
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০৪:৪৯ এএম

নবনী আহমেদ
প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
‘দাস পার্টির খোঁজে’- মুক্তিযুদ্ধের এক মৌলিক আখ্যান। যেখানে মুখোমুখি হতে হয় এক অজানা ইতিহাসের, যেখানে থমকে যেতে হয় কিছু নগ্ন সত্য উন্মোচনের তীব্রতায়। দাস পার্টি বৃহত্তর সিলেটের ৫নং সেক্টরের সাব-সেক্টর টেকেরঘাটের একটি গেরিলা দল। দলটির প্রধান জগৎজ্যোতি দাস নামের মাত্র ২২ বছরের এক তরুণ। এই দাস পার্টিতে সদ্য কিশোর যোদ্ধা যেমন ছিল, তেমনি ছিল মধ্যবয়সী যোদ্ধাও। ছিল অশিক্ষিত খেটে খাওয়া কৃষক, সেই সঙ্গে শিক্ষিত তরুণেরাও। এ যেন এক খাঁটি গণযোদ্ধাদের সম্মেলন। যুদ্ধকালীন দাস পার্টি তাদের অসীম দক্ষতা, সাহসিকতা ও ক্ষিপ্রতায় হাওর এলাকার পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও দেশীয় দালাল, রাজাকারদের পরাস্ত করেছিল। দলনেতা জগৎজ্যোতি দুর্ধর্ষ এক যুবক। যার বুকের মাঝে ভয়ের কোনো ঠাই ছিল না বিন্দুমাত্র। মানুষটার পুরো কলিজায় ছিল গনগনে সাহসের খনি। আর তাইতো যুদ্ধের ময়দানে মাথায় বুলেট বিদ্ধ হওয়ার পরও এই তরুণ উচ্চারণ করে দুই শব্দের একটিই বাক্য ‘আমি যাইগ্যা’ কী অবর্ণনীয় সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ এই ক্ষুদ্র বাক্যটি! যেন বাড়ি ছেড়ে বেড়াতে যাচ্ছেন কোনো মোহনীয় স্থানে। মৃত্যুর আগমুহূর্ত পর্যন্ত বুকের রক্ত নিংড়ে লড়ে যাওয়া এই বীরযোদ্ধাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় খেতাব দেয়ার ঘোষণা দেয়া হলেও পরবর্তীকালে যার জুটেছিল তৃতীয় শ্রেণীর খেতাব বীর বিক্রম। কিন্তু কেন এই অসামঞ্জস্যতা তার উত্তর মেলেনি স্বাধীনতার এত বছর পরও। হাসান মোরশেদ তার ‘দাস পার্টির খোঁজে’ বইটিতে এমন অনেক ঘটনার সত্যতা তুলে ধরেছেন অসীম সাহসিকতায়। বইটির কাজ করার জন্য স্বশরীরে ঘুরে দেখেছেন দাস পার্টির সব যুদ্ধস্থান, কথা বলেছেন দাস পার্টির জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে। জগৎজ্যোতির সহযোদ্ধা ইলিয়াসের স্মৃতিচারণের মাধ্যমে জেনেছেন তাদের যুদ্ধের বিবরণ। জানা-অজানা সব যুদ্ধগাথা। পরবর্তীকালে সে সব লিপিবদ্ধ হয়েছে বইটির পাতায় পাতায়। অত্যন্ত পরিশ্রমের এবং সাহসিকতার এই কাজটি করতে গিয়ে নিজেও জড়িয়েছেন অপ্রীতিকর ঝামেলায়। লেখকের প্রতি একজন পাঠক এবং বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে রইল আন্তরিক ধন্যবাদ এবং অজস্র শ্রদ্ধা। লেখকের মাধ্যমে দাস পার্টির ইতিবৃত্ত জানতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে যাওয়ার মতো আমরা জানতে পারি বেশকিছু মর্মান্তিক গণহত্যা এবং নির্মমতার ইতিহাস। যা এতদিন ছিল কালের গহ্বরে হারানো, সবার অজান্তে চাপা পড়ে ছিল