
প্রিন্ট: ২৯ মার্চ ২০২৫, ০২:৩৫ এএম
বড় বাদলের একাল-সেকাল

মোজাম্মেল হক চঞ্চল
প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২০, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আরও পড়ুন
‘দেশের কথা খুব মনে পড়ে। বিশেষ করে সোনালী অতীত ক্লাব ও আমার বরিশালের বন্ধুদের খুব মিস করি। করোনামুক্ত বিশ্বের অপেক্ষায় রয়েছি। মুক্ত হলে প্রথমেই প্রিয় স্বদেশে যাব।’ মুঠোফোনে কথাগুলো বলেন ইংল্যান্ড প্রবাসী সাবেক তারকা ফুটবলার জাকির হোসেন বাদল। যিনি ঢাকার মাঠে বড় বাদল নামে পরিচিত।
লন্ডনের একটু দূরে এসেক্সে স্ত্রীকে নিয়ে বাদলের বসবাস। একমাত্র ছেলে, ছেলের স্ত্রী ও দুই নাতনি পাশেই থাকেন। এদের নিয়েই সুখের সংসার ঢাকার মাঠের একসময়ের এই জনপ্রিয় ফুটবলারের। করোনা মহামারীর দিনগুলোতে বাসায় সময় কাটে বাদলের। বাগান করছেন। নিজের হাতে বাগানের পরিচর্যা করেন। মাঝেমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে গাফফারের সঙ্গে, ঢাকায় বাদল রায়, বাবলু, নান্নু ও বরিশালের মোস্তফা কামালের সঙ্গে টেলিফোনে কথাবার্তা বলেন। দেশের ও সতীর্থ ফুটবলারদের খোঁজখবর পান তাদের কাছ থেকে। যুগান্তরের এই প্রতিবেদকের সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা হয় জীবনের নানা বাঁক নিয়ে।
বড় বাদল বলেন, ‘১৯৭২ সালে বরিশাল মোহামেডানের পক্ষে খেলতে গিয়েছিলেন ঢাকা মোহামেডানের নামকরা সব ফুটবলার। আমি তখন নজরুল পাঠাগারে খেলি। উপচে পড়া দর্শক। ওই ম্যাচে জীবনপণ লড়াই করে খেলি আমরা। ম্যাচে একটি গোলই হয়। আর সেই গোলটি ছিল আমার করা।’ তার কথা, ‘দর্শকদের সে কী উন্মাদনা। আমাকে কাঁধে উঠিয়ে মিছিল শুরু হয়। মাঠ থেকে ক্লাব পর্যন্ত আমাকে কাঁধে চড়িয়েই নিয়ে এসেছিলেন দর্শকরা। বরিশালে ধন্য ধন্য রব পড়ে যায়। পরদিন সকালে বাংলাদেশের ফুটবলের অন্যতম পুরোধা গজনবী ভাই (পুরো নাম আমির জং চৌধুরী) আমাকে ডেকে বললেন, আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে ঢাকায় যাবি। উনি তখন মোহামেডানের একজন হর্তাকর্তা। গজনবী ভাইয়ের কথায় আমার সারা শরীরে শিহরণ বয়ে যায়। বন্ধুবান্ধবদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সন্ধ্যায় রকেটে চেপে বসি। সদরঘাটে নেমে সোজা মোহামেডান ক্লাব টেন্টে। ব্যস, ওই শুরু। আমার জীবনের মোড় ঘুরে যায়।’ বাদলের কথা, ‘টানা ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত সাদা-কালো জার্সি ছিল আমার গায়ে। পরের বছর পিডব্লুডিতে যোগ দিই। ১৯৮০ সালে আবার মোহামেডানে। ১৯৮১ সালে ব্রাদার্স ও ’৮২ সালে বিজেএমসিতে কাটিয়ে পরের বছর আমি মোহামেডানে। ঢাকার মাঠের ক্যারিয়ার মোহামেডানে শুরু হয়েছিল। এই ক্লাবের জার্সি গায়েই ফুটবল ছাড়ি ১৯৮৬ সালে। জাতীয় দলে খেলেছি অনেক বছর। আমার ফুটবলের শুরুটা কিন্তু মসৃণ ছিল না। ফুটবলের জন্য পড়াশোনার ক্ষতি হচ্ছে বলে বাবা রাগ করতেন। লুকিয়ে খেলতাম। একদিন তো বুট-জার্সি সবকিছু ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন বাবা। কিন্তু মায়ের কারণে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারেননি। পরে যখন মোহামেডান ক্লাব ও জাতীয় দলে কিছুটা নামডাক হয়েছিল তখন বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স করার পর বাবার কষ্ট লাঘব হয়েছিল। যাক তার ছেলে অন্তত উচ্ছনে যায়নি।’ বড় বাদল যখন কথা বলছিলেন পাশে ছিলেন তার বরিশালের সতীর্থ মিজান। পাশ থেকে বলেন, ‘এই ব্যাডা তোমারে যে না খাওয়াইয়া ফুটবল খেলাইছিল হেই কতাডা কও!’ বরিশালের ভাষায় মিজানের কথা শুনে হেসেই খুন বড় বাদল। ‘ঘটনাটি ছিল, তখন আমি স্কুলে পড়ি। বরিশালের পাশে শুকলিয়ায় খ্যাপ খেলতে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল আমাকে। সকালে নৌকায় করে রওনা দিয়েছিলাম। পেটে প্রচণ্ড ক্ষুুধা। আমি বারবার বলছিলাম আমার ক্ষুধা লেগেছে। আমাদের মধ্যে একজন ম্যানেজার ছিলেন। তিনি বারবারই বলছিলেন ওই যে তালগাছের মোড় দেখা যায় ওটা ঘুরলেই আমরা নামব। আর তোমার নাস্তাও পাবে। এভাবে কত তালগাছের মোড় যে ঘোরানো হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। যাই হোক বেলা ৩টায় আমরা মাঠে উপস্থিত হই। নাস্তা দূরে থাক পানি খাওয়ারও সময় পাইনি আমরা। ওই ম্যাচেও আমার গোলে দল জেতে। দর্শকদের সে কি উল্লাস। আর আমি ক্ষুধায় কাতর। বেহুশ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। যাক শেষ পর্যন্ত আমাকে খাবার দেয়া হয়েছিল।’