ইতিহাসের শিক্ষাই হোক রাজনীতির পাথেয়

ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী
প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

প্রচলিত ধারণা হচ্ছে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা নেয় না। ফলে রাষ্ট্রে অহংকার-দাম্ভিকতা-স্বেচ্ছাচারিতা সৃষ্টি হয়ে জনদুর্ভোগ বৃদ্ধি পায়। ব্যক্তি-স্বজন-পরিবারপ্রীতির কারণে দুর্নীতি ও অপকর্মের বিস্তার ঘটে। রাষ্ট্রে হত্যা-জেলজুলুম-গুম-খুন পরিণত হয় স্বাভাবিক বিষয়ে।
অপরাধীকে শাস্তির বিপরীতে পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে গর্হিত কর্মকে আড়াল করার পন্থা অবলম্বন করা হয় নির্লজ্জভাবে এবং অপরাধীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। কোনো ধরনের রাখঢাক না রেখে প্রকাশ্যেই ঋণখেলাপি-অর্থ পাচারকারী-আপাদমস্তক দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের প্রতি সহযোগিতার অদৃশ্য হাত বিস্তৃত থাকে।
রাজনীতির মোড়কে দলীয়-উপদলীয় সংগঠনের মাধ্যমে চাঁদাবাজি, দখলদারি, লুটতরাজসহ বিভিন্ন অপকর্ম করা হয়। সাধারণ মানুষকে নিঃস্ব করে দিয়ে নিজেদের সম্পদ বাড়ানোর মাধ্যমে সমাজকে করা হয় পর্যুদস্ত। ক্ষমতাবান বা প্রভাবশালীরা এসব অবাঞ্ছিত কর্মকে গুরুত্ব দিয়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তারে ব্যতিব্যস্ত থাকে।
গণবিরোধী সিদ্ধান্ত নিয়ে জনজীবনকে তারা দুর্বিষহ করে তোলে। রাজনীতির আড়ালে ভয়াবহ সব অপরাধ ঘটিয়ে তারা বিরোধী শক্তিকে দমন-পীড়ন-নির্যাতনের নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত স্থাপন করে। কখনো উপলব্ধি করে না যে, ইতিহাসের কালো অধ্যায়ে তারা নিজেদের যুক্ত করছে। কালক্রমে তারা ফ্যাসিবাদী ও কর্তৃত্ববাদীর রূপ পরিগ্রহ করে।
এটি সর্বজনবিদিত যে, ‘ফ্যাসিজম’ হচ্ছে একটি ঘৃণ্য রাজনৈতিক মতাদর্শ। ১৯১৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছিল এর সদর্প উপস্থিতি। ‘ফ্যাসিজম’ বা ‘ফ্যাসিবাদী’ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ইউরোপে উগ্র-ডানপন্থি জাতীয়তাবাদের আবির্ভাব ঘটে। এ মতাদর্শে বিরোধীপক্ষের কোনো স্থান ছিল না। কর্তৃত্বময় শাসন ক্ষমতাই ছিল ফ্যাসিবাদের মূলমন্ত্র। ফ্যাসিবাদ রাষ্ট্রকেই সবসময় সর্বাধিক গুরুত্ব দিত। তাতে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য হতো উপেক্ষিত।
এর মাধ্যমে তারা ব্যক্তি স্বাধীনতাকে হরণ করত এবং ক্ষমতাকে একটি কেন্দ্রে আবদ্ধ রাখত। তাদের চাওয়া ছিল রাষ্ট্রক্ষমতায় একচ্ছত্র আধিপত্য নিয়ন্ত্রণ। রাজনৈতিক ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চার্চ, আদালত, বিশ্ববিদ্যালয়, সামাজিক ক্লাব, খেলাধুলাসহ রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান-সংস্থায় কর্তৃত্ব স্থাপন। ফ্যাসিস্ট দলগুলো ছিল সবসময় এক ব্যক্তির সর্বময় কর্তৃত্ব ও শাসনে বিশ্বাসী। তারা মনে করত, রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং রাষ্ট্রের প্রধান হবেন একই ব্যক্তি, যার হাতে থাকবে সব ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ ধারণার উৎপত্তি হয়। কালক্রমে এটি জার্মানিসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। জার্মানিতে হিটলারের নেতৃত্বে ‘নাৎসিজম’ বা নাৎসিবাদের উত্থান ছিল ফ্যাসিবাদের একটি রূপ। ফ্যাসিবাদের মধ্য দিয়ে ইউরোপে হিটলার ও মুসোলিনির মতো বিতর্কিত নেতার উদ্ভব হয়। তারা যেটাতে বিশ্বাসী ছিলেন, সবাইকে সেটাই মানতে বাধ্য করেছিলেন। তারা তাদের সমালোচনার জবাব দিতেন শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে। দেশে যে কোনো ধরনের সমস্যার জন্য তারা অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে দিতেন।
