
প্রিন্ট: ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ১১:৩৩ এএম
এ দেশে ইসলাম বিপন্ন নয়

একেএম শাহনাওয়াজ
প্রকাশ: ০১ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

ধর্ম নিয়ে ধর্মবণিকদের খেলা অনেক পুরোনো। পৃথিবীর নানা দেশে এমন খেলা অতীতেও চলেছে, এখনো চলছে। বাংলায় তেরো শতকের আগে ইসলাম বিস্তার ও মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার ধারাটি তেমন প্রবল ছিল না। মুসলমান সমাজ গড়ার আদি পদচিহ্ন দেখা যায় আট থেকে এগারো শতকের মধ্যে চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর সমুদ্র তীরাঞ্চলে। আরব মুসলমান বণিকদের কেউ কেউ স্থানীয় মেয়েদের ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করতেন।
মূলত ধর্ম প্রচারের জন্য সুফি সাধকরা বাংলায় প্রবেশ করতে থাকেন এগারো শতক থেকে। তাও সীমিত সংখ্যায়। কারণ তখন বৈরী সেন শাসকদের শাসন চলছিল এ দেশে। তেরো শতকের সূচনায় তুর্কি মুসলমানদের হাতে বাংলা অধিকৃত হলে সুফিদের প্রবেশে আর বাধা ছিল না। ফলে বাংলার বিভিন্ন অংশে সুফি আগমন ঘটতে থাকে।
সুফিদের মানবিক আচরণ আকৃষ্ট করেছিল সেন শাসনে অবহেলিত নির্যাতিত সাধারণ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে। সুফিরা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতেন। তাদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও মানবিক আচরণ ইসলাম বিস্তারের পথ সহজ করে দিয়েছিল। বিপন্ন সাধারণ হিন্দুরা অপেক্ষাকৃত ভালো আশ্রয়ের আশায়-আশ্বাসে ইসলাম গ্রহণ করতে থাকে। ইসলামের রক্ষক নামে কট্টর কোনো গোষ্ঠীর অস্তিত্ব তখন ছিল না।
বাংলাদেশে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজ বিস্তারে সুফিদের ভূমিকাই ছিল মুখ্য। সুফি দর্শনের প্রধান কথাই ছিল আল্লাহপ্রেম ও মানবপ্রেম। যে ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থে যার যার ধর্ম পালনের অধিকারকে সমর্থন করা হয়েছে, সেই ধর্মের লেবাস গায়ে দেওয়া কিছুসংখ্যক ধর্মবণিক সাধারণ ধর্মীয় স্পর্শকাতর মানুষকে উত্তেজিত করে ফেসবুকের স্ট্যাটাসের সত্য-মিথ্যা যাচাই না করে ভিন্ন ধর্মের মানুষ এবং তাদের মন্দির ও সম্পদের ওপর হিংস্র হায়েনার মতো চড়াও হচ্ছে।
ইসলাম ধর্ম এমন আচরণকে মোটেও সমর্থন করে না। ইসলাম ধর্মকে রক্ষা করার দায়িত্ব যারা কাঁধে নিয়েছে, কই তারা তো এ অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে কথা বলছে না! মহানবী (সা.) ভিন্ন ধর্মের ভিন্নমতের বিপদাপন্ন মানুষকেও রক্ষা করার জন্য এগিয়ে যেতেন, অনুসারীদের উদ্বুদ্ধ করতেন; অথচ ইসলাম রক্ষার সাইনবোর্ড গায়ে ঝুলিয়ে মহানবীর আদর্শকে অমর্যাদা করছেন আমাদের দেশের তথাকথিত ধর্মরক্ষকরা।
যারা মানবতাকে লাঞ্ছিত করে মনগড়া ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে সরল মানুষকে উত্তেজিত করে ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর চড়াও হতে ইন্ধন দিচ্ছে, এ দেশে ইসলাম ধর্ম বিস্তারে তাদের বা তাদের পূর্বসূরিদের কোনো কৃতিত্ব ছিল না। এ দেশের ধর্মনিষ্ঠ মুসলমান এসব সুবিধাবাদী রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চরিতার্থকারীকে ইসলাম ধর্ম ও সমাজ হেফাজত করার দায়িত্ব দেয়নি। আচরণে এরা বরং ইসলামের সৌন্দর্যে কালিমা লেপন করছে।
তালবে এলেমদের উসকে দিয়ে এরা শুধু নিজেদের রাজনৈতিক লাভের জন্য সমাজকে অশান্ত করতে চায়। এভাবেই তারা ইসলাম ধর্মের মহান আদর্শকে কালো কাপড়ে ঢেকে মানুষের সামনে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে। এতদিন তো ধর্মবণিকদের দেখেছি নানাভাবে ধূম্রজাল তৈরি করে ভিন্ন ধর্মের মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে। তারা সরকারকে অস্থিতিশীল করতে চাইত। এবার নতুন আরেক ইসলাম ধর্মের আদর্শবিরোধী কাজের কথা সংবাদমাধ্যমে জানতে পারি। মাগুরায় ৫০ হিন্দু পরিবারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার জন্য।
এমন অপতৎপরতার বিরুদ্ধে ইসলামের তথাকথিত রক্ষাকারীদের সোচ্চার হতে দেখিনি। বরং তারা জঘন্যভাবে সোচ্চার হয়েছে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় তুলতে। এ তৎপরতা দেখে একজন মানুষ হিসাবে, একজন মুসলমান হিসাবে আমি ভীষণ লজ্জাবোধ করছি। কোনো দেশের নীতি-আদর্শ যদি আমার জন্য, আমার ধর্মের মানুষের জন্য ক্ষতিকর মনে হয়- আমি প্রতিবাদ জানাতে পারি। কিন্তু স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে অতিথি হিসাবে আসা মেহমানকে যদি মেজবান অপমানিত করে, একে আমি ইসলামবিরোধী কাজই মনে করব। বাঙালি ঐতিহ্য ও ইসলামি আদর্শ একজন অতিথি, বিশেষ করে রাষ্ট্রীয় অতিথিকে সম্মানের সঙ্গে বরণ করা কর্তব্য বিবেচনা করে।
সেই জায়গায় দলবেঁধে অতিথির বিরুদ্ধে স্লোগান দেওয়ার মতো নিুমানের আচরণ যারা করে, তাদের ইসলাম রক্ষাকারী বলে মানা যায় না। রাস্তা বন্ধ করে হাজার হাজার সাধারণ মানুষের কষ্টের কারণ হচ্ছে এরা। নিজেরা নিরাপদে থেকে অপকর্ম করিয়ে অন্ধ অনুসারীদের পুলিশি হয়রানির মুখে ফেলে দিয়েছে। জেল-জরিমানার মুখোমুখি করে দিয়েছে। এ ধারার তৎপরতার কোনোটাই কি ইসলাম সমর্থন করে? এ প্রশ্ন আমি জ্ঞানপাপী সুবিধালোভী লেবাসি ধর্মীয় নেতাদের কাছে রাখছি না, প্রশ্নটি রাখছি অন্ধ অনুসারীদের সামনে, যারা গুরুদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাভের ছিটেফোঁটা ভাগ পাবে না; অথচ ধর্মের বিচারে পাপী হবে এবং দেশের আইনের বিচারে অপরাধী হবে।
বিশ্বসভ্যতার নানা ধাপে দেখা গেছে, ধর্মনেতারা যখন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার লোভে পড়ে যায়, তখন তাদের চেয়ে ভয়ংকর আর কেউ হয় না। মধ্যযুগের ইউরোপে রোমান পোপের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা কমিয়ে দিলে ক্ষুব্ধ হয়ে যান এ ধর্মীয় নেতারা। জেরুজালেমে মুসলমানদের অধিকারের ইস্যু নিয়ে ফ্রান্সে জ্বালাময়ী বক্তৃতা করে ক্রুসেড বাধিয়ে দেন পোপ দ্বিতীয় আরবান।
