
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:৪৭ পিএম
অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা এবং দেহে রক্ত জমাট বাঁধার ভীতি

ড. রাশিদুল হক
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ টিকার যথেষ্ট ঘাটতি রয়েছে। এ পর্যন্ত দেশে ৫৮ লাখ ১৯ হাজার ৯০০ জনকে প্রথম ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছে ৩৪ লাখ ৯৬ হাজার ১৮৬ জন। দ্বিতীয় ডোজের টিকা ২৩ লাখ দেওয়ার পরও ঘাটতি থেকে যাবে ১৫ লাখের বেশি। কিন্তু স্বাস্থ্য বিভাগের হাতে আছে আট লাখের কিছু বেশি টিকা (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর)।
এসব টিকা হচ্ছে ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটে তৈরি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং অ্যাস্ট্রাজেনেকার উদ্ভাবিত টিকা কোভিশিল্ড। সম্প্রতি চীন সরকার কর্তৃক বাংলাদেশকে উপহার দেওয়া পাঁচ লাখ ডোজের ‘সাইনোফার্ম টিকা এবং বায়োএনটেকের তৈরি ফাইজারের ১ লাখ ৬২০ ডোজ টিকা দেশে টিকাকরণের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে আশার কথা হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের আবিষ্কৃত টিকা ‘বঙ্গভ্যাক্স বা ব্যাংকোভিড’ বিশ্বের প্রথম এক ডোজের mRNA টিকা, যা করোনাভাইরাস (SARS-CoV-2)-এর বিরুদ্ধে সফলভাবে মানব এবং প্রাণীদেহে সুদৃঢ় সুরক্ষা দেখিয়েছে (Nag K et al., Vaccine, 2021).
বিশ্বব্যাপী ১৭ কোটিরও বেশি মানুষ করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন এবং তার মধ্যে ৩৭ লাখ মানুষ তীব্র শ্বাসকষ্টজনিত সিনড্রোম কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন।
বাংলাদেশে সংক্রমিত হয়েছেন ৮ লাখ ৪ হাজার ২৯৩ জন এবং মারা গেছেন ১২,৬৯৪ জন (২ জুন ২০২১ পর্যন্ত)। বর্তমানে পাঁচটি ভ্যাকসিন কোভিড-১৯-এর বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে মানবদেহে প্রয়োগ করা হচ্ছে, যেমন-ফাইজার-বায়োএনটেক ও মডার্না (যুক্তরাষ্ট্র), অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা (যুক্তরাজ্য), স্পুটনিক-৫ (রাশিয়া) এবং সাইনোফার্ম (চীন)।
এখন প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি আমেরিকা ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অনেক দেশ ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সিদের ফাইজারের টিকা প্রদানের অনুমোদন পেয়েছে। এ যাবৎ বাংলাদেশের জনসংখ্যার তুলনায় খুব সীমিতসংখ্যক ‘কোভিশিল্ড’ টিকা ব্যবহৃত হয়েছে।
কোভিশিন্ড টিকা নেওয়ার পর ভারতে ৩২০ জনের শরীরে রক্ত জমাট বাঁধার (থ্রোম্বোসিস) তথ্য জানা গেছে; এর সঙ্গে তাদের রক্তে প্ল্যাটেলেটের সংখ্যাও কমে গেছে (ইন্ডিয়া টুডে)। যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশেও একই ধরনের রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা নিয়ে বিশ্বজুড়ে এক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছিল। অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ৩০ বছরের নিচের জনগোষ্ঠীকে না দেওয়ার সুপারিশও করেছিল যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ। কিন্তু এ বিষয়ে বিভিন্ন দেশের গবেষণা কী বলছে? ফেব্রুয়ারি থেকে ১১ মার্চ (২০২১) পর্যন্ত ডেনমার্ক এবং নরওয়েতে অক্সফোর্ড-অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ প্রাপ্ত ১৮-৬৫ বছর বয়সি ২,৮২,২৬৪ জন টিকা গ্রহীতার মধ্যে একটি জরিপ চালিয়ে দেখা গেছে, মাত্র ৫৯ জন (০.