
প্রিন্ট: ২৭ মার্চ ২০২৫, ০১:২৭ পিএম
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই
একটি ইতিহাসের অবসান হয়েছে - বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া * রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার শোক

যুগান্তর রিপোর্ট
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০১৯, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। ফাইল ছবি
আরও পড়ুন
উপমহাদেশের বাম রাজনীতির অন্যতম পুরোধা, একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির (ন্যাপ) সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আর নেই (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।
শুক্রবার রাত ৭টা ৫০ মিনিটে তিনি রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে আসে। অনেকেই রাজধানীর এ্যাপোলো হাসপাতালে ছুটে যান।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী ও বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন এরশাদ শোক জানিয়েছেন।
এছাড়া বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনুসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন।
দেশের বিশিষ্ট নাগরিকরা বলেছেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে একটি ইতিহাসের অবসান হয়েছে। তিনি জাতীয় ইতিহাসের অংশ। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি হল।
দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব সমুন্নত রাখা এবং গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তার ভূমিকা জাতীয় ইতিহাসে সমজ্জ্বল হয়ে থাকবে। গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষার তিনি আজীবন লড়াই করেছেন।
ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোশতাক আহমেদ যুগান্তরকে বলেন, ঠাণ্ডা লেগে বুকে কফ জমে যাওয়া এবং ব্যাকবোনে ব্যথা শুরু হওয়ায় ১৪ আগস্ট অধ্যাপক মোজাফফরকে এ্যাপোলো হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ক্রমেই তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকায় সোমবার তাকে আইসিইউতে নেন চিকিৎসকরা। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
বরং অবনতি হচ্ছে বলে জানিয়েছিলেন চিকিৎসকরা। তিনি আরও বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মরদেহ তার বাসায় রাখা হবে। তার প্রথম জানাজা হবে আজ বেলা ১১টায় সংসদ ভবনে।
এরপর তার মরদেহ শহীদ মিনারে নিয়ে যাওয়া হবে। তারপর বাদ আসর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে দ্বিতীয় জানাজা হবে। পরে তার গ্রামের বাড়িতে তাকে দাফন করা হবে।
জানা গেছে, তার বয়স হয়েছিল ৯৮ বছর। অধ্যাপক মোজাফফর দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিতসহ বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন। এজন্য ঘন ঘন তাকে হাসপাতালে আনতে হয়েছে।
এবারের অসুস্থতা ছিল বেশ গুরুতর। বুকে কফ জমে যাওয়ায় নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল তার।
সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতিতে কিংবদন্তিতুল্য মোজাফফর আহমদ ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বারের এলাহাবাদ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা আলহাজ কেয়াম উদ্দিন ভূঁইয়া স্কুলশিক্ষক ছিলেন।
মায়ের নাম আফজারুন্নেছা। মোজাফফর আহমদ হোসেনতলা স্কুল, জাফরগঞ্জ রাজ ইন্সটিটিউশন, দেবিদ্বার রেয়াজউদ্দিন পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় ও ভিক্টোরিয়া কলেজে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ে পড়ালেখা করেন।
পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ইউনেস্কোর ডিপ্লোমা লাভ করেন। নিজেকে তিনি সবসময় ‘কুঁড়েঘরের মোজাফফর’ বলে পরিচয় দিতে পছন্দ করতেন।
মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৩৭ সালে। তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
রাজনীতির পাশাপাশি তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করেছেন। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতিতে যুক্ত হন।
মুক্তিযুদ্ধে অবদানস্বরূপ সরকার ২০১৫ সালে তাকে স্বাধীনতা পদকের জন্য মনোনীত করলেও তিনি সবিনয়ে তা ফিরিয়ে দেন।
১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে তিনি পরাজিত করেন। ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
১৯৫৮ সালে সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে। তাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়।
তিনি আত্মগোপনে থেকে আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করেন। আট বছর আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে ফিরে আসেন তিনি।
১৯৬৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন। ১৯৬৯ সালে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন এবং কারাবরণ করেন।
তিনি রাওয়ালপিন্ডির গোলটেবিল বৈঠকে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে মূল নেতৃত্বের একজন ছিলেন তিনি। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন।
তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করেন। ওই সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়নের নিজস্ব ১৯ হাজার মুক্তিযোদ্ধা গঠনের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
