Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

নববর্ষের সঙ্গে কথোপকথন

Icon

পবিত্র সরকার

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২১, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নববর্ষের সঙ্গে কথোপকথন

অনেক দিন থেকে বাংলা নববর্ষের মনে এক দারুণ কষ্টবোধ হচ্ছিল যে, তার কোনো তকমা নেই। কত লোকের কত তকমা থাকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রির মতো, পিএইচডি, ডি লিটসে আসল না জাল তা নিয়ে খবরের কাগজে হইচইও হয়।

আমাদের অতি আদরের নববর্ষের সেসব কিছুই ছিল না বলে তার খুব মন খারাপ ছিল। সেই কষ্টটা এতদিনে ঘুচল। তার আগে একটা ‘হিন্দু’ উর্দি (না, হিন্দি-উর্দুর সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক হয়তো নেই। নাকি আছে?) জুটল।

সৈয়দ মুজতবা আলীর একটি গল্পে পড়েছিলাম, এক ধোপা তার গাধা নিয়ে প্যারিসে এসেছে, সে বিশ্ববিখ্যাত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয় দেখে এক পথিককে জিজ্ঞাসা করেছে, ওখানে কী কাজ চলে। পথিক বলেছে, ওখানে ডক্টরেট ডিগ্রি দেওয়া হয়। তখন সে পথিককে বলেছে, বেশ ভালো, আমি নিজের জন্য একটা ডক্টরেট, আর আমার এই গাধাটার জন্যও একটা ডক্টরেট নিয়ে ফিরব, কাজ সেরে ফেরার সময়। আমাদের পশ্চিম বাংলায়ও এখন এ তকমা পাওয়া যাচ্ছে। নববর্ষকে জিজ্ঞাসা করলাম, কেমন হে, তুমি এবার খুশি তো? দ্যাখো, হিন্দু হওয়া ভয়ংকর কঠিন। তুমি হাতে আঙুল মটকালেই অন্য ধর্মে চলে যেতে পার, কিন্তু লাখ লাখ বছর তপস্যা করলেও হিন্দু হওয়া যায় না। আর তুমি ১৪২৭ বছরেই সেখানে বিনা চেষ্টায় ‘হিন্দু’ হয়ে গেলে। তারপর বলতে যাচ্ছিলাম একদিন চিকেন বিরিয়ানি খাইয়ে দাও; কিন্তু নববর্ষের মুখ দেখে কথাটা গিলে ফেলতে হলো। দেখলাম তার মুখ বেশ গম্ভীর। কী ব্যাপার?

নববর্ষ বলল, সব সময়ে ইয়ার্কি ভালো লাগে না। আমার তো গোড়ায় গলদ হয়ে বসে আছে। কিংবদন্তি এই যে, সম্রাট আকবর নাকি আমাকে তৈরি করেছিলেন, মুসলমানদের হিজরি সনের ওপরে নাকি আমাকে খাড়া করেছেন, ৯৬৩ হিজরি অব্দে। তবে হিজরি ছিল চান্দ্র বৎসর, আর আমি হলাম গিয়ে সৌর বৎসরের মতো ৩৬৫ দিনের, তাই আমার আর হিজরির মধ্যে তফাত হয়ে গেল।

এর উলটা মতও আছে, তা হলো খাঁটি হিন্দু রাজা (হয়তো বাঙালি, কিন্তু বাঙালি জাতটা তখন ছিল কি না সন্দেহ) শশাঙ্ক আমাকে শুরু করেন। এখন শশাঙ্কের ব্যাপারে কোনো প্রমাণ নেই, জনশ্রুতিও নেই। নিছক যাকে বাংলায় বলে ‘ব্যাক ক্যালকুলেশন’, তাই করে এটা করা হয়েছে। কাজেই ঠিক হোক, ভুল হোক, যবনসংসর্গ আমি কাটাতে পারি না। আর এর চেয়েও খারাপ কথা, তোমাদের বৈজ্ঞানিক মেঘনাদ সাহা বাংলা কলকাতা রয়াল অ্যাস্ট্রনমিক্যাল সোসাইটির জার্নালে (মে-জুন, ১৯৫৩)

ফারসি জেলালি বর্ষগণনার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বলেছেন, তা নাকি বিলিতি গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের চেয়েও বেশি বৈজ্ঞানিক ছিল। আকবর বাঙালি বামুনদের অনুরোধে সেটি ছেড়ে দিয়ে ব্যাপারটা সম্পূর্ণ ঘেঁটে দিয়েছিলেন। আবার মেঘনাদবাবু একই সঙ্গে এই বাংলা আর উত্তর ভারতের ফসলি সন সম্বন্ধে বলেছেন, যেই করে থাক, ওগুলো ভেজাল আর গোঁজামিল। একে যবনদোষ, তার ওপরে ভেজাল এই অপবাদ! একি ভদ্রসন্তানের সহ্য হয়! তাই ‘হিন্দু’ ডিগ্রি পেয়ে পুরো খুশি হতে পারছি কই!

চিকেন বিরিয়ানি, যা এখন কালীপূজায়, দোলযাত্রায়, নববর্ষে খাঁটি হিন্দু সন্তানরা এবং ভোটে পোলিং এজেন্টরা নিয়মিত খেয়ে থাকে, তার আশা ক্রমেই দিগন্তে বিলীন হতে দেখে আমার মাথায় একটু দুষ্টবুদ্ধি এলো। আমি নববর্ষকে আরও খ্যাপিয়ে দেওয়ার জন্য বললাম, তার ওপর আমরা বলি ১৪২৮ সন। তা ‘সন’ কথাটা তো আরবি, আর ‘সাল’ কথাটা ফারসি। তোমার যবনদোষ কাটানো কঠিন।

নববর্ষ রাগে চিড়বিড় করে উঠল। বলল, আর বলো কেন? তার ওপরও আছে। নববর্ষে বাঙালি হিন্দুরা, বিশেষত দোকানদাররা হালখাতা করে। তারা গঙ্গায় চান করে, নতুন গণেশ মূর্তি বসায়, কালীঘাটে গিয়ে ‘হালখাতা’কে শুদ্ধ করে আনে। আরে ‘হাল’ আর ‘খাতা’ দুটোই তো ফারসি। তাদের কি এবার বলা হবে, খবরদার ‘হালখাতা’ করবে না, ‘নবপত্র’ করো। তারা তো মহামুশকিলে পড়ে যাবে। তারা নিজেদের অপরাধী ভাববে, ‘ইশ্, আমরা গঙ্গা, কালীঘাট, গণেশ সব করি; কিন্তু হালখাতার জন্য, আধ ইঞ্চি কম হিন্দু হয়ে থাকছি। এ রকম ছাঁকা পালিশ করা হিন্দুত্ব পাব কোথায়?

এমন যে রাষ্ট্রের পরম পূজনীয় হিন্দি ভাষা, তাতেই কি এ রকম ছাঁকা হিন্দুত্ব খুঁজে পাওয়া যাবে? যে দেশে মুসলমানরা বৈষ্ণবের গলার কণ্ঠি বানায়, আর ঠাকুরের পেতলের বাসনকোসন সিংহাসন তৈরি করে? তার আগে ওরা ‘খান’, ‘শাহ’, ‘মজুমদার’, ‘সরকার’ ‘তরফদার’, ‘শিকদার’ এসব পদবি ছাড়ে না কেন? সেও তো ফারসি! আর, কী সর্বনাশ, ‘ঠাকুর’ কথাটাও নাকি তুর্কি ‘তিগির’ থেকে এসেছে।

এমনকি ‘ঠাকুর’কেও হিন্দু বলা যাবে না। এর পরে বলবে, হালখাতা বন্ধ। ওসব বাকিতে জিনিস দিতে হবে না। ‘আজ নগদ, কাল ধার’ চালাও। আচ্ছা, ‘নগদ’-এর বদলে কী বলব তখন?

