
প্রিন্ট: ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ০২:৫৮ পিএম
বাগদাদিবিহীন বিশ্ব তুলনামূলক ভালো

ফয়সাল জে. আব্বাস
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
আপনি স্থান পরিবর্তন করতে পারেন, আপনি লুকিয়ে থাকতে পারেন- কিন্তু আপনি স্থায়ীভাবে ন্যায়বিচার থেকে পালিয়ে চলতে পারেন না। আইএসের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান আবু বকর আল-বাগদাদির হত্যার ঘটনা থেকে এ বার্তাটি বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ওইসব সন্ত্রাসীর কাছে পাঠানো উচিত, যারা সম্ভবত (কিছু সময়ের জন্য হলেও) ভাবছে যে, তাদের অপরাধ বিনা শাস্তিতেই পার পেয়ে যাবে।
যারা বাগদাদির ইবলিসি ও উগ্রপন্থী আদর্শের অনুসারী, তাদের কাছে ছাড়া সম্ভবত আর সবার কাছেই এই হত্যার খবরকে এ বছরের সবচেয়ে স্বাগত জানানো ও উদযাপনের মনে হবে। আর যারা এমন ভাবনায় দ্বিধান্বিত যে, মুসলিম বিশ্ব সম্ভবত এর বিপরীত; তাদের জন্য জবাব হচ্ছে- ‘কোনোভাবেই নয়’।
বাস্তবতা হচ্ছে, ইসলামের সঙ্গে আইএসের কোনো সম্পর্ক নেই এবং তারা ইসলাম থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন। আইএস ও ইসলাম এমন দুটি বিশ্বাস, যা একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত। যখন বাগদাদি ও তার হিংস্র অপরাধী অনুসারীরা ইসলামের নামকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করেছে, তখন তারা সেটি করেছে মিথ্যাচারের মাধ্যমে।
আর এটি করার মাধ্যমে তারা ইসলামের সুনাম ও এর শান্তিপূর্ণ অনুসারীদের নিষ্প্রভ করেছে এবং আমাদের বিশ্বাসকে এমন ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, যা গত কয়েক বছরে অন্য কেউ করতে পারেনি।
খাঁচায় বন্দি করে জর্ডানের পাইলট মুয়াথ আল-কাসাবকে জীবন্ত পুড়িয়ে ফেলা, মানবিক সহায়তাকারী কর্মীদের লোমহর্ষক শিরশ্ছেদ, ইয়াজিদি নারীদের যৌন দাসি বানানো- যার মর্মান্তিক ও যন্ত্রণাদায়ক বর্ণনা নথিভুক্ত করেছেন ইয়াজিদিদেরই একজন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী নাদিয়া মুরাদ, সহিংসভাবে মানুষকে তাদের ঘর থেকে বের করে দেয়া, আমাদের খ্রিস্টান ভাইবোনদের তাদের গ্রাম, শহর ও দেশ থেকে বের করে দেয়া- এসব মানুষ যারা আইএস ও এর পাপী নেতার হাতে দুর্ভোগের শিকার হয়েছেন, তারা এখন তার মৃত্যুর খবরে স্বস্তি পেতে পারেন।
হ্যাঁ, আল-বাগদাদির মৃত্যুতে বিশ্ব এখন আগের চেয়ে ভালো। তবে এ পর্যায়ে এসে আমাদের একটি বিরতি নেয়া দরকার। একইসঙ্গে নিজেদের স্মরণ করানো দরকার যে, চরমপন্থী আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই এখনও শেষ হয়ে যায়নি।
ওসামা বিন লাদেনের পরিসমাপ্তির পর আমরা দেখলাম, দ্রুতই তার স্থলাভিষিক্তি হয়েছেন বাগদাদি নিজে। সুতরাং আমাদের উচিত হবে না নিজেদের প্রতারিত করা, আমাদের উচিত হবে না আত্মতুষ্টিতে ভোগা এবং আমাদের উচিত হবে না আমাদের নজরদারি বাদ দেয়া।
