
প্রিন্ট: ২৮ মার্চ ২০২৫, ১১:৩৫ পিএম
শোক দিবসের আলোচনায় ১৪ দলের নেতারা
শাজাহান খান আন্দোলনকে উসকে দিয়েছেন
আন্দোলন সফলের পর সড়কে থাকলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হতে পারে : নাসিম

যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
আরও পড়ুন
পরিবহন সেক্টরের অরাজকতা ও নৈরাজ্য নিয়ে ক্ষুব্ধ মনোভাব ব্যক্ত করলেন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের নেতারা। নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের আচরণে ক্ষোভ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, তিনি আন্দোলনকে উসকে দিয়েছেন। তার কারণেই কোমলমতি ছেলেমেয়েরা রাজপথে নেমেছে। পরিবহনে বিশৃঙ্খলতার জন্যও নৌমন্ত্রীকে দায়ী করে নেতারা বলেছেন, পরিবহন সেক্টর একজন ব্যক্তির কাছে এভাবে জিম্মি হয়ে থাকলে যেকোনো সময় সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে। এর সুরাহা হওয়া উচিত। ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলেও জানান জোটের শরিক নেতারা।
শুক্রবার বিকালে আওয়ামী লীগ সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নতুন রাজনৈতিক কার্যালয়ে কেন্দ্রীয় ১৪ দলের সভা অনুষ্ঠিত হয়। ছাত্রছাত্রীদের চলমান আন্দোলনে করণীয় ঠিক করতেই এ সভার আয়োজন করা হয়। জোটের রুদ্ধদ্বার বৈঠকে শরিক দলের নেতারা আলোচনা করেন। বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে। বৈঠকে আগামী ১৫ আগস্ট সকাল ১০টায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে শোক দিবস উপলক্ষে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ১৪ দলের পক্ষ থেকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সিদ্ধান্ত হয়। এছাড়া ১৭ আগস্ট শোক দিবসের আলোচনা সভার সিদ্ধান্ত হয়।
বৈঠকে উপস্থিত ১৪ দলের একাধিক নেতা যুগান্তরকে জানান, চলমান আন্দোলনে আমরা সহমত পোষণ করেছি। তাদের দাবিগুলোকে ন্যায্য হিসেবে উল্লেখ করেছি। বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। তবে এটি আর বেশি বাড়তে দেয়া ঠিক হবে না বলেও আলোচনায় ওঠে এসেছে। ছাত্রদের এ আন্দোলন বিএনপি-জামায়াত উসকে দিতে পারে। এ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র হচ্ছে। কোমলমতি ছাত্রদের বুঝিয়ে কিভাবে ঘরমুখী করা যায়, সেটি নিয়েও কথা হয়েছে।
সূত্র জানায়, দেশে পরিবহন সেক্টরের অঘোষিত ধর্মঘট নিয়ে নৌমন্ত্রী শাজাহান খানের তীব্র সমালোচনা করেন অনেকে। আন্দোলন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে শরিক দলের নেতারা বলেন, এত ছাত্র সমন্বয় হচ্ছে কিভাবে? এর পেছনে-সামনে কারা আছে তা খতিয়ে দেখা দরকার। একই সঙ্গে একই কায়দায় সারা দেশে আন্দোলন কেন, তা নিয়েও মুখ খোলেন কয়েকজন। সরকারের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র কিনা- মন্তব্য করে বৈঠকে একাধিক নেতা বলেন, কোটা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িতরা এখানে কলকাঠি নাড়ছে কিনা- তা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর খতিয়ে দেখা দরকার। বিএনপি-জামায়াত এ নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র করতে পারে বলেও মত দেন তারা। বিষয়টি নিয়ে ১৪ দলের নেতাদের সতর্ক থাকতে বলেন মোহাম্মদ নাসিম। বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে ১৪ দলের মুখপাত্র ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের লক্ষ্য অর্জনের পরেও তারা রাস্তায় থাকলে তা লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে যাবে। তিনি বলেন, অত্যন্ত দুঃখজনকভাবে আমাদের সন্তানের মতো দুই শিক্ষার্থী সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে। অনেকে আহত হয়েছে। আমরা ১৪ দলের পক্ষ থেকে গভীর শোক জানাচ্ছি। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি। এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি নৃশংস হত্যাকাণ্ড- দাবি করে মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ১৪ দল মনে করে এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের দ্রুতবিচার নিশ্চিত করতে হবে। ইতিমধ্যে মানুষ দেখেছেন যে কিশোর ছাত্রছাত্রীরা রাস্তায় নেমেছে এ সড়ক দুর্ঘটনার বিরুদ্ধে, হত্যার বিচার দাবিতে।
স্বতঃস্ফূর্ত এ আন্দোলনে কিশোরদের মধ্যে যে ক্ষোভ প্রকাশিত হয়েছে, তাদের প্রতি আমরা সম্মান জানাই, শ্রদ্ধা জানাই। তাদের প্রতি সম্পূর্ণ সহানুভূতি আছে ১৪ দলের। কারণ দীর্ঘ দিনের এ অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে তারা যে প্রতিবাদ করেছে তা অবশ্যই যুক্তিসঙ্গত। ঘটনায় জড়িতদের বিচার হওয়া উচিত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, যে লক্ষ্যে চার দিন ধরে কিশোররা আন্দোলন করেছে, এ দেশের মানুষ সার্বিকভাবে সমর্থন করেছে। এখন লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে। মনে রাখতে হবে যখন লক্ষ্য অর্জিত হয়ে যায় তখন ক্ষ্যান্ত দিতে হয়। না হলে লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
আন্দোলনকারী ছাত্রছাত্রীদের ঘরে ফেরার আহ্বান জানিয়ে নাসিম বলেন, আমরা ১৪ দলের পক্ষ থেকে ঘরে ফিরতে অনুরোধ করব। আমাদের ছেলেমেয়েরা সবাই যেন এখন ঘরে ফিরে যায়, ক্লাসে ফিরে যায় এবং অভিভাবকদেরও সেই অনুরোধ করব আমরা। প্রধানমন্ত্রী অনুরোধ করেছেন, নিহত দুই শিক্ষার্থীর পরিবারের পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে তারা যেন ঘরে ফিরে যায়। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ পেয়ে শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি দ্রুত মেনে নেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও যথাযথ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন পরিবহন আইন পরবর্তী মন্ত্রিসভায় পাস করা হবে। আমরা বিশ্বাস করি দেশে মমতাময়ী প্রধানমন্ত্রী আছেন, অবশ্যই অন্য সব সমস্যার মতো এ সমস্যারও দ্রুত সমাধান হবে।
১৪ দলের মুখপাত্র বলেন, আমাদের স্বীকার করতে লজ্জা নেই, দ্বিধা নেই। আমাদের সরকারের আমলে কিছু কিছু অব্যবস্থাপনা ছিল, আর এটা দীর্ঘদিনের। মোহাম্মদ নাসিম বলেন, বাম বলেন আর ডান বলেন এই শ্রমিকদের নেতৃত্বে যারা আছে তারা একই সঙ্গে কাজ করে। কয়েক যুগ ধরে তারা পরিবহন সেক্টরকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে, মানুষ জিম্মি হয়ে গেছে। এ ব্যাপারটি নিয়ে অনেকবার আলোচনা হয়েছে।
নৌমন্ত্রী পদত্যাগ করবেন কিনা- জানতে চাইলে ১৪ দলের মুখপাত্র বলেন, ৯ দফার মধ্যে একটি দাবি ছিল নৌমন্ত্রীর ক্ষমা চাইতে হবে। তিনি দুঃখ প্রকাশ করেছেন, ক্ষমা চেয়েছেন। আন্দোলনের উদ্দেশ্য এটা ছিল না। কারণ পদত্যাগে সমাধান হবে না।
সাম্যবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন- আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক আবদুস সোবহান গোলাপ, জাসদ একাংশের শরীফ নূরুল আম্বিয়া, ওয়ার্কার্স পার্টির আনিসুর রহমান মল্লিক, কামরুল আহসান খান, কমিউনিস্ট কেন্দ্রের ওয়াজেদুল ইসলাম, গণতন্ত্রী পার্টির শাহাদাত হোসেন, বাসদের রেজাউর রশিদ খান, গণআজাদী লীগের এস কে শিকদার, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিলীপ রায়, বিএমএ মহাসচিব মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন প্রমুখ।