
প্রিন্ট: ২৭ মার্চ ২০২৫, ০৯:৪৯ এএম
অস্তিত্ব সংকটে বেদে সম্প্রদায়

মুনযির আকলাম
প্রকাশ: ১২ অক্টোবর ২০১৮, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
বাংলাদেশ তথা এ উপমহাদেশের একটি যাযাবর জনগোষ্ঠী। যাযাবরদের মতো জীবনধারা হলেও বেদেদের রয়েছে বৈচিত্র্যপূর্ণ সমাজ ও সংস্কৃতি, রয়েছে নিজস্ব জীবনবোধ ও স্বকীয়তা।
মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুরের জয়দেবপুর, চট্টগ্রামের হাটহাজারী, মীরসরাই, তিনটুরী, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম, চান্দিনা, এনায়েতগঞ্জ, ফেনীর সোনাগাজী, উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জায়গা এবং ঢাকার বিভিন্ন স্থানে বেদেদের দেখা যায়।
সুনামগঞ্জের সোনাপুরে বাস করে বেদেদের একটি বড় অংশ। বেদে সম্প্রদায়ের মধ্যে অনেক গোত্র রয়েছে, যারা ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত।
বেদেরা গোত্রকে বলে জাত। মূলত পেশার ওপর ভিত্তি করেই এসব গোত্রের নামকরণ করা হয়েছে। যেমন- যারা সাপ খেলা দেখায় এবং সাপ কেনাবেচা করে তারা সাপুড়ে, যারা ঝাড়ফুঁক করে তারা মিশ্চিয়ারি, যারা জাদু দেখায় তারা বাজিগর বা মাদারি, যারা শারীরিক কসরত দেখায় তারা চামরিয়া, যারা কাচের চুড়ি ও মালা বিক্রি করে তারা সান্দার এবং যারা হাঁড়িপাতিলসহ সাংসারিক জিনিসপত্র বিক্রি করে তারা সওদাগর নামের গোত্রভুক্ত।
তাবিজ-কবজ বিক্রি করে ধবাইলা গোত্রের বেদেরা। যারা মাছ ধরে তারা মানতা। এ ধরনের আরও কয়েকটি গোত্র রয়েছে, যারা বিভিন্ন নামে পরিচিত।
বাংলাদেশে বেদেদের আগমন ও বিস্তার নিয়ে রয়েছে নানা মত। এ নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন। বেদেরা নিজেরাও এ বিষয়ে নানা মত দিয়েছে। কারও কারও মতে, বাংলাদেশে বেদেদের আগমন আরাকান অর্থাৎ আজকের মিয়ানমার থেকে। ১৬৩৮ সালে তৎকালীন আরাকানরাজ বল্লাল রাজার সঙ্গে শরণার্থী হিসেবে তারা এ দেশে এসেছিল। পরবর্তীকালে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে এবং সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।
আবার কারও কারও মতে, প্রাচীনকালে তারা সুদূর মিসর থেকে এসেছিল। তারা বেদুইন জনগোষ্ঠীর। বেদুইন থেকে বেদে শব্দের উৎপত্তি। বেদে সমাজে জনশ্রুতি রয়েছে, ভারতে পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার পান্ডুয়ায় বেদেরা এক সময় রাজত্ব গড়ে তুলেছিল।
আরেকটি জনশ্রুতি রয়েছে, বেদেরা পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুরা জেলার বিষ্ণুপুরের মল্লরাজাদের উত্তরসূরি। বেদেদের আগমন ও ছড়িয়ে পড়া সম্পর্কে বিশেষজ্ঞদের এসব মতামত ও জনশ্রুতির কোনটা সঠিক, তা নিরূপণ করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য এবং বিতর্কের বিষয়।
তবে এটি প্রায় সবাই একবাক্যে স্বীকার করেন যে, বেদে সম্প্রদায় বাংলাদেশে কয়েকশ’ বছর ধরে আছে এবং এ দেশের সমাজ-সংস্কৃতিতে মিশে গেছে।
বাংলার লোকায়ত সংস্কৃতির অনেকটা জুড়ে আছে এই বেদে সমাজ। গল্প, কবিতা, উপন্যাস থেকে শুরু করে সেলুলয়েডের পর্দায় কত রূপে বেদে-বেদেনী উপস্থিত হয়েছে, তার সঠিক পরিসংখ্যান নেই। এখন আর আগের মতো বহর নিয়ে ঘুরে বেড়ানো বেদে নারী-পুরুষের তেমন একটা দেখা যায় না। আমাদের লোকজ সংস্কৃতির ধারা থেকে ক্রমে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে সমৃদ্ধ এ ধারাটি।
বস্তুত বেদে সম্প্রদায়ের অস্তিত্ব এখন বিলুপ্তির পথে। ক্রমেই তাদের সংখ্যা কমছে। বেদে সম্প্রদায়ের চিরাচরিত জীবন-প্রণালি ধ্বংসের মুখে। বর্তমানে বেদেদের একটি বড় অংশ ঠিকানাবিহীন ও অনিশ্চিত জীবনযাপন করছে। জীবিকার সন্ধানে তারা খুঁজে নিচ্ছে নানা পথ।
বেদে সম্প্রদায় হাজার বছর ধরে বাংলা সংস্কৃতির একটি উপাদান হয়ে রয়েছে। বিশেষ করে ময়মনসিংহ গীতিকায় বেদে সম্প্রদায়ের উল্লেখ রয়েছে অনেকবার।
এদের হারিয়ে যেতে না দিয়ে বাংলার ঐতিহ্য হিসেবে সরংক্ষণ করা উচিত। এ জন্য তাদের জীবনমান উন্নয়নের ব্যবস্থা নিতে হবে। পাশাপাশি তাদের সামাজিক ও আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। মুনযির আকলাম : প্রাবন্ধিক, কুমিল্লা
moonzeerahcklham@gmail.com