গণজাগরণের শিল্পী হেমাঙ্গ বিশ্বাস

মযহারুল ইসলাম বাবলা
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
উপমহাদেশের গণসংস্কৃতি আন্দোলনের প্রবাদ প্রতিম শিল্পীসংগ্রামী হেমাঙ্গ বিশ্বাসের জন্ম ১৯১২ সালের ১৪ ডিসেম্বর শ্রীহট্ট জেলার হবিগঞ্জ মহকুমার চুনারুঘাটের মিরাশী গ্রামে। জমিদার পিতার সন্তান হয়েও শ্রেণির সীমানা অতিক্রম করতে পেরেছিলেন। রাজনৈতিক মতাদর্শে এবং অঙ্গীকারে। পরিবারে গানের চর্চা ছিল না। তবে তার নানা ছিলেন সে সময়কার নামকরা তবলা বাদক। মা সরোজিনী বিশ্বাস গান জানতেন এবং গান করতেন। শৈশবে স্কুলে যাওয়ার পথে গান গেয়ে গেয়ে স্কুলে যেতেন- যদিও প্রাতিষ্ঠানিক গান শেখা তার হয়নি। জ্যোতিপ্রকাশ আগারওয়ালের কাছ থেকেই নিয়েছিলেন গানের তালিম। গানের ক্ষেত্রে সেটাই ছিল তার একমাত্র প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। শৈশব থেকেই লোকসঙ্গীত চর্চা করতেন বলেই লোকসঙ্গীতে অসামান্য দখল ছিল তার। লোকসঙ্গীতের আবহ দিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে যাওয়া যায়- তাই লোকসঙ্গীতের আঙ্গিকে জীবনভর গণমানুষকে উজ্জীবিত করতে গেয়েছেন গণসঙ্গীত। প্রচলিত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন ও সংগঠিত করতেই গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেনও।
হবিগঞ্জ মিডল ইংলিশ স্কুল এবং ডিব্রুগড়ের জর্জ ইন্সটিটিউটে শিক্ষা শেষে হবিগঞ্জ সরকারি স্কুল থেকে ১৯৩০ সালে দুই বিষয়ে লেটার নিয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে মেট্রিক পাস করে ভর্তি হন শ্রীহট্টের মুরারীচাঁদ কলেজে। কলেজছাত্র হেমাঙ্গ বিশ্বাস জড়িয়ে পড়েন স্বদেশি আন্দোলনে। এ কারণে তাকে ৬ মাস কারাভোগ করতে হয় এবং বহিষ্কৃত হতে হয় কলেজ থেকে। স্বদেশি আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণের অপরাধে ১৯৩২ সালে আবার গ্রেফতার হয়ে একটানা প্রায় তিন বছর কারাভোগ করেন। তখনই আক্রান্ত হন মারাত্মক যক্ষ্মা রোগে। বন্ড দিয়ে জেলমুক্তির রাষ্ট্রীয় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেও মৃত্যু নিশ্চিত ভেবে ব্রিটিশ সরকার তাকে মুক্তি দিয়ে দায়মুক্তি নিয়েছিল। যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে দীর্ঘ তিন বছর চিকিৎসা শেষে সুস্থ হন। জেল জীবনে কংগ্রেসের অহিংস নীতির প্রতি আস্থা-বিশ্বাস হারিয়ে মার্কসবাদী রাজনীতির শিক্ষা-দীক্ষায় কমিউনিস্ট মতাদর্শে ঝুঁকে পড়েন। ১৯৩৯ সালে কংগ্রেস সভাপতি নেতাজি সুভাষ বসু হবিগঞ্জে এলে তাকে বিপুল সংবর্ধনা দেয়া হয়। সংবর্ধনাপত্র পাঠ করেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। চা বাগানের শ্রমিকদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলন এবং ডিকবয় তেল কোম্পানির শ্রমিক হত্যার প্রতিবাদে সংঘটিত আন্দোলনে হেমাঙ্গ বিশ্বাসই নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ১৯৪২ সালের ১৮ জুলাই কমিউনিস্ট পার্টির নির্দেশে সিলেট শহরের গোবিন্দচরণ পার্কে সাংস্কৃতিক স্কোয়াড ‘সুরমা ভ্যালি কালচারাল স্কোয়াড’ গঠন করেন। সিলেট তখন বাংলা প্রদেশের অংশ ছিল না। ছিল আসাম প্রদেশের অংশ। গানের স্কোয়াড নিয়ে চষে বেড়িয়েছেন আসাম প্রদেশজুড়ে। কমিউনিস্ট মতাদর্শের কারণে জমিদার পিতা তাকে বাড়ি থেকে বিতাড়িত করলে তিনি চলে যান সিলঙে। আমৃত্যু হেমাঙ্গ বিশ্বাস আর ফিরে যাননি পরিবার-শ্রেণির কাছে। পরিবার ও শ্রেণিচ্যুত সারাটি জীবন
