Logo
Logo
×

উপসম্পাদকীয়

নভেম্বরের বেদনাদায়ক ঘটনা কি এড়ানো যেত?

Icon

লে. কর্নেল এটিএম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (অব.)

প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম

প্রিন্ট সংস্করণ

নভেম্বরের বেদনাদায়ক ঘটনা কি এড়ানো যেত?

মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ বীর উত্তম

মেজর জেনারেল কেএম শফিউল্লাহ বীর উত্তম স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সেনাপ্রধান। সম্প্রতি প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে তাকে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক সেনাপ্রধান নিয়োগের প্রেক্ষাপট নিয়ে তিনি যে বক্তব্য দিয়েছেন তার চুম্বক অংশ যথাযথভাবে ব্যাখ্যা ও পর্যালোচনা না করা হলে নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে ভুল বার্তা পৌঁছবে।

‘আমি সেনাপ্রধান হতে চাইনি’- দীর্ঘ সাড়ে চার দশকেরও অধিক পর সাবেক সেনাপ্রধানের এমন বক্তব্যে নতুন প্রজন্মের মনে প্রশ্ন উদয় হতে পারে, বঙ্গবন্ধু তার ওপর হয়তো বা গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিয়েছিলেন। অর্থাৎ তার প্রতি ভারি অন্যায় করা হয়েছিল। এ অবস্থায় ভারতীয় প্রথম সেনাপ্রধান নিয়োগের প্রেক্ষাপট অবতারণা করা যেতে পারে।

অনেকেই হয়তো জ্ঞাত নন, আগস্ট ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টির পর ব্রিটিশরাজ বিদায় নিলে এরপরও তাদেরই জেনারেলদের হাতে বেশ কিছুদিন নতুন এ দুই রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর কর্তৃত্ব ছিল।

১৯৪৯ সালে জেনারেল ফ্রান্সিস রবার্ট বুচারের অবসরের আগে একদিন দিল্লির সাউথ ব্লকে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে আলোচনার জন্য জওহরলাল নেহরু শীর্ষ ভারতীয় সেনা কর্মকর্তাদের ডেকে পাঠান। এক পর্যায়ে তিনি হতাশার সুরে মন্তব্য করেন ‘যেহেতু এখনও ভারতীয় কোনো যোগ্য সেনা অফিসার নেই, তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আবারও একজন ব্রিটিশকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দেব।’

প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথের বক্তব্য ছিল অনেকটা ‘বাহ্বা বাহ্বা বেশ’। এরপর মেজর জেনারেল নাথু সিং রাথোর দাঁড়িয়ে কিছু বলার অনুমতি প্রার্থনা করলেন। ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী- আপনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন যে, আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। তারপরও কিন্তু আমরা কোনো ব্রিটিশকে প্রধানমন্ত্রী বানাইনি।’

নাথু সিংয়ের এমন সত্য অথচ ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে সভাস্থলে যেন বজ্রপাত। চতুর রাজনীতিক নেহরু অট্টহাসিতে পরিবেশ স্বাভাবিক করে নিলেন। পরদিনই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর কার্যালয়ে আমন্ত্রিত হলেন নাথু সিং। প্রথম সেনাপ্রধান হিসেবে রাজনাথ সিং তাকে অভিনন্দিত করেন।

বিনিময়ে মেজর জেনারেল নাথু সিং হাসিমুখে অথচ দৃঢ়তার সঙ্গে দায়িত্ব গ্রহণে অস্বীকৃতি ও ১৯৪৭-এর অক্টোবরে কাশ্মীর যুদ্ধ জয়ের নায়ক, সর্বজ্যেষ্ঠ ভারতীয় অফিসার মেজর জেনারেল কারিয়াপ্পাকে সেনাপ্রধান নিয়োগের অনুরোধ জানান।

নেহরু সরকার তার নির্লোভ, সৎ সাহসের মূল্যায়ন করে নাথু সিংকে লেফটেন্যান্ট জেনারেল এবং মেজর জেনারেল কারিয়াপ্পাকে (পরবর্তী সময়ে ফিল্ড মার্শাল) জেনারেল পদোন্নতি ও সেনাপ্রধান নিয়োগ দিয়েছিল। জেনারেল শফিউল্লাহ যদি সেদিন (এপ্রিল ১৯৭২) দায়িত্ব গ্রহণে অপারগতা প্রকাশ করতেন, নিশ্চয়ই বঙ্গবন্ধু সরকার সেদিন অন্য কাউকে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব দিতেন। ইতিহাস হয়তো ভিন্ন হতো।

‘আমি তিনজন সিনিয়রের কথা বলেছিলাম। তারা হলেন তৎকালীন লে. কর্নেল রব, দত্ত ও জিয়া। জিয়া আমার কোর্সমেট, তবে এক নম্বরের সিনিয়র।’ এ বক্তব্যটির ওপর আলোচনা করা যেতে পারে। চিরকুমার লে. কর্নেল রব (পরবর্তী সময়ে মেজর জেনারেল) ১৯৭০ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পর আওয়ামী লীগে যোগ দিয়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধকালীন জনযুদ্ধে অবসরপ্রাপ্ত এ সেনা কর্মকর্তাকে সেনাপ্রধান নিয়োগ দেয়া হয়; কিন্তু দেশ স্বাধীন হলে একটি পেশাদার নতুন সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের জন্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা নায়কের নিয়োগ আদৌ বিবেচনায় নেয়া হয়নি।

অপরদিকে লে. কর্নেল সি আর দত্তের জ্যেষ্ঠতা ও যোগ্যতার কমতি ছিল না; কিন্তু পাকিস্তান সরকারের সাম্প্রদায়িক নীতির শিকার এ বীর মুক্তিযোদ্ধার ইতিপূর্বে সেনাবাহিনীর কোনো পর্র্যায়ে কমান্ড অভিজ্ঞতা ছিল না।

ফলে সঙ্গত কারণেই বঙ্গবন্ধুর সম্মুখে তৎকালীন কর্নেল জিয়া ও কর্নেল শফিউল্লাহ্র ফাইল উপস্থাপন করা হয়। এরা উভয়েই ১৯৫৫ সালে ১২তম পিএমএ লং কোর্সের অফিসার। কমিশন সময়ে যখন আর্মি নম্বর বরাদ্দ করা হয়, তখন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট জিয়া তার কোর্সমেট সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট শফিউল্লাহ্র এক নম্বর ওপরে স্থান পেয়েছিলেন।

১৯৭২-এ প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেয়ার আগে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে এরা উভয়েই ছিলেন অপরিচিত মুখ। ফলে তাকে নির্ভর করতে হয় মুক্তিযুদ্ধকালীন মন্ত্রিপরিষদ বিশেষত কর্নেল (পরবর্তী সময়ে জেনারেল) ওসমানীর ওপর।

কর্নেল ওসমানী ১৯৬৭ সালে অবসরের পর আওয়ামী রাজনীতিতে সক্রিয় এবং ১৯৭০-এর নির্বাচিত একজন এমএনএ। মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকার তাকে প্রধান সেনাপতি নিয়োগ করলে তৎকালীন মেজর জিয়া আপত্তি করেছিলেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন পুরো সময়টা তিনি তার ক্ষোভ অব্যাহত রেখেছিলেন। ২৭ মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার থেকে মেজর জিয়া নিজ নামে এবং নিজেকে অস্তিত্বহীন একটি বিপ্লবী সরকারের প্রধান দাবি করেছিলেন। এ দুটি ঘটনায় ক্ষুব্ধ জেনারেল ওসমানী জিয়ার ভেতর উচ্চাকাঙ্ক্ষা, অপরদিকে আনুগত্যে বড় ক্ষোভ লক্ষ করেন। তাজউদ্দিন, মোশতাক প্রমুখও ওসমানীকে সমর্থন করেছিলেন।

একইদিন একই কোর্সে কমিশন অথচ মাত্র এক নম্বর আগে-পিছের জ্যেষ্ঠতার দুর্বল যুক্তি সেদিন ধোপে টেকেনি। ফলে আনুগত্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যান তৎকালীন কর্নেল শফিউল্লাহ। তাকে নিয়োগ দেয়া হলে কর্নেল শফিউল্লাহ ৭ এপ্রিল ১৯৭২ নিজেকে সৌভাগ্যবান ভেবে সেনাপ্রধানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।

জ্যেষ্ঠতা ও আনুগত্যের এ টানাপোড়েন নতুন কিছু নয়। ১৯৫১ সালে ব্রিটিশ জেনারেল ডোগলাস গ্রেসির মেয়াদ শেষ হলে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে পাঁচজন পাকিস্তানি জ্যেষ্ঠ অফিসারের তালিকা তৈরি করা হয়।

তারা ছিলেন ১৯২০ সালে কমিশনপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আকবর, মেজর জেনারেল ইফতেখার (১৯২৪), একমাত্র বাঙালি মেজর জেনারেল ইশফাকুল মজিদ (১৯২৪), মেজর জেনারেল এনএ রেজা (১৯২৬) ও মেজর জেনারেল আইয়ুব খান (১৯২৮)।

বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে- প্রথম চারজনকে ডিঙিয়ে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল জেনারেল আকবর অপেক্ষা আট বছর কনিষ্ঠ; ১৯৪৪ সালে বার্মা ফ্রন্টে ভীরুতার অভিযোগে ১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের কমান্ড হারানো আইয়ুব খানকে (পরবর্তী সময়ে ফিল্ড মার্শাল)।

এ সিদ্ধান্তের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে প্রতিরক্ষা সচিব ইসকান্দার মির্জা মন্তব্য করেছিলেন ‘জ্যেষ্ঠতা ও পেশাদারিত্বই শুধু নয়, নতুন দেশের বাহিনী প্রধানের প্রশ্নাতীত আনুগত্যও খুবই জরুরি।’

‘জিয়াকে উপপ্রধান করা ঠিক হয়নি’ এমন মন্তব্যের মাধ্যমে সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ বোঝাতে চেয়েছেন, তার কোর্সমেট জিয়াকে সেনাবাহিনীতে রেখে দেয়ায় তাকে ঘিরেই সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ষড়যন্ত্র আবর্তিত হয়েছিল। জেনারেল শফিউল্লাহর এমন বক্তব্যের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারিক আদালত একমত পোষণ করেছেন।

কিন্তু শেখ মুজিব যে জাতির পিতা। জিয়ার জন্য তার মন ঠিকই কেঁদেছিল। তাই কর্নেল জিয়াকে শুধু উপপ্রধান নয়, সেনাপ্রধানের সমান্তরালে একই সময়ে প্রথমে ব্রিগেডিয়ার ও পরে মেজর জেনারেল পদোন্নতি দিয়েছিলেন। পৃথিবীর কোথাও এমনটির নজির নেই।

‘আমাকে সেনাপ্রধান বানানো বঙ্গবন্ধুর মস্ত বড় ভুল সিদ্ধান্ত ছিল’ এমন সৎ ও সহজ স্বীকারোক্তির মাধ্যমে পক্ষান্তরে জেনারেল শফিউল্লাহ্ বিবেকের আদালতের কাছে সৎ সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। তার অপেক্ষা মাত্র পঁচিশ বছর জুনিয়র একজন অফিসার হিসেবে তার প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও সম্মান আরও বেড়ে গেল বৈকি। সেনাপ্রধান হিসেবে তার প্রায় সাড়ে তিন বছর দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়মিত গোয়েন্দা রিপোর্ট পাচ্ছিলেন যে, সেনাবাহিনীর ভেতরে নেকড়ে ঢুকে পড়েছে।

জাসদের বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা, পাকিস্তান প্রত্যাগত জ্যেষ্ঠতাবঞ্চিত অফিসার, উপপ্রধানের অনুসারী- এ তিন গোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র মারাত্মক আকার ধারণ করলেও তিনি দমন করতে পারেননি। এমনকি ১৫ আগস্ট প্রত্যুষে অসহায় রাষ্ট্রপতির ফোন পেয়ে তিনি টেলি ব্যাট্ল, সেনাভবনে শীর্ষ অফিসারদের নিয়ে বৈঠক, তার কথিত মতে জেনারেল জিয়ার পরামর্শে খালেদ মোশাররফকে অভিযান থেকে বিরত রাখা এবং অবশেষে অফিস টাইম অনুযায়ী নিজ কার্যালয়ে গিয়ে বসে বসে ভাবছিলেন ব্যাপারটি কী হল!

তার সেদিনের এমন কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার দৃশ্য স্মৃতিপটে উঠে এলে জেনারেল সুহার্তো কর্তৃক ইন্দোনেশিয়ার বিদ্রোহ দমনের কাহিনী মনে পড়ে গেল। ১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর জাকার্তায় রাষ্ট্রপতি সুকর্নর মৃত্যুর গুজবে তারই গার্ড রেজিমেন্ট, দুটি পদাতিক ইউনিট ও শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টি সম্মিলিতভাবে বিপ্লবের ডাক দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও রাষ্ট্রীয় বেতার কেন্দ্র দখল করে। রাতেই বিমান ঘাঁটিতে নিয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল আহমেদ ইয়ানী, ছয়জন জ্যেষ্ঠ জেনারেলসহ বেশকিছু অফিসারকে তারা নির্মমভাবে হত্যা ও লাশ গুম করে ফেলে।

জাকার্তার এ বিদ্রোহ দ্রুত একাধিক দ্বীপেও সংক্রমিত হয়। এ সময় অবকাশ ছুটিতে রাজধানীর বাইরে অবস্থানরত রিজার্ভ ফোর্স কমান্ডার মেজর জেনারেল সুহার্তো বেতারে বিদ্রোহের সংবাদ শুনে দ্রুততম সময়ে জাকার্তার পথে উড়ে যান। কোনো ধরনের সময়ক্ষেপণ না করে অনুগত বাহিনীকে প্রস্তুত করা মাত্রই তথাকথিত বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা এবং মাত্র ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ে তাদের পরাস্ত ও নির্মমভাবে দমনে সক্ষম হয়েছিলেন। এরপর থেকে কমিউনিস্ট পার্টি আর মাথা তুলতে পারেনি।

১৫ আগস্ট সময়ক্ষেপণ না করে মাত্র ৪১ বছর বয়স্ক তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ্ যদি ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ, শাফায়াত জামিল ও তার অনুগত ৪৬ পদাতিক ব্রিগেড এমনকি শুধু ২ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টকে নিয়ে ঢাকা শহরের ৩-৪টি স্থানে বিশৃঙ্খলভাবে সমবেত মাত্র এক ডজন বিপথগামী অফিসার ও দু’শর কম সৈন্য দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তেন, তবে তারা পালানোর পথ পেত না। কেননা তখনও তারা ছিল জনবল ও অস্ত্রবলে দুর্বল এবং অসংগঠিত। রাজনৈতিক কোনো ভিত্তিই ছিল না। এ অবস্থায় তারা আত্মসমর্পণ অথবা আত্মহত্যায় বাধ্য হতো। এমনটি হলে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারকে বাঁচানো যেত না ঠিকই; কিন্তু ৩ ও ৭ নভেম্বরের বিয়োগান্তক ঘটনা ঠিকই এড়ানো যেত।

লে. কর্নেল এটিএম মহিউদ্দিন সেরনিয়াবাত (অব.) : অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা

 

Jamuna Electronics

Logo

সম্পাদক : আবদুল হাই শিকদার

প্রকাশক : সালমা ইসলাম