ঢাকাই ছবিতে ছাত্র আন্দোলন

তারাঝিলমিল ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

'বিক্ষোভ' ছবিতে প্রয়াত সালমান শাহ ও শাবনূর
জাতীয় জীবনে রাজনীতি একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। রাজনীতি করাও মানুষের একটি অধিকার। যদিও ধীরে ধীরে রাজনীতি মানুষের জন্য বিষাদময় অধ্যায়ে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে রাজনীতি মানেই হিংসা, বিদ্বেষ আর খুনোখুনি।
সিনেমার ইতিহাসেও উল্লেখযোগ্য একটি অধ্যায় ছাত্ররাজনীতি। যদিও বর্তমান প্রেক্ষাপটে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে কোনো ছবি তৈরি হয় না। একটা সময় বাংলাদেশে ছাত্ররাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন নিয়ে বেশ কয়েকটি ছবি নির্মিত হয়েছে। সেসব ছবিতে রাজনৈতিক অঙ্গনে দেশের ছাত্রদের ভূমিকা উঠে এসেছে। এ ধরনের কিছু ছবি নিয়ে এ বিশেষ আয়োজন। লিখেছেন এফ আই দীপু
‘বিদ্যালয়, মোদের বিদ্যালয়, এখানে সভ্যতারই ফুল ফোটানো হয়, এখানে জ্ঞানের আলোর মশাল জ্বেলে, হয় রে সূর্যোদয়’- ‘বিক্ষোভ’ ছবিতে নায়ক সালমান শাহ ও শাবনূরের ঠোঁটে কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লা ও খালিদ হাসান মিলুর গাওয়া এ গান কিংবা আগুন ও রুনা লায়লার কণ্ঠে ‘একাত্তরের মা জননী, কোথায় তোমার মুক্তি সেনার দল’- এসব গানের উদ্দীপনা এখনও যে কোনো শিক্ষার্থীর বুকে জাগিয়ে দেয় আন্দোলনের স্পৃহা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর প্রেরণা জোগায় এসব গান।
এ ধরনের অনেক ছবি রয়েছে ঢাকাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে। যেসব ছবিতে কোনো কোনোটি ছাত্র আন্দোলনকে উপজীব্য করে তৈরি হয়েছে। আবার কোনোটির মধ্যে বিশেষ কিছু দৃশ্যে রয়েছে ছাত্র আন্দোলন, কিংবা অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্রদের প্রতিবাদ। সাধারণত ছাত্ররাজনীতি নিয়ে ছবিগুলো তৈরি হয়েছে ভঙ্গুর শিক্ষাব্যবস্থা, প্রশাসনিক সমস্যা, দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা, শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাস, সাধারণ ছাত্রের বিপ্লবী হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে। নির্মাতারা চেষ্টা করেছেন ছবির মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতা ফুটিয়ে তুলে জনমনে সচেতনতা তৈরি করতে।
যন্ত্রণা (১৯৮৮) : আশির দশকে কাজী হায়াৎ পরিচালিত ছবি ‘যন্ত্রণা’। এ ছবির গল্প এক কথায় অসাধারণ ও বাস্তবসম্মত। ছবির মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন প্রয়াত চিত্রনায়ক মান্না। সঙ্গে ছিলেন প্রয়াত দিলদার ও আরও দু’জন নবাগত। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর বিভিন্ন অফিসে চাকরির জন্য ধরনা দিলেও কপালে তাদের চাকরি জোটে না। বরং বিভিন্নভাবে হেনস্তা হয়ে চরম বাস্তবতার মুখোমুখি হন। ওরা আবিষ্কার করে, সব সেক্টরই দুর্নীতির ভারে নিমজ্জিত।
