
প্রিন্ট: ০৬ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৩৩ পিএম
সয়াবিন তেলে আরও ১০ শতাংশ কমল
ভ্যাট ছাড়ে লাভবান আমদানিকারকরা
ইতোমধ্যেই উৎপাদন ও পাইকারি পর্যায়ে ভ্যাট ২০ শতাংশ কমানো হয়েছে * এলসি মার্জিন প্রত্যাহার ও কমিশন হ্রাস * সরকারি ব্যাংক থেকে কম দামে ডলারের জোগান

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
আসন্ন রমজান ও ঈদুলফিতর উপলক্ষ্যে সয়াবিন তেলের দাম সহনীয় রাখতে এবার আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে। পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে এ সুবিধা ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে।
তবে আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট বহাল রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বুধবার একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছে। এর আগে গত সোমবার উৎপাদন পর্যায়ে ১৫ শতাংশ এবং বিপণন পর্যায়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট প্রত্যাহার করা হয়েছে।
ওই সুবিধাও ৩০ জুন পর্যন্ত বহাল থাকবে। এতে লাভবান হবেন আমদানিকারকরাই। কারণ এর সুফল আসন্ন রোজার মধ্যে ভোক্তারা পাবেন না। এই সুবিধায় বন্দর থেকে ছাড় করা সয়াবিন পরিশোধন হয়ে ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে কমপক্ষে দুই থেকে তিন মাস সময় লাগতে পারে।
এছাড়া এখন যেসব সয়াবিনবাহী জাহাজ বন্দরে ভিড়ছে, সেগুলোর এলসি খোলা হয়েছে অন্তত দুই থেকে তিন মাস আগে। ওই সময়ে প্রতি টন সয়াবিনের দাম ছিল ১১০০ থেকে ১২০০ ডলার। তখন জ্বালানি তেলের দামও ছিল কম। এমনকি জাহাজ ভাড়াও এখনকার মতো এত বেশি ছিল না।
ফলে এগুলোর আমদানি খরচ কম ছিল। গত ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝিতে আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিনের দাম টনপ্রতি দেড় হাজার ডলার ছাড়িয়ে গেলে আমাদানিকারকরা স্থানীয় বাজারেও তেলের দাম লিটারপ্রতি ১২ টাকা বাড়ানোর জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কাছে দাবি জানায়।
কিন্তু তা নাকচ করে দেয়। এরপরই বাজার থেকে সয়াবিন তেল একরকম উদাও হয়ে যায়। আর যেগুলো বাজারে ছিল, সেগুলোর দাম ছিল অসহনীয়। অথচ এসব তেলের এলসি করা হয়েছিল অনেক কম দামে। এক্ষেত্রে ভোক্তার কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আমদানিকারকদের পকেটে গেছে।
পরিশোধিত ও অপরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানিতে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপিত ছিল। এখন ১০ শতাংশ প্রত্যাহার করায় বাকি ৫ শতাংশ বহাল থাকল। আগে পরিশোধিত সয়াবিন তেল আমদানি ও বিপণনে ২০ শতাংশ ভ্যাট ছিল।
এর মধ্যে আমদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ ও বিপণন পর্যায়ে ৫ শতাংশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। এখন আমদানি পর্যায়ে শুধু ৫ শতাংশ দিতে হবে। অপরিশোধিত তেল আমদানিতে ৩৫ শতাংশ ভ্যাট ছিল। এর মধ্যে ৩০ শতাংশ কমানো হয়েছে। শুধু আমদানি পর্যায়ে ৫ শতাংশ বহাল রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আমাদানি পর্যায়ে ১০ শতাংশ কমানোয় বর্তমান হিসাবে লিটারপ্রতি ১০-১২ টাকা খরচ কমতে পারে। এর আগে উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে ২০ শতাংশ কমানোর ফলে ২ থেকে ৩ টাকা প্রতি লিটারে কমতে পারে। দুই পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর ফলে প্রতি লিটারে খরচ ১২ থেকে ১৫ টাকা কমতে পারে।
এদিকে সূত্র জানায়, আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম ও ভ্যাট কমানোর পরিপ্রেক্ষিতে এর দাম কেমন কমতে পারে, সে বিষয়ে পর্যালোচনা করে বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন একটি কাঠামো তৈরি করবে। এর আলোকে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় তেলের দামের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
গত আগস্ট থেকেই আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়তে থাকে। করোনার প্রকোপ কমার পর হঠাৎ করে চাহিদা বৃদ্ধি ও সরবরাহ সংকটের কারণে এর দাম আরও বাড়তে থাকে। সর্বশেষ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে এর দামও তৃতীয় দফায় বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজারে সয়াবিন তেলের দাম বাড়ার কারণে দেশের বাজারেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। তেলের দাম সহনীয় রাখতেই সরকার ভ্যাট প্রত্যাহারসহ অন্যান্য নীতিসহায়তা প্রদান করেছে।
জানা যায়, দেশের চাহিদার বেশির ভাগই আসে অপরিশোধিত আকারে। এগুলো স্থানীয় কারখানায় পরিশোধন করে বাজারজাত করা হয়। দুই দফায় সয়াবিন তেলের ওপর ভ্যাট কমানোর ফলে এর প্রভাব বাজারে এখনই পড়বে না।
আরও বেশ সময় লাগবে। তবে সরকার দাম না বাড়ানোর কারণে সয়াবিন তেল সরকার নির্ধারিত দরের মধ্যে নিয়ে আসার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা বাজারে অভিযান পরিচালনা করছে।
সরকার ৬ ফেব্রুয়ারি বৈঠক করে বোতলজাত সয়াবিন প্রতি লিটার ১৬৮ টাকা, খোলা ১৪৩ টাকা ও পাম অয়েল ১৩৩ টাকা লিটার নির্ধারণ করে। ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে এই দর কার্যকর হলেও বাজারে এই দামে তেল পাওয়া যায়নি।
প্রতি লিটারের দাম পর্যায়ক্রমে বেড়ে সর্বোচ্চ ২০৫ টাকায় উঠেছিল। ভ্যাট প্রত্যাহারের পর এখন ধীরে ধীরে কমছে। মিল মালিকরা মনে করেন, ভ্যাট কমানোর ফলে বাজারে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
এ বিষয়ে মেঘনা গ্রুপের জ্যেষ্ঠ সহকারী মহাব্যবস্থাপক তাসলিম শাহরিয়ার বলেন, এনবিআরের নতুন প্রজ্ঞাপনের ফলে বাজারে তেলের দাম কমবে।
তবে ইতোমধ্যেই যেসব চালান ইন-বন্ড করা হয়েছে, সেগুলোর ভ্যাট-ট্যাক্স পরিশোধ করা হয়েছে বিধায় দাম খুব বেশি কমার সম্ভাবনা নেই। খালাস পর্যায়ে যেসব অপরিশোধিত তেল রয়েছে, সেগুলোর দামে প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, দামে প্রভাব ফেলতে চাইলে যেসব অপরিশোধিত তেলের চালান ইন-বন্ড করে কারখানা পরিশোধনের জন্য পাঠানো হয়েছে, সেগুলোয় ১০ শতাংশ ছাড় দেওয়া উচিত ছিল। তাহলে বাজারে দ্রুত প্রভাব পড়ত তেলের দামে।
ভ্যাট কমানোয় বাজারে তেলের দামে কেমন প্রভাব পড়তে পারে-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটি নির্ভর করবে কত দামে ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়েছে তার ওপর।
যেমন বর্তমানে টনপ্রতি এক হাজার ৮০০ ডলারের বেশি দরে অপরিশোধিত তেল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে। কেউ আবার এক হাজার ৭০০ ডলারে খুলেছে। এক্ষেত্রে দুই চালানের ভ্যাট ছাড় সুবিধা দুই রকম হবে। তবে ১০ শতাংশ কমানোয় বর্তমান হিসাবে লিটারপ্রতি ১০-১২ টাকা খরচ কমতে পারে।
উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর ফলে কারখানা থেকে পরিশোধন হয়ে যেসব তেল বাজারে আসছে সেগুলোর বিপরীতে ২০ শতাংশ ভ্যাট দিতে হবে না। এর মধ্যে ১৫ শতাংশ ভ্যাটের সুফল ভোগ করবে আমদানিকারকরা। বাকি ৫ শতাংশ ভোগ করবে পাইকারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা। এসব তেল বাজারে আসতে রোজার মাঝামাঝি পর্যন্ত চলে আসবে।
আমদানি পর্যায়ে ভ্যাট কমানোর ফলে এখন যেসব সয়াবিন তেল বন্দর থেকে খালাস হবে, সেগুলোর বিপরীতে এই সুবিধা পাওয়া যাবে। বন্দর থেকে খালাস হয়ে পরিশোধনের পর এগুলো বাজারে আসতে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ মাস সময় লেগে যাবে।
এদিকে সয়াবিন তেলের তিনটি জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে ভিড়েছে। এগুলোয় প্রায় ৭৫ হাজার টন তেল রয়েছে। এগুলো কম হ্রাসকৃত ভ্যাটে ছাড় করা যাবে।
এদিকে সয়াবিন আমদানি বাড়াতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক এলসি মার্জিন প্রত্যাহার করেছে। একই সঙ্গে এলসি কমিশন ন্যূনতম পর্যায়ে রাখার নির্দেশ দিয়েছে। এই সুবিধা নিয়ে এখন সয়াবিন তেল আমদানির এলসি খোলা হলে সেগুলো দেশে আসতে কমপক্ষে ২ থেকে ৩ মাস সময় লাগবে।
এগুলো বন্দর থেকে খালাস করে পরিশোধের মাধ্যমে বাজারজাত করতে আরও ২ থেকে ৩ মাস লাগতে পারে। আগে ১০০ টাকার তেল আমদানি করতে ৭০ থেকে ৮০ টাকা দিতে ব্যাংক। বাকি ২০ থেকে ৩০ টাকা দিতে হতো আমদানিকারককে।
মার্জিন প্রত্যাহার করায় এখন পুরো অর্থই ব্যাংক ঋণ হিসাবে দেবে। ফলে আমদানিকারকের নগদ টাকা লাগছে না। এতে সয়াবিনের আমদানি বাড়বে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।
এলসি কমিশন শূন্য দশমিক ৩০ থেকে শূন্য দশমিক ৪০ শতাংশ। সর্বনিম্ন কমিশন ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। এ কমিশন কমে ২ থেকে ৩ হাজার টাকায় নেমে আসবে। ফলে এখানেও আমদানিকারকদের অর্থ সাশ্রয় হবে।
সরকারি ব্যাংকগুলোকে সয়াবিন তেলের এলসি খোলার জন্য ব্যবসায়ীরা গেলে দ্রুত করার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। একই সঙ্গে এলসি বিদেশি ব্যাংকে দ্রুত পাঠাতে হবে।
এতে আমদানিতে সময় কম লাগবে। এদিকে বন্দরগুলোকেও সয়াবিন তেল দ্রুত খালাস করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বন্দরের ব্যাংকগুলোকেও এসব কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করতে বলা হয়েছে।