বিএনপিতে দুই ভাই, আ’লীগে জট ধরে রাখতে চায় জাতীয় পার্টি

আতাউল করিম খোকন, অমিত রায় ও মাহ্বুবুল আলম খান, মুক্তাগাছা থেকে
প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মুক্তাগাছা উপজেলা নিয়ে ময়মনসিংহ-৫ আসনে ডজনখানেক প্রার্থী মনোনয়ন যুদ্ধে মাঠে। এলাকাটি কোনো একক দলের ঘাঁটি না হলেও নব্বইয়ের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেশিরভাগ সময় জয়লাভ করে বিএনপি। জাতীয় পার্টি এবং আওয়ামী লীগও একবার কয়ে জয়ের স্বাদ পায়। দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৮ সালে এ আসনে জয়লাভ করেন যুবলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সদস্য ও জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি কেএম খালিদ বাবু। ২০১৪ সালের নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি হন জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় যুগ্ম-মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমেদ মুক্তি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও জাতীয় পার্টি আসনটি চাইছে। এ আসনে জাতীয় পার্টির একমাত্র প্রার্থী হচ্ছেন বর্তমান এমপি সালাহউদ্দিন আহমেদ। তবে স্থানীয় আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে আসনটি ছাড় দিতে নারাজ। এরই মধ্যে আওয়ামী লীগের আট প্রার্থী মাঠে সক্রিয়। নানামুখী চাপে থাকা বিএনপির প্রার্থী দু’জন। এদের একজন হচ্ছেন দু’বারের নির্বাচিত এমপি সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি একেএম মোশাররফ হোসেন ও তার বৈমাত্রেয় ছোট ভাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি জাকির হোসেন বাবলু। এ নিয়ে দুই ভাইয়ের মধ্যে চলছে মনস্তাত্ত্বিক লড়াই।
নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর ’৯১ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির কেরামত আলী তালুকদার, ১৯৯৬ সালে জয়লাভ করেন বিএনপির একেএম মোশাররফ হোসেন এবং তবে ১৯৯৬ সালের বিতর্কিত ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির আবু রেজা ফজলুল হক বাবলু। পরের দফায় ২০০১ সালেও বিজয়ী হন একেএম মোশাররফ হোসেন।
আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- সাবেক ছাত্রলীগ, যুবলীগ, জেলা আওয়ামী লীগ নেতা এবং সাবেক এমপি ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কেএম খালিদ বাবু, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ও মুক্তাগাছার সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট বদর উদ্দিন আহম্মেদ, সাবেক উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক পৌর মেয়র আবদুল হাই আকন্দ, জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক তথ্য বিষয়ক সম্পাদক ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আহসান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক এমপি মরহুম শামছুল হকের পুত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শাতিল মো. তারেক, কৃষিবিদ ড. নজরুল ইসলাম খোকন, সাবেক আইনমন্ত্রী আবদুল মতিন খসরুর সহধর্মিণী সেলিম সোবহান খসরু, সাবেক যুগ্ম সচিব ক্যাপ্টেন (অব.) জামিলুর রহমান।
আগামী নির্বাচন নিয়ে আলাপকালে বর্তমান এমপি ও জাতীয় পার্টির নেতা জানান, ঝিমিয়ে পড়া জাতীয় পার্টিকে সংগঠিত করার পাশাপাশি তৃণমূল নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করেছি। প্রতিটি ওয়ার্ড ও ইউনিয়নে জাপার অবস্থান বর্তমানে খুবই শক্তিশালী। তিনি দাবি করেন, এমপি হওয়ার পর এলাকায় সবার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখে উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছি। মুক্তাগাছায় ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে এবং জাপা এখানে যে কোনো সময়ের চেয়ে সুসংগঠিত। তিনি বলেন, মুক্তাগাছার রাস্তাঘাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অসংখ্য উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। ফলে জেলা পরিষদের সদস্য নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে জাপার প্রার্থী মুক্তাগাছায় নির্বাচিত হন তিনি। মুক্তাগাছাবাসীর চাহিদা অনুযায়ী জাপার জোটগত বা দলগত নির্বাচনে তিনি প্রার্থী হবেন বলেও জানান। আগামী নির্বাচনে জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়ার বিরোধিতা করে সাবেক এমপি কেএম খালিদ বাবু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। তিনি যুগান্তরকে জানান, এমপি থাকার সময় মুক্তাগাছার জনগণের পাশে ছিলাম, এখনও আছি। এলাকায় ব্যাপক উন্নয়ন করেছি। দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছি। নৌকা প্রতীক পেলে আসনটি অবশ্যই উপহার দিতে পারব। মাঠে আছেন উপজেলা আ’লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আ. হাই আকন্দ। গত পৌর নির্বাচনে দলীয় কোন্দলের কারণে মেয়র নির্বাচনে হেরে যান তিনি। আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার ব্যাপারে প্রত্যাশা ব্যক্ত করে আবদুুল হাই জানান, বর্তমান উপজেলা আ’লীগ দুই ধারায় বিভক্ত। তিনি দলের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে বিজয়ী হতে চান। তিনি বলেন, জননেত্রী যাকে মনোনয়ন দেবেন তার পক্ষেই কাজ করবেন। অ্যাডভোকেট বদর উদ্দিন আহম্মেদ মনোনয়ন সম্পর্কে যুগান্তরকে বলেন, সংগঠন ও জনগণের সঙ্গে তার দীর্ঘ ৪০ বছরের সম্পর্ক। উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালনের পর আমার ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল। দলের বাইরেও আমার ভোট রয়েছে। বিএনপির সঙ্গে ভোটের প্রতিযোগিতায় নামতে মুক্তাগাছার জনগণ আমাকে চান। মনোনয়ন পেলে বিজয় ছিনিয়ে আনব। কথা হয় আরেক মনোনয়ন প্রত্যাশী আহসান মো. আজাদের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, তাকে মনোনয়ন দেয়া হলে ভোটের রাজনীতিতে মুক্তাগাছার পশ্চিমাঞ্চলের ৬টি ইউনিয়ন নিয়ে আঞ্চলিকতার ব্যাপক প্রভাব পড়বে। যার ফলে দলীয় ভোটের পাশাপাশি আঞ্চলিক ভোটে তার পক্ষে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দেয়া খুবই সহজ হবে। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে দলের একজন পরীক্ষিত ত্যাগী নেতা হিসেবে এলাকায় মানুষ পাশে আছেন। আরেক সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক এমপি মরহুম অ্যাডভোকেট শামছুল হকের পুত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক শাতিল মো. তারেক বলেন,বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর খুনি মোস্তাকের ডাকে সাড়া না দিয়ে যারা রাস্তায় নেমে আসেন তার মধ্যে আমার পিতা মরহুম অ্যাডভোকেট শামসুল হক ছিলেন অন্যতম। ছাত্র রাজনীতি থেকে উঠে আসা এ নেতা বলেন, দলের প্রধান শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে এলাকায় আন্দোলন জোরালো করায় একের পর এক মামলা দিয়ে আমাকে কারাগারে পাঠায় জামায়াত-বিএনপি জোট সরকার। নির্বাচন সামনে রেখে এলাকায় গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি।
কৃষিবিদ নজরুল ইসলাম খোকন বলেন, সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা আগামী নির্বাচনে ময়মনসিংহ-৫ আসন থেকে একজন পরিচ্ছন্ন রাজনীতিক, সৎ, যোগ্য, শিক্ষিত ও দুর্নীতিমুক্ত নেতা তাদের এমপি হোক। যিনি সংসদে গিয়ে মুক্তাগাছার মাটি ও মানুষের কথা বলবেন। আমি মনে করি, সেদিন থেকে আমি এগিয়ে রয়েছি।
ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রথম মুসলমান জজ শাহ আবদুস সোবহানের কন্যা সেলিনা সোবহান খসরুর কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। আমার স্বামীর সঙ্গে রাজনীতির মাঠে ঘুরে বেড়িয়েছি। সেই থেকেই তৃণমূলে গণসংযোগ ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছি। নৌকা প্রতীক পেলে জয় নিয়ে আশাবাদী। সাবেক যুগ্ম সচিব ক্যাপ্টেন (অব.) জামিলুর রহমান খান আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানান। তিনি মাঝেমধ্যে ছুটে আসছেন মুক্তাগাছা। গণসংযোগের পাশাপাশি দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন।
মামলা-হামলায় কাবু বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার বাইরে। আগামী নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে চাইছে দলটি। এ লক্ষ্যে কাজ শুরু করে দিয়েছেন বিএনপির স্থানীয় নেতারা। দলের মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে একেএম মোশাররফ হোসেন ময়মনসিংহ-৪ সদর আসন থেকে প্রার্থী হয়ে হেরে যান। এবার তিনি ময়মনসিংহ-৫ থেকে নির্বাচন করবেন। তিনি যুগান্তরকে বলেন, আমি মুক্তাগাছার মানুষ। এ এলাকায়ই আমার বেড়ে ওঠা। সর্বস্তরে আমার গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। জীবনে শেষবারের মতো ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে দেশনেত্রী খালেদা জিয়াকে আসনটি উপহার দিতে চাই। অপরদিকে ২০০৮ সালের নির্বাচনে মোশাররফ হোসেনের বৈমাত্রেয় ছোট ভাই উপজেলা বিএনপির সভাপতি বিশিষ্ট ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বাবলু বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কেএম খালিদ বাবুর কাছে পরাজিত হন। এরপর ২০১৪ সালের পর মামলা-হামলায় বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়লে দীর্ঘদিন জনসংযোগে থেকে বিরত থাকলেও সম্প্রতি জনসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন তিনি। জাকির হোসেন বাবলু জানান, শাসক দলের হামলা-মামলা ও নানা বাধা উপেক্ষ করে দলকে সুসংগঠিত করেছি, সংঘবদ্ধ রেখেছি। দলীয় কর্মকাণ্ড চালানোর পাশাপাশি তৃণমূলে গণসংযোগ অব্যাহত রেখেছি। দলীয় মনোনয়ন পেলে আসনটি পুনরুদ্ধার করতে পারব ইনশাআল্লাহ।