এসব দেখে বেকার চার বন্ধু সিদ্ধান্ত নেয় চাকরির বদলে চাঁদাবাজি, মাস্তানি করবে। এভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত নেতা ও চামচাদের শাস্তি দিতে থাকে তারা। ধীরে ধীরে আরও অনেক অপরাধের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে একসময় দেশোদ্রোহী হিসেবে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। বিচারে ফাঁসির আদেশ হয় তাদের। ছবির শেষে যখন তাদের মুখে শোনা যায় ‘তবুও যন্ত্রণার শেষ হলো কি?’ তখন প্রেক্ষাগৃহে ছিল পিনপতন নীরবতা! এই একটি সংলাপই বলে দেয় আসলেও স্বাধীনতার ৪৭ বছর পরও বেকার ছাত্রদের যন্ত্রণার শেষ হয়নি।
চেতনা (১৯৯০) : নব্বই দশকে ছটকু আহমেদ পরিচালিত ছবি ‘চেতনা’। এ সময়ে বাণিজ্যিক ছবির সফলতা ছিল চোখে পড়ার মতো। ঠিক সময়টিকেই বেছে নিয়েছিলেন পরিচালক। পাশাপাশি ওই সময় স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্র আন্দোলনও ছিল আলোচনার অগ্রভাগে। এ ছবির গল্পে দেখা যায়, শিক্ষক আলমগীরকে তার ছাত্ররা মনেপ্রাণে ভালোবাসে। এ ছাত্রদের মধ্যে নায়ক হিসেবে ছিলেন অমিত হাসান। তার সঙ্গে ছিলেন মিশা সওদাগরও।
এক সময় আলমগীর খুন হন প্রভাবশালী দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী এটিএম শামসুজ্জামানের হাতে। প্রিয় শিক্ষকের মৃত্যুর খবর শুনে আন্দোলন শুরু করে ছাত্ররা। বিশেষ করে এটিএমের আধিপত্যের এলাকাকে সন্ত্রাসমুক্ত করতে প্রতিশোধ নেয়া শুরু করে অমিত, মিশাসহ অন্য ছাত্ররা। শুরু হয় অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের লড়াই। ন্যায়ের পক্ষে লড়াই করা অভিনেতারা এ ছবির মাধ্যমে দেখিয়ে দিয়েছেন ভবিষ্যতে অর্থাৎ বাস্তবে ছাত্রদের করণীয় কী?
ত্রাস (১৯৯২) : কাজী হায়াৎ পরিচালিত ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আলোচিত একটি ছবি ‘ত্রাস’। এ ছবিতেও অভিনয় করেছেন প্রয়াত মান্না। এ নায়কের ক্যারিয়ারে সুপারহিট ছবিগুলোর মধ্যে এটি একটি। ছবির গল্পে দেখা যায়, কলেজ ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটানো বখাটে ছাত্রদের আধিপত্যে সাধারণ ছাত্ররা অসহায় হয়ে পড়ছে। কলেজের ছাত্রী নায়িকা কবিতাকে অসম্মান করে কাবিলা। ওই সময় মাঠে উপস্থিত থাকা মান্না সবার সামনেই কাবিলাকে শায়েস্তা করে।
এর থেকে শুরু হয় একের পর এক রাজনৈতিক প্রতিহিংসা। ‘একতা শান্তি শৃঙ্খলা’ গানের মাধ্যমে শান্তির পরিবেশ সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চাইলেও সেটা ছাত্ররা পারে না। তাই দুর্নীতিগ্রস্ত অসৎ নেতা রাজিব, মিজু আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন মান্না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তাকে বরণ করে নিতে হয় ছাত্ররাজনীতির করুণ বাস্তবতা।
ত্রাস ছবিতে প্রয়াত মান্না ও কাজী হায়াত
বিক্ষোভ (১৯৯৪) : মহম্মদ হান্নান পরিচালিত ছাত্র আন্দোলন নিয়ে আরও একটি সুপারহিট ছবি। বলা যায়, নব্বই দশকে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে যে ক’টি ছবি নির্মিত হয়েছে তার মধ্যে বিক্ষোভই হচ্ছে ওই সময় পর্যন্ত সেরা ছবি।
কারণ এ ছবিতে ছাত্ররাজনীতির পুরো বিষয়টি গুছিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন পরিচালক। কীভাবে ছাত্ররাজনীতি শুরু হয়, কীভাবে আধিপত্য তৈরি হয়, কীভাবে অসৎ নেতারা কলেজ ক্যাম্পাসে নিজেদের ক্যাডারদের পোষেন, কীভাবে সাধারণ ছাত্ররা অসৎ নেতাদের টার্গেটে পরিণত হয়, কীভাবে সাধারণ ছাত্র বিপ্লবী হয়ে ওঠে- এসব বিষয় মূল থেকে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন গল্পকার। আর এ ছবির মহত্ব আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন অমর নায়ক সালমান শাহ। তার সঙ্গে ছিলেন শাবনূর। বিশেষ করে ছবির দুটি গান ‘একাত্তরের মা জননী’ ও ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়’ ছাত্রদের মধ্যে ন্যায়ের জন্য বিপ্লব তৈরি করে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
আজকের প্রতিবাদ (১৯৯৪) : ছাত্র আন্দোলন নিয়ে প্রয়াত চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলামও নির্মাণ করেছিলেন আলোচিত ছবি ‘আজকের প্রতিবাদ’। তার এ ছবির গল্প ছিল শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে এক ছাত্রের রুখে দাঁড়ানোর বিষয়। নবাগত দোদুল ও লাজুককে নিয়ে চাষী এ ছবিতে দেখিয়েছেন, সাধারণ ছাত্ররা এক জোট হলে কীভাবে প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়ে কোনো অন্যায়কে শেষ করা যায়। এ ছবির সংলাপ ছিল বেশ প্রতিবাদী। ওই সময় ছবিটি নিয়ে আলোচনা হয়েছিল।
হুলিয়া (১৯৯৫) : নব্বই দশকে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে তৈরি আরও একটি আলোচিত ছবি ‘হুলিয়া’। এটি পরিচালনা করেছেন জীবন রহমান। ছবিতে মূল চরিত্রে অভিনয় করেছেন চিত্রনায়ক ওমর সানী। গল্পে দেখা যায়, কলেজের বোকা ছাত্র ওমর সানী। কোনো ঘটনারই মারপ্যাঁচ তার বোধে আসে না। আদর্শবান শিক্ষক প্রবীর তার আত্মীয়।
এক ঘটনায় এ শিক্ষককে ষড়যন্ত্র করে ফাঁসিয়ে দেয় কুচক্রীরা। এরপর ওমর সানীর ওপর অত্যাচারের খক্ষ নেমে আসে। সানীকে বাঁচাতে এগিয়ে আসে নায়িকা শাহনাজ। রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে ঘটনা বাড়তেই থাকে। দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে বোকা ওমর সানী একসময় প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করেন সব অন্যায়ের।
ঘায়েল (১৯৯৫) : নূর হোসেন বলাই পরিচালিত ছবি ‘ঘায়েল’। এ ছবিতেও উঠে এসেছে ছাত্ররাজনীতির মারপ্যাঁচ। এ রাজনীতি কিন্তু মূল রাজনীতিরই একটা অংশ বিশেষ। এ ছবিতেও নায়ক হিসেবে অভিনয় করেছেন ওমর সানী। ছবির গল্পে দেখা যায়, অভিনেতা রাজিবের ছেলে ওমর সানী কলেজে রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত।
সততার পরিণাম কি সেটা বাবা-ছেলে দু’জনেই টের পায়। বন্ধুর সঙ্গে চটপটি খেতে বসা সানী কলেজ ক্যাডারদের আক্রমণে বন্ধুকে হারায়। এরপর প্রতিবাদী হয়ে ওঠে সানী। বন্ধু হত্যার প্রতিবাদে শুরু হয় তার নতুন মিশন। গল্পের মাঝপথে রাজিব নিজেও আটকে যান আইনি দুর্নীতির বেড়াজালে। এরপর বাবা ও ছেলে একই পথে শত্র“দের ঘায়েল করতে শুরু করেন।
মুক্তির সংগ্রাম (১৯৯৫) : সাধারণ ছাত্র থেকে প্রতিবাদী হয়ে ওঠার গল্প নিয়ে তৈরি ছবি ‘মুক্তির সংগ্রাম’। পরিচালনা করেছেন উত্তম আকাশ। এ ছবিতেও অভিনয় করেছেন ওমর সানী। ছবির গল্পে দেখা যায়, রাজনীতির শিকার হয়ে পরিবার, বন্ধু, প্রেমিকা সবাই অসহায়। কলেজ ক্যাম্পাসের ক্যাডারদের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের রেষারেষি। এরপর শুরু হয় ওমর সানীর প্রকাশ্য প্রতিবাদ। অসৎ সাদেক বাচ্চু সবাইকে শেল্টার দেয়। শেষে এই সাদেক বাচ্চুকে শেষ করে সবকিছু স্বাভাবিক নিয়মে নিয়ে আসেন নায়ক।