মানবমুক্তির লক্ষ্য অর্জনে বিলিয়ে দিয়েছেন নিজেকে। সিলেট কমিউনিস্ট পার্টি হেমাঙ্গ বিশ্বাসের সম্পূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে সংগঠন গড়ে তুলতে তাকে পাঠায়। সে সময়ে রচিত তার বিখ্যাত গান-‘কাস্তেটারে দিও জোরে শান।’
১৯৪৬ সালে আসাম প্রদেশ গণনাট্য সংঘ গঠিত হলে তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং পরপর তিনবার ওই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৪৭-এ গণনাট্য সংঘ এবং কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা দেশভাগের শিকার হন। দেশভাগের নিষ্ঠুর পরিণতিতে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের ব্যঙ্গাত্মক গান- মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল। ১৯৪৮ সালে তেলেঙ্গানা ও তেভাগা কৃষক বিদ্রোহ দমনে স্বাধীন ভারতে কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ করা হয়। হাজার হাজার কমিউনিস্ট নেতাকর্মীদের নিষ্ঠুরভাবে দমন-পীড়ন এবং গণগ্রেফতার করা হয়। ১৯৫১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গ্রেফতার হলেও অসুস্থতার কারণে ছাড়া পেয়ে যান। ১৯৫৭ সালে সুচিকিৎসার জন্য কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে তাকে চীনে পাঠানো হয়। টানা তিন বছর চীনে চিকিৎসাধীন থাকাবস্থায় চীনা ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। চীনা ভাষায় তার অনেক গানও রয়েছে। চীন থেকে ফিরে ১৯৫৯ সালে চট্টগ্রামের মেয়ে রাণু দত্তকে বিয়ে করেন। পরে আরও কয়েকবার তিনি চীনে গিয়েছিলেন। ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিপ্রধান কমরেড মুজাফ্ফর আহ্মদের সুপারিশে কলকাতাস্থ সেভিয়েত কনস্যুলেটে ১৯৬১ সালে তার চাকরি হয়। পরবর্তীতে চীন-সোভিয়েত মতাদর্শগত বিভাজনে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনও বিভক্ত হয়ে পড়ে। যার বিরূপ প্রভাব আমাদের উপমহাদেশেও পড়েছিল। চীনের প্রতি তার অতি আকর্ষণ এবং সোভিয়েত পার্টির সমালোচনার কারণে ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত কনস্যুলেটের চাকরি ত্যাগ করতে বাধ্য হন। ১৯৬৯ সালে নকশাল বাড়ি আন্দোলনের প্রতি তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন প্রদান করেছিলেন। নকশাল আন্দোলন ভারতীয় শাসক শ্রেণিকে আতঙ্কে দিশাহারা করে তুলেছিল। আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে কেন্দ্র করে সুযোগের মওকায় ভারত সরকার সুকৌশলে এবং চরম পন্থায় নকশাল আন্দোলন দমনে সফল হয়েছিল। ১৯৭১ সালে হেমাঙ্গ বিশ্বাস গঠন করেন ‘মাস সিঙ্গার্স’ নামক গণসঙ্গীতের গানের দল এবং আমৃত্যু এই দল নিয়েই ঘুরে বেড়িয়েছেন ভারতজুড়ে এবং দেশ-বিদেশে। ২২ নভেম্বর ১৯৮৭ আজন্ম বিপ্লবী-অবিচল মতাদর্শিক হেমাঙ্গ বিশ্বাস কলকাতায় মৃত্যুবরণ করেন।