কারণ ‘সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ কেবল তখনই চূড়ান্ত জয়লাভ করতে পারে, যখন আমরা ওই জলাভূমি নিষ্কাশন করে ফেলতে পারব, যেখানে এমন দৈত্যরা বেড়ে উঠতে পারে।
সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সবচেয়ে সেরা পদ্ধতি (সামরিক পদ্ধতির বাইরে) হল আদর্শিক ফ্রন্টে তার বিরুদ্ধে লড়াই করা। এ কারণেই সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোতে এমন কতগুলো কেন্দ্র তৈরি করার মাধ্যমে সে ধরনের প্রচেষ্টা নেয়া হচ্ছে, যে কেন্দ্রগুলো অনলাইনে ও বাস্তব ক্ষেত্রে চরমপন্থী আদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উৎসর্গিত থাকবে। এসব প্রচেষ্টাই হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ।
সৌদি আরব কর্তৃক ইসলামিক মিলিটারি কাউন্টার টেররিজম কোয়ালিশন গঠন হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, এটি ‘ইতিদাল’ হিসেবে পরিচিত রিয়াদে গ্লোবাল সেন্টার ফর কমব্যাটিং এক্সট্রিমিস্ট আইডিওলজির সংস্থা স্থাপনের মতোই গুরুত্বপূর্ণ। এ দুটি সংস্থাই সন্ত্রাসবাদবিরোধী যোদ্ধাদের তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি ঘটিয়েছে।
তবে আইএস মানসিকতার সেরা প্রতিষেধক এবং চরমপন্থী আদর্শের প্রতি সবচেয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর প্রত্যাঘাত হচ্ছে সামাজিক সংস্কার, যা সৌদি আরবে শুরু হয়েছে। তারা হাতে-কলমে দেখিয়েছে, আমরা জীবনে বিশ্বাস করি, আমরা সহাবস্থানে বিশ্বাস করি, আমরা সহিষ্ণুতায় বিশ্বাস করি।
এ কারণেই সৌদি আরবের সীমান্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ অমুসলিম ৪৯টি দেশের নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হচ্ছে, যাতে করে তারা দেশটিতে যেতে পারবে, ভিসাপ্রাপ্তির সাবেকি কষ্টকর প্রক্রিয়া ছাড়াই। বাস্তবতা হল, নারীরা গাড়ি চালাতে পারে, নারীরা পুরুষের পাশাপাশি কাজ করতে পারে, আমরা নারীদের পুরুষ অভিভাবকের অভিভাবকত্বে রাখার সেকেলে পদক্ষেপ আর আরোপ করি না- এসব বিষয়ের সংস্কার হচ্ছে সন্ত্রাসের সমর্থকদের প্রপাগান্ডামূলক আদর্শের সবচেয়ে মোক্ষম জবাব।
সর্বোপরি, এটিও গুরুত্বপূর্ণ যে, এসব সংস্কার বাস্তবায়িত হচ্ছে পবিত্র দুই মসজিদের ভূমিতে, ইসলামের কেন্দ্রে। সৌদি আরব যখন কেবল হাঁচি দেয়, তখন গোটা মুসলিম বিশ্ব সর্দিতে আক্রান্ত হয়। যখন এসব আলোকিত সংস্কার কার্যকর হবে সৌদি আরবে, তখন নিশ্চিতভাবে বিস্তৃত মুসলিম বিশ্বে আধুনিকতার ধারা অনুসৃত হবে। এভাবেই আপনি চরমপন্থীদের বেড়ে ওঠার জলাশয়ের পানি নিষ্কাশন করতে পারেন।
এখন আমাদের উচিত সন্ত্রাসীদের ওপর চাপ প্রয়োগের বিষয়টি অব্যাহত রাখা- তারা যেখানেই থাকুক এবং যে পাথরের নিচেই লুকিয়ে থাকুক। যদিও আমি বিশ্বাস করি, গোটা বিশ্বের, বিশেষত মুসলিম বিশ্বের উচিত আপাতত বিপর্যয়কর খেলাফতের সমাপ্তি উদযাপন করা।
আরব নিউজ থেকে অনুবাদ : সাইফুল ইসলাম
ফয়সাল জে. আব্বাস : আরব নিউজের এডিটর ইন চিফ