প্রিয় তুমি (১৯৯৫) : হাফিজ উদ্দিন পরিচালিত ছবি ‘প্রিয় তুমি’। এ ছবিকে ঠিক ছাত্র আন্দোলনভিত্তিক বলা যায় না। ছবির গল্পেও আন্দোলন নিয়ে খুব বেশি কিছু নেই। কিন্তু যেটুকু ছিল সেটাও যে কোনো ছাত্রের বুকে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট।
এর গল্পে ছাত্রদের অংশটুকুতে দেখা যায়, কলেজ ক্যাম্পাসে নির্বাচন নিয়ে রাজনীতি এবং সৎ ছাত্র ওমর সানীর জয় নিয়ে সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে তুমুল উচ্ছ্বাস। ছবিটিতে ‘জিতে গেছি জিতে গেছি ইলেকশন’ শিরোনামের একটি গানে সৎ ছাত্রের নেতৃত্ব দেয়ার বিজয়টি তুলে নিয়ে আসেন পরিচালক। মূলত কলেজ ক্যাম্পাসে সৎ ও মেধাবী ছাত্রদের নেতৃত্ব দেয়ার বিষয়টি এ ছবির গল্পে প্রাধান্য পেয়েছে। ছবিতে ওমর সানীর নায়িকা হিসেবে অভিনয় করেছেন মৌসুমী।
প্রিয় তুমি ছবিতে মৌসুমী ও ওমর সানী
পাগলা বাবুল (১৯৯৭) : চিত্রপরিচালক কাজী হায়াতের আরও একটি সফল ছবি ‘পাগলা বাবুল’। এ ছবিতে অভিনয় করেন মাসুদ শেখ। ছবির গল্পে দেখা যায়, মাসুদ কলেজের নিরীহ ছাত্র। পরিস্থিতির শিকার হয়ে নোংরা ছাত্ররাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।
তাকে দিয়ে বোমা মারার কাজ করানো হয়। অন্যায় করতে করতে একসময় তার স্বাভাবিক জীবনই বদলে যায়। তবে সন্ত্রাসী হলেও তার মধ্যে সাধারণ মানুষের জন্য একটা টান সবসময় ছিল। এটাই মূলত পরিচালকের কারিশমা। একজন সাধারণ ছাত্র কীভাবে নোংরা রাজনীতির শিকার হয়ে সন্ত্রাসীতে পরিণত হয় সেটাই এ ছবির মূল উপজীব্য। নির্মাণে বেশ মুনশিয়ানাও দেখিয়েছেন পরিচালক।
অধিকার চাই (১৯৯৮) : ওয়াকিল আহমেদ পরিচালিত ছবি ‘অধিকার চাই’। ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নির্মিত এ ছবিতেও অভিনয় করেছেন ওমর সানী। এর গল্পে দেখা যায়- ওমর সানী সাধারণ ও বোকা হলেও ক্লাসে মনোযোগী ছাত্র। কলেজের ছাত্রী শাবনূরের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও প্রেম। একই কলেজের বখাটে ছাত্র মিশা সওদাগর ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক স্বার্থে ওমর সানীর বাবা বুলবুল আহমেদ ও শাবনূরের বোনকে হত্যা করে। সইতে না পেরে এই বোকাসোকা ছাত্র ওমর সানী প্রতিবাদী হয়ে কলেজ ক্যাম্পাসেই মিশাকে খুন করে। কিন্তু সমাজের মন্দ লোক হুমায়ুন ফরীদির আধিপত্যের শিকার হয় সানী ও শাবনূর। তারপরও লড়তে থাকেন সাধারণ ছাত্রের অধিকার আদায়ের জন্য।
বিপ্লবী জনতা (২০০১) : হাফিজ উদ্দিন পরিচালিত ছাত্র আন্দোলন নিয়ে তৈরি ছবি ‘বিপ্লবী জনতা’। এ ছবিতে ছাত্র আন্দোলনের অদ্যোপান্ত তুলে ধরা হয়েছে। ছবিতে নায়কের চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস। তার সঙ্গে রয়েছেন পূর্ণিমা। এর গল্পে দেখা যায়, হুমায়ুন ফরীদি ও রাজিবের নেতৃত্বে কলেজ ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্রদের বিরক্ত করে ফেরদৌস। নিজের আধিপত্য বজায় রাখতে মাস্তানি করে।
বিপ্লবী জনতা ছবিতে ফেরদৌস ও পূর্ণিমা
একসময় শিক্ষক সোহেল রানা তাকে বোঝাতে সক্ষম হন। মিশার আক্রমণ থেকে পূর্ণিমাকে বাঁচানো এবং মাকে হারানোর পর ভালো হয়ে যায় ফেরদৌস। এরপর বদলে যান তিনি। নোংরা ছাত্ররাজনীতির বিরুদ্ধে নিজেই শুরু করেন প্রতিবাদ। এ ছবির মাধ্যমে পরিচালক দেখিয়েছেন, নোংরা ছাত্ররাজনীতি ছোবল থেকে মুক্তি নিয়ে এক ছাত্রের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা।
ইতিহাস (২০০২) : কাজী হায়াতের আরেক সফল ছবি ‘ইতিহাস’। ছবির নায়ক কাজী হায়াতেরই ছেলে কাজী মারুফ। এর গল্পে দেখা যায়, ‘কলেজের সাধারণ ছাত্র কাজী মারুফ। যে কোনো এক ঘটনায় দুর্নীতিগ্রস্ত এক অসৎ পুলিশের সঙ্গে তাকে মিশতে হয়। পরিস্থিতির শিকার হয়ে সেই পুলিশ অফিসারের কারণে স্বাভাবিক জীবন হারায় মারুফ। জড়িয়ে পড়েন সন্ত্রাসের সঙ্গে। কিন্তু সন্ত্রাসী হয়ে নিজেই দমন করতে থাকেন সব দুষ্টদের। কাজী হায়াতের এ ছবিটিও ছাত্ররাজনীতির শিকার হওয়ার এক ছাত্রের আত্মত্যাগ বলা যায়।
সাহসী মানুষ চাই (২০০৩) : মহম্মদ হান্নান পরিচালিত ছবি ‘সাহসী মানুষ চাই’। আজকের সুপারস্টার শাকিব খানের ক্যারিয়ারের শুরুর দিকের ছবি এটি। এ ছবিটিও অনেকটা ছাত্র আন্দোলন নিয়ে। ছবিতে শাকিব খানের নায়িকা হিসেবে ছিলেন কেয়া। গল্পে দেখা যায়, সাধারণ ছাত্রদের ওপর রাজনৈতিক মদদপুষ্ট ছাত্ররা অত্যাচার শুরু করে। শিক্ষককেও মানতে চায় না তারা। এসব অন্যায় এ সবের বিরুদ্ধে একসময় প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন সাধারণ ছাত্র শাকিব খান। প্রতিশোধ নেয়া শুরু করেন তিনি। গল্পে গভীরতা না থাকলেও ছবির প্রেক্ষাপট ছাত্রসমাজের ভূমিকা এবং করণীয় নিয়ে আলোকপাত আছে।
আজকের সমাজ (২০০৪) : নজরুল ইসলাম খান পরিচালিত এ ছবিটির গল্প পুরোটাই ছাত্র এবং দলীয় রাজনীতি নিয়ে। ছবির সংলাপ লিখেছেন কাজী হায়াৎ। এ ছবির নায়কও শাকিব খান। নায়িকা হিসেবে ছিলেন পূর্ণিমা। এর গল্পে দেখা যায়, সাধারণ ছাত্র শাকিব বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে হলে সিট পায় না।
চক্রে পড়ে এক ছাত্রনেতার রুমে থাকতে হয় তাকে। একদিন সরকারি দলের দুই গ্র“পের সংঘর্ষে জড়ানোর ঘটনার সত্যিটা বলে দেয় সবাইকে। দুই দলেই রোষানলে পড়েন শাকিব। প্রেমিকা পূর্ণিমাকে ঘিরে ছাত্রনেতার অসৎ উদ্দেশের প্রতিবাদ করতে গিয়ে শাকিব হয়ে ওঠে ছাত্রনেতা ও অসৎ নেতার টার্গেট। এরপর বাধ্য হয়েই সাধারণ ছাত্র শাকিব খান হয়ে ওঠে প্রতিবাদী।
আমি বাঁচতে চাই (২০০৭) : নায়করাজ রাজ্জাক পরিচালিত একটি আলোচিত ছবি ‘আমি বাঁচতে চাই’। পুরোপুরি ছাত্র আন্দোলন না হলেও সাধারণ ছাত্র থেকে কীভাবে পরিস্থিতির শিকার হয়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে তারই গল্প এ ছবি। তবে ছবিটি পুরোপুরি রাজনৈতিক। এ ছবিতে অভিনয় করেছেন রাজ্জাক তনয় সম্রাট।
নায়িকা ছিলেন জনা ও অপু বিশ্বাস। এর গল্পে দেখা যায়, মফস্বল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে ছাত্রনেতাদের বেপরোয়া কর্মকাণ্ড দেখে মেজাজ খারাপ হয় সম্রাটের। মাদকদ্রব্যের কারণে এক সাধারণ ছাত্রকে ছাত্রনেতাদের মারার বিষয়টিও সে মেনে নিতে পারে না। প্রতিবাদ করে সে। এটাই কাল হয়ে দাঁড়ায়।