আপাতদৃষ্টিতে ধর্মযুদ্ধ হলেও এর অন্তরালে ছিল ধর্মযুদ্ধের নেতৃত্ব নিয়ে পোপদের রাজনৈতিক ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টা। নিজেদের লোভকে কার্যকর করার জন্য অসংখ্য মানুষ হত্যা ও সম্পদ ধ্বংসের কারণ হলো পোপতন্ত্র। এভাবে ধর্মীয় মৌলবাদীরা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতার মোহে যুগ যুগ ধরে সরল মানুষদের ধর্মান্ধ জঙ্গি বানাতে চেষ্টা করেছে।
এ সরল মানুষদের মুক্তবুদ্ধি আর চেতনার সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে। অন্ধ বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে মানবতা ও সভ্যতার বক্ষ বিদীর্ণ করতে। ব্যক্তিগত লাভের ফসল ঘরে তুলতে নিজ ধর্মকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করেছে। খ্রিষ্টান, হিন্দু, ইসলাম সব ধর্মের নামাবরণে এ ধারার ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অশুভ অবস্থান দেখা গেছে- যাচ্ছেও। বিশ্বজুড়ে এ সময়ে ইসলামের নাম ভাঙানো জঙ্গিবাদ শান্তিবাদী মানবিক ধর্ম ইসলামকে ভুলভাবে বিশ্ববাসীর কাছে উপস্থাপন করছে।
জঙ্গিদের অপকর্মের লক্ষ্য অভিন্ন থাকে। তাই আইএসের জঙ্গিদের উন্মত্ততায় প্রাচীন এশেরীয় সভ্যতার প্রত্ননিদর্শন ধ্বংস আর বাংলাদেশে মুক্তচিন্তার লেখকদের হত্যা করা ও ভাস্কর্য ধ্বংসের মধ্যে কোনো ফারাক পাওয়া যায়নি। দুই ক্ষেত্রেই অপব্যাখ্যা দিয়ে পবিত্র ইসলাম ধর্মকে কালিমালিপ্ত করা হয়েছে আর মানবতাকে করা হয়েছে অপমানিত। পবিত্র বোখারি শরিফে ‘কিতাবুল ইলম’ পর্বে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কিয়ামতের আলামতগুলোর একটি হলো জ্ঞান তুলে নেওয়া হবে এবং মূর্খতা জেঁকে বসবে।
আমরা কি এখন এ আলামতই দেখছি? যেখানে ইসলামে জ্ঞানচর্চার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, সেখানে ইসলাম রক্ষাকারীর তকমা এঁটে অকাট্য মূর্খরা সংস্কৃতি লালন করার বদলে যেভাবে সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে বদ্ধ উন্মাদের মতো ধ্বংস করছে আর বিশ্ববাসীর কাছে প্রগতিবাদী ধর্ম ইসলামকে সংকীর্ণভাবে উপস্থাপন করছে তা দেখে শঙ্কিত হতে হয়। জঙ্গিবাদীদের আচরণের সঙ্গে এসব ইসলাম রক্ষাকারীদের আচরণের তফাত খুবই কম।
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর আগমন সামনে রেখে ক’দিন ধরে দেশের কয়েকটি স্থানে উন্মত্ত আচরণ করছেন হেফাজতের উচ্ছৃঙ্খল কর্মীরা। এ ধারার উন্মত্ততায় শান্তির ধর্ম ইসলামের সায় খুঁজে পাচ্ছি না। আর এসব উন্মত্ততার জেরে বেশ ক’জন নিহতও হয়েছেন। আহত হয়েছেন অনেকে। কামনা করি আহতরা দ্রুত সুস্থতা ফিরে পাবেন। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করি।
