সোনালী অতীতের কিংবদন্তি ফুটবলার কবির আহমেদ আর নেই

মোজাম্মেল হক চঞ্চল
প্রকাশ: ০৫ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
কবির-আশরাফ-মারী। এই ত্রয়ীর শেষ দু’জন আগেই অতীত হয়ে গিয়েছিলেন। বাকি ছিলেন কবির আহমেদ। শেষ পর্যন্ত তিনিও চলে গেলেন বাংলাদেশের ফুটবলকে শূন্য করে। দুরন্ত গতি, অসামান্য ড্রিবলিং ও নিখুঁত ফিনিশিংয়ে এক সময় মাঠ মাতিয়ে রাখা সোনালী অতীতের কিংবদন্তি ফুটবলার কবির আহমেদ বৃহস্পতিবার রাতে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ... রাজিউন)। নয়দিন আগে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কবির আহমেদ। শুক্রবার বাদ জুমা ধানমণ্ডির তাকওয়া মসজিদে জানাজা শেষে আজিমপুর গোরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।
১৯৩৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঝালকাঠির পালট গ্রামে জন্ম নেয়া এ তারকার বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। ১৯৬১ সালে সুফিয়া কবিরের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন কবির আহমেদ। কিন্তু দুর্ভাগ্য ছিল তার স্ত্রী সুফিয়া কবিরের। মাঠে বসে কীর্তিমান স্বামীর খেলা দেখার সৌভাগ্য তার হয়নি। তখন খেলা সম্প্রচার হতো রেডিওতে। তাতে কান লাগিয়ে শোনা ছাড়াতো কোনো উপায় ছিল না সুফিয়ার। যদিও পরে স্বামীর আগেই (২০০৪ সালে) ইহলোক ছেড়ে গেছেন সুফিয়া কবির। প্রায় দশ বছর ধরে অসুস্থ ছিলেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার। হুইল চেয়ারই ছিল এই দুর্দান্ত রাইট ইনসাইড ফরোয়ার্ডের ভরসা। একমাত্র ছেলে শাব্বির উল কবির, পুত্রবধূ শামীমা কবির এবং নাতি-নাতনিদের যতœ ও ভালোবাসায় সিক্ত ছিলেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত।
বরিশালের একে স্কুলের মাঠে তার ফুটবলের প্রথম পাঠ। আন্তঃস্কুল ফুটবল ও বিভিন্ন টুর্নামেন্টের সুবাদে কৈশোরেই কবির আহমেদের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে সারা জেলায়। তারপর বরিশাল জেলা দলের হয়ে ’৫৩ সালে ঢাকায় আন্তঃজেলা ফুটবল টুর্নামেন্ট খেলতে এসে সবার নজরে পড়েন। ঢাকার ক্লাব ফুটবলের তখন রমরমা অবস্থা। অন্যতম সেরা ফুটবল শক্তি পূর্ব পাকিস্তান প্রেস ফুটবল দল তাকে আর বরিশাল ফিরে যেতে দেয়নি। এই দলের পক্ষেই ঢাকার মাঠে তার অভিষেক হয় ’৫৩তে। এক বছরের পারফরম্যান্স দেখেই ‘রতন’ চিনে ফেলেন ওয়ান্ডারার্সের আবদুর রহিম। তখন ঢাকা মাঠে খুব নামিদামি দল ওয়ান্ডারার্স, চ্যাম্পিয়ন ফাইট দেয় প্রতিবারই। প্রয়াত আবদুর রহিম একবার এক সাক্ষাৎকারে কবির আহমেদকে দলে নেয়ার ব্যাপারে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান প্রেস দলে এক বছর খেলে সে নিজেকে প্রমাণ করেছে। সে সময় আমাদের দলের নিয়মিত রাইট ইনসাইড ফরোয়ার্ড এফআর খান ভারতে চলে যাওয়ায় তার জায়গায় একজন ভালো খেলোয়াড় দরকার হয়ে পড়েছিল। এই প্রয়োজন থেকেই ওয়ান্ডারার্সের দরজা খুলে যায় তার জন্য। এ ক্লাবে দু’বছর খেলেই তিনি ঢাকা মাঠের তারকা। কবির একজন সৃষ্টিশীল ফুটবলার ছিল। গোল বানিয়ে দেয়ায় ছিল দারুণ দক্ষ। ডানদিক থেকে বাড়ানো ওর নিখুঁত সেন্টারগুলোকে গোলে পরিণত করতে স্ট্রাইকারদের মোটেই কষ্ট করতে হতো না।’
কবির, আশরাফ, মারী- এই ত্রয়ীর সবচেয়ে সুখী মানুষটি ছিলেন প্রয়াত আশরাফ। যার অনেক গোলের উৎস ছিলেন এই কবির আহমেদ। ’৫৬তে কবির ও আশরাফ দলবদল করে ওয়ান্ডারার্স থেকে মোহামেডানে নাম লেখান। তারপর থেকে মোহামেডানই হয়ে যায় তার স্থায়ী ঠিকানা। টানা নয় বছর খেলেছেন মোহামেডানে। একবার নবী চৌধুরীর সঙ্গে খেলেছিলেন পুলিশে। কিছুদিন খেলার পর পুলিশের চাকরিও ছেড়ে দেন কবির আহমেদ।
তবে ওয়ান্ডারার্সে খেলার সময়েই ’৫৫তে ভাওয়ালপুরে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপে তার পূর্ব পাকিস্তান দলে অভিষেক হয়। ’৬৩ পর্যন্ত তিনি নিয়মিত খেলে গেছেন পূর্ব পাকিস্তান দলে, অধিনায়কত্ব করেছেন ’৫৯ সালে। স্ট্রাইকার আশরাফের ছোট ভাই মেসবাহউদ্দিন বলেছিলেন, ‘কবির-আশরাফ-মারী ত্রয়ীর যে খেলা আমরা দেখেছি, তার সঙ্গে বর্তমান ফুটবলের তুলনা চলে না।’
সাবেক তারকা ফুটবলার ও বর্ষীয়ান কোচ গোলাম সারোয়ার টিপু এখনও এই ত্রয়ীর খেলার স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ‘বাঁ-দিকে মারীদা ছিলেন বাঁ-পায়ের শিল্পী ফুটবলার, মাঝখানে আশরাফ ভাই শ্বাসরুদ্ধকর ফিনিশার, আর ডান-দিকে কবির ভাই বল পায়ে শিল্ড করে রাখা এক জাদুকর। কী অদ্ভুত বোঝাপড়া ছিল তাদের মধ্যে! মারীদা মাথা নোয়ালেই আশরাফ ভাই বুঝে ফেলতেন বল আসছে। কবির ভাই চকিতে ঘুরলেই আশরাফ ভাই বুঝে ফেলতেন সামনে এগোতে হবে।’
১৯৫৮ সালে টোকিও এশিয়ান গেমসে পাকিস্তান দলে কবির আহমেদের অভিষেক হয়। ছিলেন পাকিস্তান দলের সহ-অধিনায়ক। ফুটবলে অসামান্য ভূমিকা রাখায় ২০০১ সালে জাতীয় ক্রীড়া পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কবির আহমেদ। শেরেবাংলা পদক অর্জন করেন ১৯৯৭ সালে। ২০১২ সালে সোনালী অতীত ক্লাব থেকে তাকে আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়। এছাড়া তার বর্ণাঢ্য খেলোয়াড়ি জীবনে অসংখ্য পুরস্কার জেতেন।