প্রচলিত ইতিহাসের গভীরে। আমরা জানতে পারি, একটানে কানের লতি ছেঁড়া বীরাঙ্গনা প্রমীলা দাসের কথা। জানতে পারি, ৪৪ বছর যাবৎ শরীরে আটকে থাকা বুলেট নিয়েই জীবনযাপন করা ব্রজেন্দ্র দাসের কথা। শুধু তাই নয়, যে মানুষগুলো বুকের তাজা রক্ত, সম্ভ্রম ও ত্যাগের বিনিময়ে এনে দিয়েছে আমাদের স্বাধীনতা, আজ স্বাধীন দেশে তাদের বেড়ার ঘর, দু’মুঠো অন্নের জন্য অমানুষিক পরিশ্রম এবং দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর কষাঘাতে স্তব্ধ হয়ে ভাবতে হয়- এ দায় কার? আমরা অকৃজ্ঞ, আমরা বেঈমান। জাতির বীরযোদ্ধারা যেখানে প্রাপ্য সম্মান পাননি, সেখানে সেই জাতি কীভাবে সম্মানের জীবন পাবে? ভয়াবহ সে সব গণহত্যার স্থানে গড়ে উঠেনি কোনো স্মৃতিচিহ্ন। যাও গড়ে উঠেছে, সে সবের নেই কোনো সংরক্ষণ। সেখানে আজ বসে সবজির দোকান! হায় স্বাধীনতার এ কী অবমাননা! যাদের যা প্রাপ্য তা দিতে পারিনি বরং ক্ষমতায় এসেছে সে সব দালালেরা যারা চায়নি আমাদের স্বাধীনতা! ঘাতক রাজাকার এবং তাদের উত্তরসূরিরা যখন ক্ষমতার জোরে বীরাঙ্গনা কুলসুম বিবিকে ‘নটি বেটি’ বলে ডাকে, মুক্তিযোদ্ধা নিরানন্দ দাসকে জুতাপেটা করে তখন তা পড়তে পড়তে শরীর শিউরে ওঠে। বীরযোদ্ধা সুকুমার দাশকে যখন মিথ্যে ডাকাতির মামলায় নিজের রক্তে স্বাধীন করা দেশের মাটি ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয় অন্য দেশে তখন ধিক্কার দিতে হয় নিজেকেই! লজ্জায়, ঘৃণায় প্রশ্ন জাগে এই তবে আমাদের মুক্তি, আমাদের স্বাধীনতা? বইটি পড়ার সময় মাথায় আগুনের দপদপানি অনুভব করতে পারি। মুক্তিযুদ্ধের এক অজানা ইতিহাসের অকাট্য দলিল এই বই ‘দাস পার্টির খোঁজে’। আজকের প্রজšে§র একজন হিসেবে যা পড়ার পর অবাক হয়ে ভাবি কতটুকু জানি আমরা ’৭১কে? সহযোদ্ধা ইলিয়াসের বুকে গুলি লাগার পরে দলনেতা জগৎজ্যোতি দাস বলেছিলেন, ‘বাঁচবি?’ ইলিয়াসের উত্তর ছিল, ‘বাঁচতে পারি’ সেই জীবন মৃত্যুর অন্তিম পর্যায়েও জগৎজ্যোতির আদেশ ছিল, ‘তাহলে যুদ্ধ কর’। বইটি পড়ার পর আজ স্বাধীন দেশে বসেও আমার বলতে ইচ্ছে করে, যদি বাঁচতে চাস তাহলে যুদ্ধ কর! এই যুদ্ধ অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, দেশকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে যত অন্তরায়, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ! হতে পারে তা হাসান মোরশেদের মতো কলমযুদ্ধ। যে যুদ্ধের প্রাপ্তি হিসেবে পাঠক পেয়েছে বই ‘দাস পার্টির খোঁজে’। বইটির পাতা, বাইন্ডিং সবকিছু এত সুন্দর যে, প্রকাশনী ঐতিহ্যের প্রতি এক আলাদা ভালোলাগা তৈরি হয়। সর্বোপরি দেশের প্রত্যেক সচেতন নাগরিকের দায়িত্ব অকাট সত্যতা মেলে ধরা এই বইটি পড়া।
দাস পার্টির খোঁজে হাসান মোরশেদ প্রকাশনী ঐতিহ্য
মূল্য ৩৫০ টাকা পৃষ্ঠা ১৯৮