তার উল্লেখযোগ্য প্রকাশিত গানের সংকলন বিষাণ, চীন দেখে এলাম, Witnessing China with Eyes, সীমান্ত প্রহরী, অসমীয়া ভাষার কাব্যগ্রন্থ কুলখুরার চোতাল, অসমীয়া ভাষায় আকৌ চীন চাই আহিলোঁ (দ্বিতীয় খণ্ডে), গান ও স্বরলিপি সংকলন শঙ্খচিলের গান, আবার চীন দেখে এলাম, লোক সঙ্গীতের সমীক্ষা : বাংলা ও আসাম, হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান, জীবন শিল্পী, জ্যোতিপ্রকাশ। মৃত্যুর পর প্রকাশিত আত্মজীবনী উজান গাঙ বাইয়া ইত্যাদি। হেমাঙ্গ বিশ্বাসের উল্লেখযোগ্য গানগুলোর মধ্যে- কাস্তেটারে দিও জোরে শান, তেলেঙ্গানা-তেলেঙ্গানা, জন ব্রাউন-এর দেহ শুয়ে সমাধিতলে, আমি যে দেখেছি সেই দেশ (চীন নিয়ে), মার্কিন লোকসঙ্গীতশিল্পী পিট সিগারের আন্তর্জাতিক সঙ্গীতের বঙ্গানুবাদ- আমরা করব জয়, অজ্ঞাতনামা মার্কিন লোকসঙ্গীত- জন হেনরি (আমেরিকার রেললাইন পাতার শ্রমিকদের নিয়ে), বাজে ক্ষুব্ধ ঈশানী ঝড়ে রুদ্র বিষাণ (১৯৪৬-এর নৌ বিদ্রোহ নিয়ে), নিগ্রো ভাই আমার পল রবসন, হিরোশিমায় আণবিক বোমা বর্ষণ নিয়ে- শঙ্খচিল, প্রহসনের স্বাধীনতা নিয়ে- আজাদী হয়নি আজও তোর, মাউন্টব্যাটন মঙ্গলকাব্য, মাও সেতুং স্মরণে- আরও বসন্ত-বহু বসন্ত তোমার নামে আসুক, নোঙর ছাড়িয়া নাও-এর দে দুঃখী নাইয়া, বেহুলার ভেলায় যায় ভেসে যায়, তোর মরা গাঙ্গে আইলো এবার বান, জালিয়ানওয়ালাবাগের-জালালাবাদের এসেছে আদেশ (সুর দেবব্রত বিশ্বাস), পঞ্চাশের মন্বন্তর নিয়ে- হায় হায় ঘোর কলিকাল আইলো আকাল, খাদ্য আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে- গুলিবিদ্ধ গান যে আমার খুঁজে খুঁজে মরে, মুক্তির শিবিরে হাঁকে বিউগল, এই সমাধিতলে কত প্রাণপ্রদীপ জ্বলে, উদয়ের পথের যাত্রী, মন কান্দেরে পদ্মার চরের লাইগ্যা, পদ্মা কও-কও আমারে, লর্ড মাউন্ট ব্যাটনের ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে- শুন শুন শুন সবে শুন মন দিয়া, রুশ বিপ্লবের সময়কার রেডগার্ড বাহিনীর গানের বঙ্গানুবাদ- ভেদি অনশন মৃত্যু তুষার তুফান, আমরা যুগের স্বপ্ন ওরে, এ মাটির এই ধূলিকণায়, কারাগারে বন্দি, এ ছাড়াও অসংখ্য গণজাগরণের গান হেমাঙ্গ বিশ্বাস গেয়েছেন। আমাদের জাতীয়তাবাদী এবং মানবমুক্তি আন্দোলন-সংগ্রামে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের অনেক গান আমাদের এখানে গাওয়া হয়েছিল এবং এখনও গাওয়া হয়ে থাকে।
নাটক, যাত্রা এবং চলচ্চিত্রে সুর দিয়েছেন- সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। উৎপল দত্তের কল্লোল ও তীর নাটক উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তেলেঙ্গানা ১৭৯৯, লাল লণ্ঠন, লেনিন, পদ্মানদীর মাঝি, বিদুন, রাইফেল, রাহুমুক্ত রাশিয়া, মানুষের অধিকারে, কাঙ্গাল হরিশ, চাঁদ-মনসার নৃত্যনাট্য প্রভৃতি নাটক ও যাত্রাপালার সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন। লালন ফকির চলচ্চিত্রে সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালনা করেছেন। তার সুরে গান গেয়ে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন প্রয়াত সঙ্গীতশিল্পী হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মাতৃভাষা বাংলা ছাড়াও অসমীয়া, ইংরেজি এবং চীনা ভাষায়ও তার সমান দক্ষতা ছিল।
হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গান অতি নিকট থেকে দেখা ও শোনার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি তার মাস সিঙ্গার্স গণসঙ্গীতের দল নিয়ে ঢাকায় এসেছিলেন। প্রেসক্লাবে কয়েক ঘণ্টা গান শুনেছি। ওইদিন হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের পর আরণ্যক নাট্যদলের নাটকের প্রদর্শনী ছিল কিন্তু শ্রোতা-দর্শকদের চাপে হেমাঙ্গ বিশ্বাসের গানের আকষর্ণে নাটকের প্রদর্শনী বাতিল করতে হয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি তাকে ভূপেন হাজারিকার গান গাইবার জন্য বেশ ক’বার অনুরোধ করলেও তিনি মাথা ঝাঁকিয়ে গাইবেন না জানিয়েছিলেন। কেন তিনি ভূপেনের গান করেননি- তখন বুঝিনি কিন্তু পরে বুঝেছিলাম। তারা একত্রে ভারতীয় গণনাট্য সংঘে ছিলেন। এমনকি ১৯৬০ সালে আসামে ভ্রাতৃঘাতী দাঙ্গার সময় একত্রে আসামজুড়ে শান্তি ও সম্প্র্রীতি অভিযানে দ্বৈত কণ্ঠে গান করেছেন। তাদের যৌথ রচনার গান দাঙ্গা বিধ্বস্ত মানুষের হৃদয়ে আশার সঞ্চার করেছিল। অথচ সেই ভূপেন হাজারিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া এবং পিএইচডি ডিগ্রি গ্রহণসহ নানা সুবিধাবাদিতায় দুজনের মধ্যে বিস্তর দূরত্বের সৃষ্টি হয়েছিল। শেষ পরিণতিতে ভূপেন হাজারিকা লোকসভা নির্বাচনে হিন্দু মৌলবাদী দল বিজেপির প্রার্থী হয়ে আসামের গৌহাটি আসন থেকে নির্বাচন করে হেরেছিলেন। মতাদর্শে এবং অঙ্গিকারে অবিচল হেমাঙ্গ বিশ্বাস সঙ্গত কারণেই আমার অনুরোধ সেদিন উপেক্ষা করেছিলেন।
কলকাতার নাট্যদল নান্দীকারের নাট্যোৎসবে আমন্ত্রিত ঢাকা থিয়েটার কীর্ত্তনখোলা নাটক নিয়ে কলকাতায় গিয়েছিল। রবীন্দ্র সদনে কীর্ত্তনখোলা নাটকের প্রদর্শনীর দিন মিলনায়তন ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। সেই দর্শকদের একজন ছিলেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস। নাটক শেষে পরিতৃপ্ত হেমাঙ্গ বিশ্বাস ঢাকা থিয়েটারের সবার উদ্দেশে বলেছিলেন- ‘ভায়েরা গঙ্গার ঘোলা জলে বুড়িগঙ্গার স্বচ্ছ জল ঢেলে দিয়ে গেলি তোরা।’
রাষ্ট্র বদলের অভিপ্রায়ে সারাটি জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন। সেই রাষ্ট্র তাকে নিপীড়ন করেছে- কারারুদ্ধ করেছে সেই রাষ্ট্র তাকে স্বীকৃতি দেবে- সৃজনশীলতার মর্যাদা দেবে, তেমন ভাবনা নিতান্তই অবান্তর। প্রচলিত অর্থে হেমাঙ্গ বিশ্বাস অনেকের মতো জনপ্রিয় হয়তো ছিলেন না। মিডিয়ার প্রচারণা পাননি। সেটা তার লক্ষ্যও ছিল না। বিদ্যমান ব্যবস্থা ভাঙাই ছিল তার স্বপ্ন এবং আকাক্সক্ষা। সঙ্গত কারণে রাষ্ট্রের প্রচার যন্ত্র তাকে এক রকম বর্জনই করেছিল। প্রচলিত পুঁজিতান্ত্রিক ব্যবস্থার কাছে আত্মসমর্পণ করেননি। তাই প্রচলিত ব্যবস্থা তাকে স্বীকৃতি দেয়নি এবং দেয়ার কথাও নয়। এ বিষয়ে তিনি যথার্থ সচেতন ছিলেন। হালকা-পাতলা গড়নের মানুষটির মেরুদণ্ড ছিল অসম্ভব দৃঢ় এবং শক্ত। আত্মসমর্পণের মানসিকতা ছিল না। গণনাট্য সংঘের অনেকে ভোল পাল্টে ব্যক্তিগত প্রচার-প্রতিষ্ঠায় কলকাতা-মুম্বাই ছোটাছুটি করলেও হেমাঙ্গ বিশ্বাস নীতি-আদর্শ বিসর্জন দিয়ে সেটি করেননি। আমৃত্যু অটল ছিলেন মতাদর্শে-অঙ্গিকারে। তাই কারও সঙ্গে তার তুলনা চলে না। তিনি গান রচনা করেছেন, সুর দিয়েছেন এবং গেয়েছেনও। সব কিছুর মূলে ছিল রাজনীতি। সমাজ বিপ্লবের রাজনীতি। সেই রাজনৈতিক মতাদর্শ আমৃত্যু ধারণ করেছেন। বিচ্যুত হয়ে প্রচলিত প্রতিষ্ঠার পিছু ছোটেননি। সেখানেই তিনি অনন্য এবং দৃষ্টান্তস্বরূপ। তার নীতিনিষ্ঠ বর্ণাঢ্য জীবনাচার আমাদের জন্য শিক্ষার এবং প্রেরণারও। তার স্মৃতির প্রতি অকুণ্ঠ শ্রদ্ধাঞ্জলি।