০২১ শতাংশ) টিকা গ্রহীতার মস্তিষ্কের শিরায় রক্ত জমাট বাঁধার (Cerebral venous sinus thrombosis-CVST) : সেরিব্রাল ভেনাস থ্রোম্বোসিসের সন্ধান মিলেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০২১ সালের অন্য একটি জরিপেও দেখা যায় যে, ৯৬ লাখ ডোজ (৯.৬ মিলিয়ন) জনসন অ্যান্ড জনসন (জে অ্যান্ড জে) টিকা দেওয়ার পর মাত্র ৩০ (০.০০০৩ শতাংশ) জনের মধ্যে থ্রোম্বোসিসজনিত লক্ষণ শনাক্ত হয়েছে (CDC, USA)।
বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীদের মধ্যে বা কোভিশিল্ড টিকা গ্রহীতার মধ্যে রক্তে জমাট বেঁধে কতজন মারা গেছেন, তার কোনো জরিপ আদৌ আছে কিনা আমার অন্তত জানা নেই। বলা বাহুল্য, অ্যাস্ট্রাজেনেকা, স্পুটনিক, সাইনোফার্ম এবং জে অ্যান্ড জে ভ্যাকসিনের প্রতিটি টিকা একই আদলে-অর্থাৎ ডিএনএ-কাঠামোতে তৈরি। টিকা বানানোর পদ্ধতি সে যাই হোক না কেন, টিকাজনিত রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা অত্যন্ত বিরল। যারা অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিনসহ অন্য কোনো টিকা নিতে অনীহা প্রকাশ করছেন, তাদের জানা প্রয়োজন-কোভিড-১৯ টিকা গ্রহীতার তুলনায় কোভিড-১৯ রোগীদের রক্তে জমাট বাঁধার হার অনেকাংশে বেশি।
টিকাজনিত রক্তে জমাট বাঁধার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা এখন অনেকটা পরিষ্কার। অ্যাস্ট্রাজেনেকা কোভিড-১৯ টিকা (ChAdOx1-nCoV-19 টিকা) নেওয়ার পর কিছু মানুষের রক্তে মারাত্মক জমাট বাঁধার কারণে ‘থ্রোম্বোসিস’-এর সঙ্গে ‘থ্রোম্বোসাইটোপনিয়া (Thrombocytopenia : প্ল্যাটেলেটের সংখ্যা কমে যাওয়া)’ যুক্ত হয়ে একটি সিনড্রোমের সৃষ্টি করে। এ ক্লটগুলো বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের শিরাগুলোয় দেখা যায়, ফলে ‘সেরিব্রাল ভেনাস সাইনাস থ্রোম্বোসিস’ বা CVST নামে একটি অবস্থার সৃষ্টি হয়।
এ কারণে মৃত্যুঝুঁকিও অনেক বেড়ে যায়। আমরা জানি, অ্যাস্ট্রাজেনেকা ভ্যাকসিন ‘অ্যাডেনোভাইরাস’ ডিএনএনির্ভর; ঠিক যেমনটি স্পুটনিক ৫ (রুশ), সাইনোফার্ম (চীন) বা জে অ্যান্ড জে (মার্কিন) টিকা। বাহক (Vector) হিসাবে শিম্পাঞ্জির অ্যাডেনোভাইরাস ডিএনএ করোনাভাইরাসের স্পাইক প্রোটিনের সংকেতকে যুক্ত করে মানবদেহের কোষগুলোয় প্রবেশ করানো হয়। অপরদিকে ফাইজার, মডার্না বা বাংলাদেশে তৈরি ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকা হচ্ছে সজঘঅ নির্ভর। এ ক্ষেত্রে বাহক হিসাবে ডিএনএ ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। অ্যাস্ট্রাজেনেকা টিকার ডিএনএ এবং রক্তে নিঃসৃত ‘প্ল্যাটেলেট প্রোটিন ফ্যাক্টর ৪ (PF4)’ একত্রে হওয়ায় মানবদেহের প্রতিরোধ ব্যবস্থা সম্ভবত এ কমপ্লেক্সকে বহিরাগত বস্তু বা এলার্জেন ভেবে তার বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরি করে, যা রক্তে জমাট বাঁধার প্রক্রিয়াটিকে সক্রিয় করে তোলে (Scully M et al. N Engl J Med, 2021)। রক্তে জমাট বাঁধার পদ্ধতি সে যাই হোক না কেন-ডিএনএ কিংবা আরএনএভিত্তিক টিকাজনিত রক্ত জমাট বাঁধার ঘটনা অত্যন্ত বিরল।