অধ্যাপক মোজাফফর ১৯৭৯ সালে এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৮১ সালে ন্যাপ, সিপিবি ও প্রগতিশীল শক্তির প্রার্থী হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বি^তা করেন। অধ্যাপক মোজাফফর বেশ কয়েকটি বই লিখেছেন।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতে গিয়ে তিনি লেখেন, ‘স্বাধীন বাংলার স্বপ্নদ্রষ্টা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আমার বন্ধু ছিলেন।’ শেরেবাংলা একে ফজলুল হক সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ‘তিনিই প্রথম জাতীয় নেতা যাকে বাংলার আমজনতা তাদের আপন লোক ভাবতে পেরেছিলেন।’
মওলানা ভাসানী সম্পর্কে লিখেছেন, ‘এ দেশের রাজনীতি বড়লোকের প্রাসাদ থেকে সাধারণ মানুষের মাঝে নিয়ে আসার ব্যাপারে শেরেবাংলা ফজলুল হকের চেয়ে মওলানা ভাসানীর অবদান কম নয়।’ শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের সাধক হিসেবে মন্তব্য করেন।
আর এ যুগের রাজনীতিবিদ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের দেশে রাজনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে পেটনীতি, ব্যবসা ও দুর্নীতির আড্ডাখানায়। আমাদের দেশের রাজনীতিবিদরা প্রায় সবাই নিুবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের লোক। দেশ স্বাধীন হয়েছে ২০ বছর (১৯৯১ সালের লেখা)। এত অল্প সময়ে এত সম্পদ কিছু লোকের হাতে এসেছে তা ভাবতে অবাক লাগে।’
বিশিষ্টজনের প্রতিক্রিয়া : সিপিবির সভাপতি মোজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ বাংলাদেশের ঐতিহ্য এবং প্রতীক। তিনি জাতীয় ইতিহাসের অংশ। মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের আগে ও পরে দেশের জন্য ভূমিকা রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমুন্নত রাখতে তার যে ভূমিকা তা জাতীয় ইতিহাসে সমুজ্জ্বল হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের জন্য তার সংগ্রাম অক্ষয় হয়ে থাকবে। গরিব মানুষের স্বার্থ রক্ষার তিনি আজীবন লড়াই করেছেন।
সব মিলে জাতির জন্য তার অবদান জাতীয় ইতিহাসে অক্ষয় হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আমি তাকে আজ (শুক্রবার) দেখতে গিয়েছিলাম। তার ব্যাপারে ডাক্তারের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি আসলে অনেকদিন ধরে শয্যাশায়ী ছিলেন। অধ্যাপক আহমদ খুব অল্পবয়সে আমাদের ছেড়ে চলে যাননি, এ কথা ঠিক। তবে তার এই চলে যাওয়া জাতির জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। তার অবদানের জন্য জাতি তাকে আজীবন স্মরণ করবে।
বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ একজন ভালো মানুষ ছিলেন। তার সংকটাপন্ন অবস্থায় আমি তাকে দেখতে গিয়েছিলাম। তার চলে যাওয়াটা আমি মেনে নিতে পারছি না। মোজাফফর আহমদের রাজনৈতিক জীবনের শুরু ১৯৩৭ সালে থেকে।
তিনি ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনসহ বিভিন্ন আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের উজ্জ্বল নক্ষত্রদের মধ্যে তিনি একজন ছিলেন। বলা যায় তার মতো মানুষের বিদায় মানে, এক জন নক্ষত্রের পতন ঘটল। তাই তাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বিদায় জানানো উচিত।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ এর সভাপতি ও বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার রাতে এক শোকবার্তায় মরহুমের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করে তিনি বলেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদ।
মহান মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের অবদান ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে আমরা একজন সৎ, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নেতাকে হারালাম। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে রাজনীতিতে বিশাল শূন্যতা সৃষ্টি হল, যা সহসাই পূরণ হওয়ার নয়।
রাজনীতিসহ নানা ক্ষেত্রে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের অবদান নতুন প্রজন্মের সামনে অনুকরণীয় হয়ে থাকবে বলে মনে করেন তিনি। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের শোকার্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান মির্জা ফখরুল।
আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক বলেছেন, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে দেশের প্রগতিশীল রাজনীতিতে একটি বড় শূন্যতা সৃষ্টি হল। বিজ্ঞ এ রাজনীতিবিদ সবসময়ে বন্ধুর আদর্শকে সমর্থন দিয়ে গেছেন। তিনি যুদ্ধকালীন সরকারের উপদেষ্টা ছিলেন।
আমি এই ব্যক্তিত্বের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদের এমপি। তিনি বলেন, তার মৃত্যুতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিশাল শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে, যা সহসাই পূরণ হওয়ার নয়।
অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন দেশপ্রেম ও স্বচ্ছ রাজনীতির কিংবদন্তি। মহান মুক্তিযুদ্ধে তার অবদান অক্ষয় হয়ে থাকবে। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ এক সৎ, আদর্শবান ও দেশপ্রেমিক নেতা হারাল।
এদিকে তার মৃত্যুতে গভীর শোক ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন কুমিল্লা-৪ দেবিদ্বার আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ রাজী মোহাম্মদ ফখরুল, সাবেক মন্ত্রী ও সচিব আলহাজ এবিএম গোলাম মোস্তফা, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য ও সাবেক উপ-মন্ত্রী এএফএম ফখরুল ইসলাম মুন্সী এবং কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক এমপি আলহাজ ইঞ্জিনিয়ার মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী।