৭ মার্চের ভাষণ
দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য

তোফায়েল আহমেদ
প্রকাশ: ০৭ মার্চ ২০২১, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

সত্তরের নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়ের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে ’৭১-এর ৩ জানুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) নবনির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের শপথ অনুষ্ঠান পরিচালিত হয়। সেদিনের শপথসভায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘৬ দফা আজ আমার না, আমার দলেরও না। এই নির্বাচনের মাধ্যমে ৬ দফা জনগণের সম্পত্তিতে রূপান্তরিত হয়েছে। কেউ যদি এর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে তাকে জ্যান্ত কবর দেওয়া হবে এবং আমি যদি করি আমাকেও।’ এ শপথ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে ৬ দফাকে তিনি আপসহীন অবস্থায় উন্নীত করেন। এরপর অনেক ঘটনা ঘটেছে। ভুট্টো-ইয়াহিয়া ষড়যন্ত্র শুরু করেছে।
’৭১-এর ১ মার্চ ৬ দফার ভিত্তিতে সংবিধান প্রণয়নের জন্য হোটেল পূর্বাণীতে আওয়ামী লীগ পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক চলাকালে পূর্বাহ্নে ডাকা ৩ মার্চের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন ইয়াহিয়া খান এক বেতার ভাষণে একতরফাভাবে স্থগিত ঘোষণা করেন। তৎক্ষণাৎ দাবানলের মতো আগুন জ্বলে ওঠে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে আমরা পল্টন ময়দানে যাই। সেখানে পাকিস্তানের পতাকা পুড়িয়ে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করি। বঙ্গবন্ধু ছাত্রলীগ ও ডাকসুর সমন্বয়ে স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠনের নির্দেশ দেন। ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে সামনে রেখে ‘স্বাধীনতার ইশতেহার’ পাঠ করা হয়। এরপর আসে ঐতিহাসিক সাতই মার্চ। সাতই মার্চ একদিনে আসেনি। ধাপে ধাপে এসেছে। এ সাতই মার্চের ভাষণের মধ্য দিয়ে বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। তিনি বিচক্ষণ নেতা ছিলেন। সব সময় সতর্ক ছিলেন যাতে তিনি আক্রমণকারী না হয়ে আক্রান্ত বলে বিবেচিত হন। আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাহায্য-সহযোগিতা ও স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য তিনি বিশেষভাবে যত্নবান ছিলেন। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশকে কেউ যেন বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করতে না পারে সেজন্য তিনি সতর্কতার সঙ্গে বক্তৃতা ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেন।
এখানে শ্রদ্ধাভরে বঙ্গমাতাকে মনে পড়ে। ৬ মার্চ রাতে বঙ্গবন্ধু বারান্দায় পায়চারি করে পরদিনের বক্তৃতা নিয়ে ভাবছিলেন। শ্রদ্ধেয়া বঙ্গমাতা ফজিলাতুননেছা মুজিব অভয় দিয়ে বলেছিলেন, ‘তোমার ভাববার কী আছে! সারা জীবন তুমি একটা লক্ষ্য নিয়ে রাজনীতি করেছ। জেল-জুলুম-অত্যাচার সহ্য করেছ। বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছ। মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছ। বিশ্বাসী আত্মা থেকে তুমি যা বিশ্বাস করো, তাই বলবা।’ ঠিকই বঙ্গবন্ধু বিশ্বাসী অন্তর থেকে সাতই মার্চের বক্তৃতা করেছিলেন। এটি দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা। পৃথিবীর কোনো ভাষণ এতবার উচ্চারিত হয়নি। একটি অলিখিত বক্তৃতা তিনি দিলেন বিশ্বাসী অন্তর থেকে। যা তিনি বিশ্বাস করতেন তা-ই বললেন। শত্রুপক্ষ গোলা-বারুদ, মেশিনগান, কামান, হেলিকপ্টার-গানশিপ, ট্যাঙ্কসহ সবকিছু নিয়ে প্রস্তুত। সরাসরি স্বাধীনতা ঘোষণা করলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে নিরস্ত্র জনসাধারণের ওপর। অনেকেই তো বঙ্গবন্ধুকে বলতে চেয়েছেন, আজকেই যেন বলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন।’ কিন্তু বঙ্গবন্ধু কারও দ্বারা প্ররোচিত হননি।
সাতই মার্চ সকাল থেকেই রেসকোর্স ময়দানে জনস্রোত আসতে থাকে। তখন সব মানুষের মুখে মুখে স্বাধীনতা। একটি ঘটনা আমার মনে পড়ে। সাতই মার্চ দুপুরে আমি এবং আমারই আরেক প্রিয় নেতা, নামোল্লেখ করলাম না- আমরা দুজন বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়েছিলাম। বঙ্গবন্ধু আমাদের দুজনের কাঁধে হাত রেখে কথা বলছিলেন। আমাদের সেই নেতা যখন বঙ্গবন্ধুকে বললেন, লিডার, ‘আজকে কিন্তু পরিপূর্ণ স্বাধীনতার ঘোষণা ছাড়া মানুষ মানবে না’, আমাদের কাঁধে রাখা হাত নামিয়ে তার নামোচ্চারণ করে বঙ্গবন্ধু ইংরেজিতে বললেন, ‘আই অ্যাম দি লিডার অব দি পিপল। আই উইল লিড দেম। দে উইল নট লিড মি। গো অ্যান্ড ডু ইউর ডিউটি।’ এই বলে তিনি আমাদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ওপরে চলে গেলেন।
আমরা ধানমণ্ডি থেকে রওনা করি পৌনে তিনটায়। রেসকোর্স ময়দানে পৌঁছাই সোয়া তিনটায়। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা আরম্ভ করেন সাড়ে তিনটায়। দশ লক্ষাধিক মানুষের গগনবিদারী স্লোগানে মুখরিত রেসকোর্স ময়দান। সে দিনের সভামঞ্চে জাতীয় চার নেতা- সর্বজনাব সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আলী ও এএইচএম কামরুজ্জামানসহ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন। বঙ্গবন্ধু বক্তৃতা দেওয়ার জন্য দাঁড়ালেন, চারদিকে তাকালেন। মাউথপিসের সামনে পোডিয়ামের ওপর চশমাটি রাখলেন। হৃদয়ের গভীরতা থেকে- যা তিনি বিশ্বাস করতেন, যার জন্য সারা জীবন সংগ্রাম করেছেন, ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই বিশ্বাসী আত্মা দিয়ে, বাংলার মানুষকে ডাক দিলেন, ‘ভাইয়েরা আমার’। তারপর একটানা ১৯ মিনিট ধরে বলে গেলেন দুনিয়া কাঁপানো মহাকাব্য। বঙ্গবন্ধুর সামনে ছিল দুটি পথ। এক. স্বাধীনতা ঘোষণা করা। দুই. পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব না নিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসাবে আখ্যায়িত না হয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য প্রদান করা। তিনি দুটিই করলেন। বঙ্গবন্ধু জানতেন সেদিনের পরিস্থিতি, যেটা তিনি আমাদের বলেছিলেন। সেনাবাহিনী তখন প্রস্তুত। মাথার ওপর বোমারু বিমান এবং হেলিকপ্টার গানশিপ টহল দিচ্ছে। যখনই বঙ্গবন্ধু এ ভাষায় বলবেন যে, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’, তখনই তারা গোলাবর্ষণ শুরু করবে। সেজন্য বঙ্গবন্ধু সবকিছু জেনেই বক্তৃতা করেছেন। এত বিচক্ষণ নেতা ছিলেন যে, সব ষড়যন্ত্র মোকাবিলা করে সামরিক শাসকের উদ্দেশে চারটি শর্ত আরোপ করলেন- মার্শাল ল প্রত্যাহার করো, সেনাবাহিনী ব্যারাকে ফিরিয়ে নাও, এ কয়দিনে যে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত করো এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করো। এ চারটি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত হলেন না। পাকিস্তানিরা তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তিনি ছিলেন সদা সতর্ক এবং সচেতন। অপরদিকে বক্তৃতাজুড়ে ছিল আসন্ন জনযুদ্ধের রণকৌশল এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা। সুস্পষ্টভাবেই বলেছেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।’ ‘আমি পরিষ্কার অক্ষরে বলে দেবার চাই যে, আজ থেকে এই বাংলাদেশে কোর্ট-কাছারি, আদালত-ফৌজদারি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ থাকবে।’ ‘তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবিলা করতে হবে এবং জীবনের তরে রাস্তাঘাট যা যা আছে সব কিছু, আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি তোমরা বন্ধ করে দেবে। আমরা ভাতে মারব, আমরা পানিতে মারব।’ ‘প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে’ তোলার আহ্বান জানিয়ে বললেন, ‘সেক্রেটারিয়েট, সুপ্রিমকোর্ট, হাইকোর্ট, জজকোর্ট, সেমি গভর্নমেন্ট দপ্তরগুলো, ওয়াপদা কোনো কিছু চলবে না।’ নির্দেশ দিলেন ‘আটাশ তারিখে কর্মচারীরা গিয়ে বেতন নিয়ে আসবেন।’ সরকারি কর্মচারীদের উদ্দেশে বললেন, ‘আমি যা বলি তা মানতে হবে। যে পর্যন্ত আমার এই দেশের মুক্তি না হবে খাজনা, ট্যাক্স বন্ধ করে দেওয়া হলো, কেউ দেবে না।’ ‘গরিবের যাতে কষ্ট না হয়, যাতে আমার মানুষ কষ্ট না করে’ সেজন্য শিল্প-কলকারখানার মালিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই সাত দিন হরতালে যে সমস্ত শ্রমিক ভাইয়েরা যোগদান করেছেন প্রত্যেকটা শিল্পের মালিক তাদের বেতন পৌঁছায়া দিবেন।’ জীবনভর লালিত প্রগাঢ় গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ সমুন্নত রেখে বিরোধী রাজনীতিকদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা আমরা মেনে নেব।’ আর রাজনৈতিক নেতাকর্র্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, ‘প্রত্যেক গ্রামে, প্রত্যেক মহল্লায়, প্রত্যেক ইউনিয়নে, প্রত্যেক সাবডিভিশনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে সংগ্রাম পরিষদ গড়ে তোলো এবং তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকো। মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরও দেব, এ দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়ব ইনশাআল্লাহ।’ বক্তৃতার শেষে বজ্রকণ্ঠে স্বাধীনতা ঘোষণা করে বলেছেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতা সংগ্রাম।’ অর্থাৎ সামগ্রিকতায় জাতীয় মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে জনসাধারণ কর্তৃক নির্বাচিত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার ভারসাম্যপূর্ণ বক্তৃতা। সেদিনের সেই স্মৃতি মানসপটে ভেসে ওঠে। অভূতপূর্ব দৃশ্য, কল্পনা করা যায় না। এটিই মানুষ প্রত্যাশা করেছিল। একটা কথা আমার বারবার মনে হয়। একজন নেতা কত দূরদর্শী যে, তিনি সব সময় সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে জানতেন। কোন্ সময় কোন্ কথা বলতে হবে এটা তার মতো ভালো জানতেন এমন মানুষ আমার এই জীবনে দেখিনি। আমি লক্ষ করেছি, বঙ্গবন্ধু জীবনে কখনো স্ববিরোধী বক্তব্য দেননি। একটি বক্তব্য দিয়ে পরে সেই বক্তব্য অস্বীকার করা বা বক্তব্যের মধ্যে পরস্পরবিরোধিতা এটি তার কোনোদিন হয়নি। কারণ, যা তিনি বিশ্বাস করেছেন, ভেবেছেন, মনে করেছেন যে এটিই বাস্তবসম্মত, সেটিই তিনি বলেছেন সুচিন্তিতভাবে। আর যা একবার বলেছেন, মৃত্যুর কাছে গিয়েও আপসহীনভাবে সে কথা তিনি বাস্তবায়ন করেছেন। বঙ্গবন্ধু তার হৃদয়ের গভীর বিশ্বাস থেকেই সেদিন বক্তৃতা করেছেন।
আমরা যদি বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের বক্তৃতা বিশ্লেষণ করি তবে দেখব, এটি অলিখিত একটি বক্তৃতা। ভাষণের সময় ১৯ মিনিট। শব্দ সংখ্যা ১৩০৮টি। আব্রাহাম লিংকনের Gettysburg Address-এর শব্দ সংখ্যা ২৭২, সময় ৩ মিনিটের কম এবং লিখিত। অপরদিকে, মার্টিন লুথার কিং-এর ‘I have a dream’ ভাষণটির সময় ১৭ মিনিট, শব্দ সংখ্যা ১৬৬৭। বিশ্বের কোনো নেতার ভাষণ এমন সংগ্রামমুখর লাখ লাখ মুক্তিকামী নিরস্ত্র মানুষের সামনে হয়নি। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ভাষণটি প্রদান করে মানুষকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে, নিরস্ত্র বাঙালিকে সশস্ত্র জাতিতে রূপান্তরিত করে মুক্তিযুদ্ধের দিকনির্দেশনা দিলেন। কী বিচক্ষণ একজন নেতা! আইএসআই সাতই মার্চ ঢাকা ক্লাবের সামনে ছিল। তারা অপেক্ষা করেছিল- যে ঘোষণাটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ২৬ মার্চ স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বলেছিলেন, ‘আজ থেকে বাংলাদেশ স্বাধীন’- তারা মনে করেছিল সেই কথাটি তিনি সাতই মার্চ বলবেন। আমি আগেই বলেছি বঙ্গবন্ধু ছিলেন সতর্ক। তিনি সবই বলেছেন, কিন্তু শত্রুর ফাঁদে পা দেননি। উল্টো শত্রুকেই ফাঁদে ফেলেছেন। যার জন্য পরদিন আইএসআই রিপোর্ট করল ‘চতুর শেখ মুজিব চতুরতার সঙ্গে বক্তৃতা করে গেল। একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করল, আরেকদিকে ৪টি শর্ত আরোপ করে বিচ্ছিন্নতাবাদী আখ্যায়িত হলো না এবং পাকিস্তান ভাঙার দায়িত্ব নিল না। আমাদের নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। আমরা যে প্রস্তুতি গ্রহণ করেছিলাম সেটা ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো।’ এই ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র সৃষ্টি করেছেন। একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে তিনি নিরস্ত্র বাঙালি জাতিকে সশস্ত্র বাঙালি জাতিতে রূপান্তরিত করেছেন। এই একটি বক্তৃতার মধ্য দিয়ে বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষকে তিনি স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করে একই মোহনায় দাঁড় করিয়ে স্বাধীনতা ঘোষণা করেন ঠিকই কিন্তু বিচ্ছিন্নতাবাদের দায় এড়িয়ে।
বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষের কালপর্বে এই মার্চ মাস থেকেই শুরু হলো স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। এ মার্চ মাসই তো রক্তঝরা মাস। আজ সাতই মার্চেরও সুবর্ণজয়ন্তী। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের দেরাদুনে আমাদের ট্রেনিং হতো। সেখানে আমরা মুজিব বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে বক্তৃতায় বলতাম, ‘বঙ্গবন্ধু মুজিব তুমি কোথায় আছ, কেমন আছ জানি না। কিন্তু তোমার নির্দেশিত পথে যুদ্ধ চালিয়ে যতক্ষণ আমরা বাংলা মাকে মুক্ত করতে না পারব, ততক্ষণ মায়ের কোলে ফিরে যাব না।’ প্রিয় মাতৃভূমিকে স্বাধীন ও বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করেই আমরা মায়ের কোলে ফিরে এসেছিলাম। সাতই মার্চের দুনিয়া কাঁপানো বক্তৃতা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধে আমাদের চলার পথের দিকনির্দেশনা- যা আমরা অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করেছি। দুটি মহান লক্ষ্য সামনে নিয়ে বঙ্গবন্ধু রাজনীতি করেছেন। এক. বাংলাদেশের স্বাধীনতা। দুই. অর্থনৈতিক মুক্তি। প্রথম লক্ষ্য পূরণ করে যখন তিনি দ্বিতীয় লক্ষ্য পূরণের দ্বারপ্রান্তে, ঠিক তখনই ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা তাকে সপরিবারে হত্যা করে। জাতির পিতার দুই কন্যা তখন বিদেশে অবস্থান করায় রক্ষা পান। ’৮১-এর ১৭ মে জাতির পিতার জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনার হাতে আওয়ামী লীগের রক্তে ভেজা পতাকা আমরা তুলে দিই। সেই সংগ্রামী পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করে আজ বাংলাদেশকে তিনি উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদায় অভিষিক্ত করে উন্নয়নের রোল মডেলে পরিণত করেছেন। সেদিন বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ হবে জাতির জনকের স্বপ্নের সোনার বাংলা।
তোফায়েল আহমেদ : আওয়ামী লীগ নেতা; সংসদ সদস্য; সভাপতি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
tofailahmed69@gmail.com