অনেক ইতিহাসবিদের ধারণা, ফ্যাসিজমের কোনো সর্বজনীন সংজ্ঞা নেই। তাদের মতে, ফ্যাসিস্টরা মার্কসবাদীদের বিরোধী ছিল। শুধু বিরোধিতা নয়, মার্কসবাদীদের রীতিমতো ঘৃণা করত ফ্যাসিস্টরা। আবার অনেক পর্যবেক্ষকের মতে, ফ্যাসিবাদ এবং সোভিয়েত কমিউনিজমের মধ্যে অনেক সাদৃশ্য ছিল। ফ্যাসিস্টরা ছিল সংসদীয় গণতন্ত্রের বিরোধী।
যদিও ক্ষমতায় আসার আগে হিটলার ও মুসোলিনি দুজনেই নির্বাচনের রাজনীতিতে জড়িত হতে আগ্রহী ছিলেন। মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী লরেন্স ব্রিট ফ্যাসিবাদের ১৪টি বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করেছেন। তন্মধ্যে জাতীয়তাবাদের ক্রমাগত প্রচার, মানবাধিকার হরণ, সেনাবাহিনীকে সুবিধা দেওয়া, গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ, করপোরেট স্বার্থ ও প্রতারণার নির্বাচন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ফ্যাসিস্ট দলগুলোর আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল জনসমাবেশ করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করা।
বেশ কিছুকাল ধরে দেশের রাজনীতিতে আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধির অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছিল। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা, সৌহার্দ্য, সম্প্রীতির বিপরীতে সহিংসতা, ষড়যন্ত্র ও অসহিষ্ণু আচরণের কারণে রাজনীতির প্রতি জনগণের চরম অনীহা তৈরি হয়। এটিও সত্য, মানুষের মর্যাদা সুদৃঢ় করার জন্য প্রয়োজনীয় নাগরিক স্বাধীনতা অপরিহার্য।
রাষ্ট্রের সব জনগণের সামগ্রিক সুযোগ-সুবিধা অবারিত ভোগ করার মধ্যেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রকাশ। আধুনিক সভ্যতার ক্রমবিকাশের ধারায় মুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থায় জনগণের অধিকার প্রয়োগ অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গতিশীল করে। সমাজের সার্বিক উন্নয়নের জন্য মুক্তচিন্তার অবাধ প্রকাশ এবং সাংস্কৃতিক বিবেকের জাগরণ একান্ত প্রয়োজন। বলা হয়ে থাকে, এক্ষেত্রে একুশ শতক হলো সবচেয়ে সৃষ্টিশীল শতাব্দী, যা বিশ্বের প্রায় সব মানুষকে স্বাধীনতার মন্ত্রে স্পন্দিত এবং তা অর্জনে প্রচণ্ড শক্তি জুগিয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক মনীষী অ্যারিস্টটল বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে শুধু জীবনের প্রয়োজনে নয়, বরং উত্তম জীবন সচল করার প্রয়োজনেই রাষ্ট্রের উৎপত্তির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ব্যক্তিকে সর্বোৎকৃষ্ট জীবনের দিকে পরিচালিত করার লক্ষ্যে মানুষ সব ধরনের সামাজিক সম্পর্ক এবং শক্তির বন্ধনে জাগতিক ও সামষ্টিক মূল্যায়নে রাষ্ট্র গঠন নিশ্চিত করেছে। এজন্যই রাষ্ট্র মানুষের পরিপূর্ণ জীবনপ্রবাহের গতিময়তায় একটি অনিবার্য প্রতিষ্ঠানরূপে প্রতিভাত। মানবসত্তার পূর্ণাঙ্গ বিকাশ বা পরিবার-সমাজের পূর্ণাঙ্গ স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মঙ্গলের স্বার্থে রাষ্ট্রব্যবস্থার অবদান সর্বজনস্বীকৃত।