রক্ত জমাট বাঁধা বা রক্ত তঞ্চন (Blood Clotting) শারীরবৃত্তীয় একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যাতে রক্ত জমাট বেঁধে তঞ্চন-পিণ্ড বা থ্রোম্বাস (Thrombus: জমাট-রক্ত) তৈরি করে। দেহের কোনো জায়গা জখম হলে সেখান থেকে রক্তক্ষরণ হয় এবং সে জায়গায় তঞ্চন বা জমাট বাঁধার একটি অনুকূল অবস্থা সৃষ্টি হয়। রক্তের তঞ্চন প্রক্রিয়া বেশ জটিল।
কোয়াগুলেশন ক্যাসকেডে (Coagulation cascade) অনেকগুলো এনজাইম/উৎসেচক (যেমন থ্রম্বিন : Thrombin) ও ১২টি (Factor l-V and Factor VII to XIII) কো-ফ্যাকটর প্রোটিনের স্তরীভূত শৃঙ্খল বিক্রিয়ার মাধ্যমে অণুচক্রিকা (Platelet) ও অন্যান্য রক্তকণিকার সহযোগিতায় যকৃত থেকে উৎপাদিত ফাইব্রিনোজেন থেকে ফাইব্রিন (Fibrin) প্রোটিন-পরে ফাইব্রিন পলিমার-এ রূপান্তরিত হয়ে কিছু জমাট তঞ্চন পিণ্ড/থ্রোম্বাস তৈরি করে এবং ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ বন্ধ করে।
এটি হচ্ছে রক্ত জমাট বাঁধার বা কোয়াগুলেশন ক্যাসকেডের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
এ ছাড়া ক্যালসিয়াম এবং ফোসফোলিপিড তঞ্চন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত। রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় অণুচক্রিকা একটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। রক্তে অণুচক্রিকার পরিমাণ কমে গেলে (থ্রোম্বোসাইটোপনিয়া) রক্ত জমাট বাঁধে না। ফলে তঞ্চনের অভাবে ক্ষতস্থান থেকে রক্তক্ষরণ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে পারে। আবার রক্তবাহী শিরা বা ধমনির মধ্যে অত্যধিক তঞ্চন বা ক্লট স্বাভাবিক রক্ত প্রবাহকে বন্ধ করে দিতে পারে; ফলে ইস্কিমিয়া (বিশেষ করে হৃৎপিণ্ডের পেশিতে রক্তাভাবজনিত আঘাত) বা ইনফার্কশান যেমন-হৃৎযন্ত্রের পক্ষে হার্ট অ্যাটাক বা মস্তিষ্কের ক্ষেত্রে থ্রোম্বোটিক স্ট্রোক রক্ত প্রবাহে বাধাগ্রস্ততার কারণে মৃত্যুর আশঙ্কা বেড়ে যায়। তাছাড়া ভাইরাস সংক্রমণের ফলে জমাট প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত প্রোটিনগুলোর গুণগত পরিবর্তন হতে পারে। যেমন-সংক্রমিত মশার কামড়ের মাধ্যমে ডেঙ্গি/ডেঙ্গু ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণের ফলে ফ্যাক্টর II, V, VII, VIII, IX, X এবং XII প্রোটিনগুলোর গুণগত ক্রিয়াকলাপ হ্রাস করতে পারে। ফলে সবচেয়ে গুরুতর আকারে রক্তক্ষরণ হয়, যা ডেঙ্গি রক্তক্ষরণীয় হেমোরজিক জ্বরের লক্ষণ (Lee M, J. Korean Med. Sci. 1987)।
