্রুপ নিয়ে জনসম্মুখে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এ হত্যার জন্য ১১ কিশোরকে কারাদণ্ড দিয়ে বরগুনার আদালত বলেছেন, ‘সারা দেশে কিশোর অপরাধ বেড়ে যাচ্ছে। গডফাদাররা এই কিশোরদের ব্যবহার করছে।’ এ ধরনের ঘটনা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও প্রায় সংঘটিত হচ্ছে। চলমান কঠিন মানবিক বিপর্যয়ের পাশাপাশি নবতর সংকট হচ্ছে এই কিশোর অপরাধ। ‘কিশোর গ্যাং উপসংস্কৃতি’ সমসাময়িক আর্থসামাজিক ব্যবস্থার প্রতিকূলে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ প্রপঞ্চ। এর সঠিক অনুধাবন-গতিপ্রকৃতি-মাত্রিকতা-কারণ ইত্যাদির বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা ব্যতিরেকে সংশ্লিষ্ট সমস্যা চিহ্নিতকরণ এবং সমাধানের স্বরূপ উন্মোচন অতিশয় দুরূহ ব্যাপার। দেশের নগর-শহর-জেলা-উপজেলাসহ প্রান্তিক অঞ্চলে এ উপসংস্কৃতির বিকাশ ও বিস্তার ইতোমধ্যে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে।
২০২১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস-২০২১ উপলক্ষ্যে আয়োজিত সভায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণা প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, বিশ্বে প্রতি বছর দশ লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যা করে। সমগ্র বিশ্বে ১৫ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের মৃত্যুর চতুর্থ কারণ হিসাবে আত্মহত্যাকে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০১৯-২০ সময়কালে করোনার সময়ে বাংলাদেশে আত্মহত্যা করেছে ১৪ হাজার ৪৩৬ জন। যাদের মধ্যে ২০-৩৫ বয়সিরাই সবচেয়ে বেশি।
১৭ নভেম্বর ২০২১ মহামান্য রাষ্ট্রপতির কিশোরগঞ্জে প্রদত্ত ভাষণ অত্যন্ত সময়োপযোগী ও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তার ভাষায় ‘ক্ষমতা বাহাদুরি দেখানোর জন্য নয়; বরং এটা জনগণের কল্যাণে কাজে লাগানো উচিত।’ প্রকৃতপক্ষে অবৈধ-অনৈতিক দৌরাত্ম্য, অর্থ-বাণিজ্যের অভিশপ্ত প্রভাব-প্রতিপত্তি ও সন্ত্রাসের মাধ্যমে নিরীহ জনগণের জমিজমা-ভূমি-জলাশয়-শ্মশান-কবরস্থানসহ যাবতীয় বিষয়-আসয় দখলে নেওয়ার হীন অভিপ্রায়ে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া কারও কাম্য নয়।
এসব নির্বাচন বা অযাচিত-অগ্রহণযোগ্য কর্মযজ্ঞে কিশোর-তরুণদের সম্পৃক্ত করে তাদেরকে বিপথে পরিচালিত করার বিষয়ে সব শুভ মহলের পক্ষ থেকে যথার্থ বার্তা প্রতিনিয়তই উচ্চারিত হচ্ছে। ১ নভেম্বর ‘জাতীয় যুবদিবস ২০২১’ উপলক্ষ্যে প্রদত্ত বাণীতে দেশের যুবসমাজের প্রতি বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নপূরণে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বাংলাদেশের সব আন্দোলন-সংগ্রাম ও অগ্রগতির পথে এ দেশের যুবসমাজের রয়েছে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা। মহান ভাষা আন্দোলন থেকে স্বাধীনতা সংগ্রামসহ এদেশের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় যুবরা যেমন জীবন উৎসর্গ করতে কার্পণ্য করেনি, তেমনি অর্থনৈতিক মুক্তির সংগ্রামেও তারা নিরলসভাবে ব্যাপৃত।’
তিনি আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার বৃহৎ অংশই যুবসমাজ। ২০৪৩ সাল পর্যন্ত যুবসমাজের সংখ্যাগত আধিক্যের এ ধারা অব্যাহত থাকবে। বাংলাদেশকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২০৩০ অর্জন এবং ২০৪১ সালের মধ্যে সুখী-সমৃদ্ধ-উন্নত দেশে উন্নীত করতে এ জনমিতিক সুবিধাকে কাজে লাগাতে হবে।
এক্ষেত্রে যুবসমাজের জন্য অংশগ্রহণমূলক, শান্তিপূর্ণ, ন্যায়সংগত ও উদ্ভাবনী উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।’ বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের সব উন্নয়ন-অগ্রগতি-অর্জন-বহির্বিশ্বে মর্যাদাসীন অসামান্য ভাবমূর্তি অক্ষুণ্ন ও সুরক্ষায় আগামী প্রজন্মের সম্মুখে জাতীয় আদর্শকে সমুন্নত করার সঠিক পন্থা অবলম্বন করতেই হবে। অন্যথায় অদূর ভবিষ্যতে তারুণ্যের চরম অধঃপতনের কাতরতা-আর্তনাদ সর্বক্ষেত্রে জাতির সম্মুখে দুরাশার ধূসর দৃশ্যপট রচিত করবে, নিঃসন্দেহে তা বলা যায়।
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়