একদিন বোমা হামলার মিথ্যা অভিযোগে সম্রাটকে পুলিশ নির্যাতন করে। এক সময় রাজনীতির প্রতি একরাশ ঘৃণা নিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে বাড়ি ফিরে যায় সম্রাট। কিন্তু রাজনীতি তাকে আর ছাড়ে না। স্থানীয় নোংরা রাজনীতির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় সাধারণ ছাত্র সম্রাট।
অস্ত্র ছাড়ো কলম ধরো (২০১১) : রাজু চৌধুরী পরিচালিত ছবি। নামেই বলে দেয় এটা ছাত্ররাজনীতি নিয়ে নির্মিত একটি ছবি। এ ছবিতেও অভিনয় করেছেন কাজী মারুফ। নায়িকা ছিলেন পূর্ণিমা। এ ছবির গল্পে দেখা যায়, কলেজের অসৎ ছাত্রনেতাদের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে সাধারণ ছাত্র কাজী মারুফ। মিশা সওদাগর অসৎ নেতা।
ঘটনাক্রমে মিশার চোখ খুলে দেয় মারুফ তারই তৈরি করা ফাঁদ থেকে বাঁচিয়ে। মারামারি পূর্ণিমার পছন্দ নয়। তাই এই মারামারি করার কারণে মারুফকে ভুল বোঝে সে। প্রকৃত উদ্দেশ্য জানার পর অবশ্য সে ভুল ভাঙে। প্রতিবাদী মারুফ একে একে সব অপরাধীর মুখোশ খুলে শাস্তি দিতে থাকে। মূলত সাধারণ ছাত্রের সাহসী হয়ে ওঠার গল্পই হচ্ছে অস্ত্র ছেড়ে কলম ধরো।
এসব ছবির প্রত্যেকটি গল্পের উপজীব্য হচ্ছে ছাত্র আন্দোলন। একজন সাধারণ ছাত্র কখন, কেন এবং কীভাবে নোংরা রাজনীতির কবলে পড়ে নষ্ট হয়ে যায়, কিংবা দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে প্রতিবাদী হয়ে ওঠে এসবই তুলে ধরা হয়েছে।
সেসব ছাত্র আবার ঘুণে ধরা সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করে রাষ্ট্রকে দেখিয়ে দিয়েছে সদিচ্ছা থাকলে সবকিছুই করা সম্ভব। যদিও এ ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্যধর্মী ছবি এখন নির্মাণ করা বেশ কঠিন। সেটাও বর্তমান বাস্তব রাজনীতির কারণে। যদি নির্মাণ করা সম্ভবও হয় তাহলে সেটা সেন্সরের কাচির আঘাত এড়িয়ে আলোর মুখ দেখবে কিনা সেটা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থেকে যায়।
বিক্ষোভ ছবিতে ‘বিদ্যালয় মোদের বিদ্যালয়’ গান প্রসঙ্গে আগুন
‘তখন গাওয়ার সময় তেমন কোনো অনুভূতি কাজ করেনি। তবে গানটি গাওয়ার সময় খুব ভালো লেগেছিল। বর্তমানে যারা ছাত্র আন্দোলন করছে তাদের একটা কথা বলব, মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে। কারো যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে নজর রাখতে হবে। সবাই নিরাপদ সড়ক আশা করে। এ আন্দোলনে সবার সমর্থন আছে এবং থাকবে। অবশ্যই ধ্বংসাত্মক কোনো কাজ করা যাবে না।’
ছাত্র আন্দোলন ও এ ধরনের ছবিতে অভিনয় করা প্রসঙ্গে ওমর সানী
‘আমাদের সময় নম্রতা এবং মান্যতা ছিল অনেক। আমরা এ বিচার করিনি যে কে কোন দল! ছাত্রাবস্থায় অনেক সিনেমা করেছি। আরও সিনেমা সামনে করা উচিত। কিন্তু এ বিষয়ে নায়ক-নায়িকাদের বললে হবে না। প্রযোজক-পরিচালকদের এগিয়ে আসতে হবে। এখন ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা সড়ক দুর্ঘটনারোধ আন্দোলন করছে। এটা তাদের ন্যায্য অধিকার। তবে খেয়াল রাখতে হবে, অরাজনৈতিক এ আন্দোলনকে যাতে কেউ অন্যখাতে প্রবাহিত করতে না পারে।