কোভিড-১৯ সম্পর্কিত একটি প্রধান সিনড্রোম হলো, রক্ত জমাট বাঁধা, যা করোনাভাইরাস (SARS-CoV-2) সংক্রমিত রোগীদের মধ্যে ২০-৩০ শতাংশ (Poissy J, Circulation, 2020; Wilyard C, Nature, 2020) রোগীর মৃত্যুর কারণ। গুরুতর আক্রান্ত রোগীদের প্রতিরোধ ব্যবস্থাটি অতিরিক্ত সক্রিয় হওয়ার ফলে ফুসফুস ছাড়াও একাধিক অঙ্গকে প্রভাবিত করতে পারে। সারস-কোভ-২ সংক্রমণ ইমিউনোথ্রোম্বোসিস নামে পরিচিত একটি প্রক্রিয়াকে প্ররোচিত করে, যার কারণে নিউট্রোফিল এবং মনোসাইট ইমিউন কোষগুলো প্ল্যাটেলেটের সংস্পর্শে এসে রক্তনালিতে জমাট বাঁধা প্রক্রিয়াটি শুরু করে। কোভিড-১৯ রোগীদের ফাইব্রিনোজেন, ফাইব্রিন ও ফাইব্রিন থেকে ভেঙে যাওয়া অবক্ষয়িত ছোট-ছোট প্রোটিন (D-dimer) খণ্ডের মাত্রা রক্তে প্রায় চার গুণ বেড়ে গিয়ে (Velayan P, Int J Infect Dis, 2020) রোগীদের মৃত্যুঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কোভিড-১৯ সম্পর্কিত রক্ত জমাট বাঁধার বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যাখ্যা এখনো পুরোপুরি বোঝা যায়নি। তবে রক্তনালির ভেতরের স্তর অর্থাৎ এন্ডোথেলিয়াম কোষগুলোতে (Endothelial cells) ACE2 রিসেপ্টর প্রোটিন উপস্থিত থাকায় (Varga Z, Lancet 2020) ফুসফুসের কোষগুলোর মতো খুব সহজেই করোনাভাইরাস রক্তনালির এন্ডোথেলিয়াম কোষগুলোতে প্রবেশ করে কোষগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। করোনাভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে তিনটি সিস্টেম অর্থাৎ কমপ্লিমেন্ট (পরিপূরক) সিস্টেম, প্রদাহ (Inflammation) এবং তঞ্চন (বা রক্তে জমাট-বাঁধা) সিস্টেম (Coagulation system) কোভিড-১৯ রোগীদের রক্ত জমাট বাঁধায় (থ্রোম্বোসিস) কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করে। থ্রোম্বোসিস রক্তনালির ভেতর রক্তপিণ্ডের (Thrombus) গঠনকে বোঝায়, যা রক্তসংবহনতন্ত্রের মধ্য দিয়ে রক্ত প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে। থ্রোম্বোসিসের মাত্রা নির্ণয়ের জন্য রক্ত-পরীক্ষায় ডি-ডাইমার-এর ঘনত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।
‘কমপ্লিমেন্ট সিস্টেম’ সহজাত অনাক্রম্যতন্ত্র (Innate immune system) বা রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটি অংশ, যা মূল প্রতিরোধ ব্যবস্থার পাশাপাশি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসাবে জীবাণু ধ্বংসের সক্ষমতা বাড়ায়।
পরিপূরক সিস্টেম লিভার দ্বারা সংশ্লেষিত প্রায় ৩০টি প্রোটিন নিয়ে গঠিত। দেহের যে কোনো প্রতিরক্ষাজনিত প্রয়োজনে পরিপূরক প্রোটিনগুলো রক্তনালির মধ্যে আসে এবং তাদের নির্দিষ্ট একটি পদ্ধতিতে অ্যান্টিবডি-মধ্যস্থতা প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং ম্যাক্রোফেজ ও নিউট্রোফিলের মতো ফাগোসাইট কোষগুলোর ক্ষমতাও বৃদ্ধি করে জীবাণু বা প্যাথোজেন নির্মূল করে এবং ক্ষতিগ্রস্ত কোষগুলো দেহ থেকে সরিয়ে ফেলে (Ricklin D et al., Nat Rev Nephrol, 2016)। অনাক্রম্যবিজ্ঞানে রুশ প্রাণীবিজ্ঞানী ইলিয়া মিয়েচুনিকফ-এর অবদান অসামান্য। তিনি ১৯০৮ সালে ম্যাক্রোফেজ এবং ‘সহজাত অনাক্রম্যতা’ আবিষ্কারের জন্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।