অরাজকতা তৈরির জন্য এভাবে সরল অনুসারীদের পথে নামানো এবং মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার দায় কি তাদের নেতারা এড়াতে পারেন? পাশাপাশি পুলিশের বাড়াবাড়ি থাকলেও তা তদন্তের দাবি আমরা করব। আমাদের দেশে ক্ষমতাপ্রত্যাশী রাজনৈতিক দলগুলো নিজেদের প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে বিধ্বংসী কর্মসূচি দিয়ে থাকে। কিন্তু ইসলামকে রক্ষা ও ইসলামী আদর্শকে সমুন্নত রাখার ঘোষণা যে গোষ্ঠী দেয়, তাদের প্রতিবাদের ভাষা তো বিধ্বংসী হতে পারে না।
এসব ধর্মীয় নেতা লাঠিসোটা হাতে তালেবে এলেমদের পথে নামাতে পারে কি? ‘অরাজনৈতিক’ ইসলামি দল হরতালের কর্মসূচি দেয় কীভাবে? এরা রেলস্টেশন জ্বালিয়ে দেওয়াসহ সরকারি সম্পদ ধ্বংস করছে, সাধারণ ট্রেন যাত্রীদের ওপর হামলা করছে, ক্ষতি সাধন করছে ট্রেনের। এভাবে মানুষের জীবন বিপন্ন করছে ইসলামের কোন্ বিধান মতে? ভেতরের সত্যটি তখনই স্পষ্ট হয় যখন এ হরতালকে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতে ইসলামী সমর্থন দেয় আর এদেরই পৃষ্ঠপোষক বিএনপি সমর্থন জানায়।
ধর্মের নামে এসব অরাজকতা দেখে প্রশ্ন জাগে, এ দেশে কি ইসলাম সত্যিই বিপন্ন? না হলে ইসলামকে রক্ষা করতে একটি গোষ্ঠীর মাঠে নামতে হবে কেন! বরং দেখা যাচ্ছে ইসলাম চর্চা এখন বেশি হচ্ছে এ দেশে। মাদ্রাসার সংখ্যা এ দেশে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। নারীদের হিজাব-বোরকা পরার সংখ্যা এক যুগ আগের চেয়ে অনেক বেশি এখন। কেবল গ্রামগঞ্জে, পাড়া-মহল্লায় নয়, ডিজিটাল পদ্ধতিতে ওয়াজের সংখ্যাও বেড়েছে ব্যাপকভাবে।
এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশের মতো মুসলিম অধ্যুষিত দেশে ইসলাম ধর্ম ও মুসলিম সমাজ হেফাজতের দরকার পড়ছে কেন! ইসলাম ধর্ম ফ্যাসাদ সৃষ্টি না করার পক্ষে আহ্বান জানালেও নানা অছিলায় নানা ইস্যুতে স্বঘোষিত ইসলাম রক্ষাকারীরা ফ্যাসাদ তৈরি করেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক সুবিধা লাভের জন্য এক সময় সরকারও এদের ঘাড়ে তুলেছিল। এখন সিনবাদের বুড়োর মতো ঘাড় থেকে আর নামছে না।
আমি এদের নেতাদের অনুরোধ করব, রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক লাভালাভের লালসা থেকে বেরিয়ে এসে আপনাদের মাদ্রাসা-শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য বড় ক্ষতিকর ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন। দুর্নীতিমুক্তিতে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করুন। আপনাদের ওয়াজে মানুষকে সততার পথে চলার জন্য হেদায়েত করুন।
এ দেশের সব ধর্মের মানুষ যাতে নিরাপদে নিরুদ্বেগে জীবনযাপন করতে পারে এ ব্যাপারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখুন। সাধারণ মুসলমানের মনে ইসলাম এমনিতেই সুরক্ষিত আছে। আপনাদের হেফাজতের অর্থ যাতে হয় ইসলামের সৌন্দর্য ও মানবিকতার আদর্শ ছড়িয়ে দেওয়া- এ দেশে ইসলাম প্রচারে সফল সুফিরা যেভাবে ইসলামকে একটি মানবতাবাদী কল্যাণকর ধর্ম হিসাবে উপস্থাপন করতে পেরেছিলেন। এ পথে আপনারা হাঁটতে পারলে মানুষ আপনাদের স্বাগত জানাবে।
ড. একেএম শাহনাওয়াজ : অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
shahnawaz7b@gmail.com