খ্যাতিমান সমাজবিজ্ঞানী লুসিয়ান-পাই রাজনৈতিক সংস্কৃতির ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো জাতিরাষ্ট্রে জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস ও আদর্শিক মনোভাবের সমষ্টিগত প্রক্রিয়ায় শৃঙ্খলাবদ্ধ আচরণের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, বিধিবিধান ও নীতি-নৈতিকতার সমাহার রাজনীতির মৌলিক ভিত্তি তৈরি করে। মূলত রাজনৈতিক সংস্কৃতির মূল উপাদান হচ্ছে কোনো দেশে বিরাজমান রাজনৈতিক পরিবেশ-পরিস্থিতির প্রতি নাগরিকদের সনাতন মূল্যবোধ, অনুভূতি ও আস্থার সামগ্রিক প্রতিচ্ছবি।
মার্কিন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী গ্যাব্রিয়েল অ্যালমন্ড সর্বপ্রথম রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রত্যয়টি ব্যবহার করেন। তার মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতি হলো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সদস্যদের রাজনীতি সম্পর্কে মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গির রূপ ও প্রতিকৃতি। কোনো একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতি-প্রকৃতির প্রবহমানতায় সেদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি উদ্ভাসিত হয়। রাজনীতি নিয়ে সমাজের চিন্তাচেতনা, ধ্যানধারণা, রাজনৈতিক মূল্যবোধ, বিশ্বাস, মতাদর্শ, জ্ঞানগত কার্যকলাপ, আগ্রহের পরিমাপ, মূল্যায়নমূলক অভিযোজনে নির্ধারিত হয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির সাবলীল উত্তরণ।
জনগণ সম্যক অবগত আছেন, রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি পারস্পরিক পরিপূরক। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি হচ্ছে সমাজে বসবাসরত ব্যক্তিদের উন্নয়ন ও সমষ্টিগত মূল্যবোধের সৃষ্টিসোপান। ব্যক্তিস্বাধীনতার পাশাপাশি পুরো সমাজ উন্নয়নে পারস্পরিক শ্রদ্ধা-ভালোবাসা-পরমতসহিষ্ণুতা-অপরের বক্তব্যকে অবজ্ঞা না করার প্রবণতা রাজনৈতিক সংস্কৃতির উঁচু মাত্রিকতা নির্দেশ করে।
দল গঠনের প্রণিধানযোগ্য উদ্দেশ্য হচ্ছে, ধর্ম-বর্ণ-দল-মত-অঞ্চল নির্বিশেষে সমগ্র জনগোষ্ঠীর পরিপূর্ণ মঙ্গলার্থে মাটি ও মানুষের প্রতি মমত্ববোধের প্রতিফলন ঘটানো। আদর্শগত ভিন্নতা থাকলেও প্রতিহিংসা-পরশ্রীকাতরতা ত্যাগ করে সংগত-সংযত আচরণবিধির অনুশীলন জনমনজয়ী চরিত্র গঠনে সহায়ক হয়। দেশ ও দেশবাসীর মঙ্গলার্থে ইস্পাতকঠিন ব্রত গ্রহণের মধ্যেই নেতৃত্বের পরিশীলিত ও গ্রহণযোগ্য বিকাশ ঘটে।
সমাজ-ইতিহাস পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, বল প্রয়োগের মাধ্যমে রাষ্ট্রশাসন বরাবরই ব্যর্থ হয়। দমন-পীড়ন-নিপীড়ননির্ভর রাজনৈতিক অপসংস্কৃতি রাজনীতিকে কলুষিত করে। নিকৃষ্ট কর্মযজ্ঞে জড়িত ব্যক্তি, দল ও প্রতিষ্ঠানের যুগে যুগে অভিশপ্ত হওয়ার দৃষ্টান্ত রয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিয়ে উত্থান-পতনের কারণ অনুধাবনে তারা ব্যর্থ। সবারই মনে রাখা উচিত, অর্থ ও ক্ষমতা কোনোটিই চিরস্থায়ী নয়। এসব বিবেচনায় অযাচিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার হীন প্রবণতা অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী : শিক্ষাবিদ; সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়