ভারতে আবির্ভূত করোনাভাইরাসের একটি ভয়াবহ সংক্রামক ভ্যারিয়েন্ট (B.1.617.2) বাংলাদেশসহ পৃথিবীর ৫০টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ভারতে কোভিড-১৯ রোগীর সাম্প্রতিক অস্বাভাবিক মৃত্যুর কারণ হিসাবে B.1.617.2 ভ্যারিয়েন্টকে দায়ী করা হচ্ছে। তবে আশাপ্রদ খবর হলো, কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত ১ হাজার ৫৪ জন রোগী নিয়ে ব্রিটেনের একটি নতুন গবেষণা প্রমাণ করেছে-দুই ডোজের ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা উভয়ই ভারতীয় ভ্যারিয়েন্ট B.1.617.2-এর বিরুদ্ধে ‘অত্যন্ত কার্যকর’।
ইংল্যান্ডের জনস্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, ফাইজার ও অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকা ভারতীয় ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে যথাক্রমে ৮৮ শতাংশ এবং ৬০ শতাংশ কার্যকর। তবে এক ডোজের উভয় টিকা মাত্র ৩৩ শতাংশ কার্যকর (The Guardian, May 22, 2021)। টিকাকরণ কার্যক্রমে বাংলাদেশে আপাতত অ্যাস্ট্রাজেনেকার কোনো টিকা নেই। থাকলেও তা পরিমাণে অত্যন্ত নগণ্য। বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউট টিকা সরবরাহ না করায় এমন এক বিব্রতকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। এ অনিশ্চয়তার মধ্যে বিদেশের অন্যান্য উৎস থেকে দ্রুততার সঙ্গে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে।
ব্রিটিশ ধরনের (বি-১১৭) চেয়েও অনেক বেশি সংক্রামক করোনার ‘ভারতীয় ধরন’ বাংলাদেশেও শনাক্ত হয়েছে। সীমান্তবর্তী জেলাগুলোয় সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী অবস্থা এখন বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া করোনা রোগীদের ভয়াবহ ব্ল্যাক ফাঙ্গাসে আক্রান্তের ঝুঁকিও অনেক বেড়ে যেতে পারে। জানা গেছে, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি ১৪৬ জন করোনা রোগীর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন ৭৭ জন (প্রথম আলো, রাজশাহী প্রতিনিধি, মে ২২, ২০২১)।
এ ভারতীয় ধরন দেশব্যাপী ভয়াবহ আকারেও ছড়িয়ে পড়তে পারে; সেজন্য জনগণকে অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে এবং সরকারকে ভারত ছাড়াও অন্যান্য উৎস থেকে টিকা আনতে সব রকমের চেষ্টা করতে হবে। এমন কী গুণগতমান বজায় রেখে দেশীয় ‘বঙ্গভ্যাক্স’ টিকাও আমাদের আশার আলো দেখাতে পারে।
এ ব্যাপারে সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন। বাংলাদেশে হার্ড ইমিউনিটি অর্জন ও করোনার অবসান ঘটাতে দেশের অন্তত ৭০ শতাংশ বা ১০-১১ কোটি মানুষকে পূর্ণ ডোজ টিকার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় বাংলাদেশের মানুষ বড় ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়তে পারে।
প্রফেসর ড. রাশিদুল হক : উপ-উপাচার্য, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী; সাবেক প্রফেসর, এমোরি বিশ্ববিদ্যালয় স্কুল অব মেডিসিন, আটলান্টা, যুক্তরাষ্ট্র