আমি তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য বলে উঠলাম, ওসব নিয়ে ভাবতে হবে না। তুমি ছাঁকা আগমার্কা হিন্দু না হতে পার; কিন্তু তুমি খাঁটি বাঙালি-আমি এরকম বুঝি।

এবার নববর্ষের মুখ খানিকটা উজ্জ্বল দেখাল। সে বলল, ঠিক বলছ? আমি যে বাঙালি, তাতে কোনো সন্দেহ নেই তো?

আমি বললাম, তা কেন থাকবে? পঞ্জিকার লোকেরা যদি বাঙালি হয়, তো তুমিও বাঙালি। বাবা সত্যনারায়ণ যদি বাঙালি হয়, তুমিও বাঙালি।

নববর্ষ বলল, হঠাৎ সত্যনারায়ণের কথা আসে কেন?

আমি বললাম, তার মতো বাঙালি ঠাকুর আর কে আছে? বেশির ভাগ ঠাকুর একবার পুজো পায়, সত্যনারায়ণ বছরে কবার পুজো পায় বলো! পাঁচালি খুললেই দেখবে, তিনি ফকিরের চেহারা ধরেছিলেন, -‘ফকির বলেন হাসি শুন বিপ্রবর, বেদ বা কোরান কিছু নহে মতান্তর।’

আর শুধু তাই নয়, তাতে যে ‘শিন্নি’ বা শিরনি হয়, সেটাও তো ফারসি কথা। ‘শিরিন’ হলো মিষ্টি, মধুর। এসব শব্দ বিদেয় করার জন্য আগেও সংস্কৃত পণ্ডিতরা খ্যাপেছিলেন, তা আর এক বাঘা সংস্কৃত পণ্ডিত হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাদের গা ধুইয়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ব্যাটারা, লেখ তো দেখি ‘কলম’-এর বদলে ‘লেখনী’, ‘দোয়াত’-এর বদলে ‘মস্যাধার’, পাট্টার বদলে ‘ভোগবিধায়ক পত্র’, তবে বুঝি! বল তোরা ‘কাগজ’-এর বদলে কী লিখবি?

বাঙালি যেমন একটা পাঁচমিশেলি জাত, তার রক্তে সাঁওতাল, কিরাত, আর্য সব মিশে আছে, হয়তো নিগ্রোও, তেমনই তার ধর্মও হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান সবই। তাই সেসব কিছু হজম করে নিয়ে মহাশক্তিধর হয়ে ওঠে। পৃথিবীতে আর কোন্ জাত শুধু ভাষার জন্য একটা দেশ বানিয়ে ফেলেছে, কার ভাষা সারা পৃথিবীর মাতৃভাষার বাঁচা মরার প্রতীক হয়ে উঠেছে? আর তার ভাষাও নানা ভাষা থেকে শব্দ নিয়ে জোর বাড়িয়েছে। আর সেজন্যই তোমার হালখাতার দিনে আবার ওই হালখাতার শুভ ‘মহরত’ হয়। তা থেকে সেটা ফিল্মের লোকরাও নিয়ে নিয়েছে।

নববর্ষ বলল, ব্যস ব্যস, আর ব্যাকরণ শুনতে চাই না। আমি বাঙালি এই হলো চরম কথা! জান তো বাংলাদেশে শুধু বাংলা ক্যালেন্ডারকে বিজ্ঞানসম্মত করেছে তাই নয়, আমাকে নিয়ে তোমাদের চেয়েও বেশি মাতামাতি করে। শুধু ঢাকায় নয়, শহরে শহরে, গ্রামে গ্রামে। তাই আজ বাঙালি হয়েই আমি খুশি। আমি বাড়তি ফোঁটা-তিলক কেটে হিন্দু হতে চাই না। ও ছাই তকমা যারা দিয়েছে, তারা নিজেরা ওটা চিবিয়ে খাক।

পবিত্র সরকার : ভারতের খ্যাতনামা লেখক; সাবেক উপাচার্য, রবীন্দ্র ভারতী বিশ্ববিদ্যালয়, কলকাতা

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম