বিশিষ্টজনের অভিমত
সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে সরে যেতে হবে
মানুষের স্বার্থে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি -মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম * স্বল্প ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা খুবই খারাপ -গোলাম রহমান * সরকারি সংস্থাগুলো কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না -ড. এমকে মুজেরী

মনির হোসেন
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৩, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

বাজার সিন্ডিকেটের দাপট এতটাই বেড়েছে যে, অসহায় হয়ে পড়েছে দেশের সর্ব শ্রেণির মানুষ।
অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি কোনোভাবেই থামছে না। সরকার এইসব সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কঠোর না হওয়ায় অবস্থা দিনকে দিন আরও খারাপের দিকে যাচ্ছে। খোদ বাণিজ্যমন্ত্রীই যখন অসহায়ের মতো কথা বলেন তখন মানুষ আরও শঙ্কিত হয়ে পড়ে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশিষ্টজনরা বলছেন, সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে কঠোর অবস্থা না নিলে নিত্যপণ্যের বাজারে স্বস্তি ফিরবে না। এর জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। তারা বলেন, বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যাদের তারা যদি ব্যর্থ হন তাহলে তাদের পদ থেকে সরে যাওয়া উচিত। সিন্ডিকেটের শক্তি নিশ্চয়ই সরকারের চেয়ে বেশি হতে পারে না।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, মানুষের স্বার্থে পণ্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রথম কাজ বিকল্প সরবরাহ নিশ্চিত করা। বাজার দিয়ে বাজারের মোকাবিলা করতে হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠান টিসিবির মাধ্যমে চাল, ডাল, তেল, আটা ও চিনিসহ বেশকিছু পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এতে করে ব্যবসায়ীরা যখন দেখবে বিকল্প ব্যবস্থায় মানুষ সস্তায় কিনছে, তখন তারা পণ্যের দাম কমিয়ে দেবে।
দ্বিতীয়ত, কারসাজির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনে যে বিধান রয়েছে তার মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। এই দুইভাবে পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। জিনিসপত্রের দাম প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পণ্যের দাম বৃদ্ধির জন্য আমদানি ও বিশ্ববাজারকে দায়ী করা হচ্ছে। কিন্তু আমি যতদূর জানি, ডিম কোনো দেশ থেকে আমদানি করা হয় না। ফলে এই পণ্যটির দাম বৃদ্ধির যুক্তি নেই। কারসাজি চিহ্নিত করে আইনের মাধ্যমে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
পণ্যের দামের কাছে মানুষ অসহায়। এর অন্যতম কারণ অসাধু সিন্ডিকেট। কিন্তু সরকারের চেয়ে সিন্ডিকেট শক্তিশালী নয়। এমনটিই মনে করেন দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ও কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি গোলাম রহমান।
তিনি যুগান্তরকে বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি সাধারণ মানুষের জন্য দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে স্বল্প ও মধ্যবিত্তদের অবস্থা খুবই খারাপ। ‘আমার নিজেরও চলতে কষ্ট হয়। সেখানে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা আয় করে একজন মানুষ কীভাবে সংসার চালায় তা চিন্তার বিষয়।’ গোলাম রহমান আরও বলেন, এখান থেকে পরিত্রাণের উপায় দেখছি না। জিনিসপত্রের দাম কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না। সিন্ডিকেটের ক্ষমতা এতই বেশি, তারা নিজেদের সরকারের চেয়ে শক্তিশালী বা ক্ষমতাবান মনে করে।
বাণিজ্যমন্ত্রীর একটি বক্তব্যের উদ্ধৃতি দিয়ে গোলাম রহমান বলেন, মন্ত্রী বলেছেন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। এটি হলো বর্তমান বাস্তবতা। আমি মনে করি, সিন্ডিকেট সরকারের চেয়ে শক্তিশালী হতে পারে না। সরকার চাইলে এটি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। কিন্তু তা একদিনে সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে পরিকল্পিতভাবে সময় নিয়ে সিন্ডিকেট ভাঙার চেষ্টা করতে হবে। যদিও এ সংক্রান্ত কোনো উদ্যোগ নজরে আসছে না। তার মতে, পরিকল্পিতভাবে উদ্যোগ নিলে সিন্ডিকেট ভাঙা সম্ভব হবে এবং তাদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হবে। এতে জিনিসপত্রের দামও মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক ড. এমকে মুজেরী বলেন, সিন্ডিকেট কি করছে তা দেখার জন্য সরকারের বিভিন্ন সংস্থা রয়েছে। এসব সংস্থাগুলো ঠিকমতো কাজ না করলে অসাধু ব্যবসায়ী এবং সুযোগসন্ধানীরা সুযোগ নেবেই।
তিনি যুগান্তরকে আরও বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীরা সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কিছু দিন পরপর বিভিন্ন পণ্য টার্গেট করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। কিন্তু সরকারি সংস্থাগুলো এর বিপরীতে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। এতে অন্যান্য ব্যবসায়ীরাও উৎসাহিত হচ্ছে। সরকারি সংস্থার ব্যর্থতায় জনগণকে চরম মূল্য দিতে হচ্ছে।
ড. মুজেরীর কাছে প্রশ্ন ছিল, বাণিজ্যমন্ত্রী বলেছেন সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে তারা পণ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেবে। পণ্য সিন্ডিকেটের বিষয়ে মন্ত্রী এভাবে অসহায় হলে, সাধারণ মানুষের দাঁড়ানোর জায়গা কোথায়। এমন প্রশ্নে এমকে মুজেরী বলেন, এটি আমাদের জন্য দুভার্গ্য। কারণ সিন্ডিকেট কারসাজি করলে ব্যবস্থা নেওয়া আপনার দায়িত্ব। অর্থাৎ সরকারি দায়িত্বপ্রাপ্ত দপ্তরের কাজ। হয় নিজের কাজ ঠিকমতো করবেন, না পারলে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াবেন। ব্যর্থ হলে দায়িত্ব থেকে সরে যেতে হবে। কারণ সাধারণ মানুষের যাওয়ার আর বিকল্প কোনো জায়গা নেই। তার মতে, সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। আর যাতে মানুষকে জিম্মি করার সাহস না পায়। এক্ষেত্রে অবশ্যই প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।