
প্রিন্ট: ০৪ এপ্রিল ২০২৫, ০১:৪১ পিএম
হালদায় ৫ বছরে মিঠাপানির ৩৯ ডলফিনের মৃত্যু

আবু তালেব, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২২, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ

আরও পড়ুন
মিঠাপানির ডলফিন একটি অতিবিপন্ন প্রাণী। ইংরেজিতে একে বলা হয় ‘গঙ্গাজ রিভার ডলফিন’। ১৯৯৬ সাল থেকে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচারের (আইইউসিএন) লাল তালিকাভুক্ত দূষণমুক্ত পরিষ্কার পানিতে বিচরণকারী এসব ডলফিন স্থানীয়ভাবে উতোম বা শুশুক নামে পরিচিত। দেশের অন্যতম মিঠাপানির প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজনন ক্ষেত্র হালদা নদীতে বালুবাহী নৌকা ও ড্রেজারের প্রপেলরের আঘাত, দূষণ ও নিষিদ্ধ জালে আটকা পড়াসহ নানা কারণে প্রতিনিয়তই এ ডলফিনের মৃত্যু বেড়েছে। যদিও বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী আইন অনুসারে এ প্রজাতিটি সংরক্ষিত। ডলফিন হত্যা, বিক্রি ও খাওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। তারপরও হালদা নদীতে একের পর এক মারা পড়ছে ডলফিন।
জানা গেছে, ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে এ পর্যন্ত পাঁচ বছরে মোট ৩৯টি ডলফিনের মৃত্যু হয়েছে। এগুলোর দুয়েকটি বাদ দিলে প্রায় সব মরা ডলফিনের শরীরে আঘাতের চিহ্ন শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। একাধিক ডলফিন হত্যাও করা হয়েছিল। চলতি বছর জুলাইয়ে ৮ দিনের ব্যবধানে তিনটি মৃত ডলফিন ভেসে উঠেছে হালদা নদী ও সংলগ্ন খালে। ২১ জুলাই নদীর রাউজানের গুজরা ইউনিয়নের আজিমের ঘাট এলাকায় সর্বশেষ মৃত ডলফিনটি পাওয়া যায়। এর আগে ২০ জুলাই আজিমের ঘাট এলাকায় আরেকটি বড় আকারের মৃত ডলফিন ভেসে আসে। ডলফিনটির ঠোঁটের নিচের অংশ বিচ্ছিন্ন ছিল। দাঁতগুলোও ফেলে দেওয়া হয়েছিল। ধারণা করা হচ্ছে, ডলফিনটির মুখ জালে আটকা পড়েছিল। তাই ছাড়িয়ে নিতে এভাবে হত্যা করা হয়। এ ছাড়া ১৪ জুলাই রাউজানের দক্ষিণ গহিরা এলাকায় হালদার সংযোগ খাল বুড়িসর্তা থেকে প্রায় সাড়ে ৮ ফুট দৈর্ঘ্যরে ১২০ কেজি ওজনের এ যাবৎকালে সবচেয়ে বড় একটি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়। এসব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন নদী ও জলজ প্রাণী বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, ডলফিন রক্ষায় এখন পর্যন্ত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। এছাড়া প্রশাসনের মনিটরিং কমে যাওয়ায় অবৈধ জাল ফেলার প্রবণতা বেড়ে গেছে, যা বিপন্ন প্রজাতির এ ডলফিনের মৃত্যুর অন্যতম কারণ। এ অবস্থা অব্যাহত থাকলে হালদা নদী থেকে ডলফিন বিলুপ্ত হতে পারে। তাই বিলুপ্তির হাত থেকে ডলফিন রক্ষায় পরিবেশ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা, নদী ও জলজ প্রাণী বিশেষজ্ঞ এবং স্থানীয় জনগণকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, হালদা নদীতে যে ডলফিনের দেখা মেলে তা গাঙ্গেয় ডলফিন। এ ডলফিন বিশ্বের বিভিন্ন নদীতে আছে মাত্র ১ হাজার ১০০টি। এর মধ্যে শুধু হালদায় ছিল ১৭০টি। সূত্র জানায়, চলতি বছর হালদা নদীতে পরিচালিত জরিপে ১৪৭টির মতো ডলফিন মিলেছিল। ২০২০ সালে জরিপে মিলেছিল ১২৭টি। উদ্বেগজনক হলেও সত্যি, মাত্র পাঁচ বছরে ৩৯টি ডলফিনের মৃত্যু এদের শঙ্কার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর ড. মঞ্জুরুল কিবরিয়া জানান, ডলফিনগুলো রক্ষা করা না গেলে হালদা ডলফিনশূন্য হয়ে যাবে। ডলফিন বাঁচাতে নদী তীরের বাসিন্দাদের সচেতনতাই একমাত্র পথ।
এদিকে, ২০২০ সালের ৮ মে রাউজানের উরকিরচর ইউনিয়নে হালদাসংলগ্ন এলাকায় একটি ডলফিনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। ডলফিনের চর্বি থেকে তৈরি তেল নারীদের রোগমুক্তি ঘটে-এমন কুসংস্কারে এ ডলফিনকে হত্যা করা হয় বলে স্থানীয়দের অভিমত। এরপর ওই বছর ১১ মে হালদায় ডলফিন হত্যা বন্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে ভার্চুয়াল আদালতে রিট করেন সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী আব্দুল কাইয়ুম লিটন। ইমেইলের মাধ্যমে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রিট জমা দেন তিনি। আবেদনে হালদা নদীতে ডলফিন হত্যা বন্ধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা কেন অবৈধ হবে না এবং ডলফিন হত্যা বন্ধে কেন প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে না-এ মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়। আবেদনে মৎস্য ও পশুসম্পদ সচিব, পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক, চট্টগ্রাম বিভাগীয় পরিচালক ও চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বিবাদী করা হয়েছিল। এতে হাইকোর্ট থেকে একটি নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ডলফিন রক্ষায় এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডলফিন রক্ষায় দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।
হাটহাজারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহিদুল আলম বলেন, হালদার সর্তারঘাট থেকে মদুনাঘাট পর্যন্ত নদীর প্রায় ১০ কিলোমিটার এলাকা এসব ডলফিনের মূল নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র। এর মধ্যে অবৈধভাবে জাল ফেলে স্থানীয় মৎস্য শিকারিরা। স্থানীয়রা যদি ডলফিন ও মা মাছ রক্ষায় সচেতন না হন, তাহলে পরিস্থিতি সামলানো কঠিন। তবে ডলফিনসহ জীববৈচিত্র্য রক্ষায় মৎস্যশিকারি এবং নদীর পরিবেশ বিপন্নকারীদের বিরুদ্ধে আমাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে।
ডলফিনের বিষয়টি বন বিভাগ দেখে উল্লেখ করে চট্টগ্রামের জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারহানা লাভলী বলেন, হালদা নদীর মা-মাছ ও পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নৌপুলিশসহ প্রশাসন কাজ করছে।
তবে বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগ চট্টগ্রামের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, হালদা নদীর ডলফিনের দায়িত্ব একা বনবিভাগের নয়। এটার জন্য একটি কমিটি রয়েছে। প্রাকৃতিকভাবে অনেক ডলফিন মারা যায়। আঘাতে ডলফিন মারা গেছে বা হত্যা করা হয়েছে এটা কেউ কি দেখেছে-এমন প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, এ ছাড়া আমাদের জনবল সংকট রয়েছে। তবে হালদা নদীর কোথাও ডলফিন হত্যার কোনো ঘটনা কারও জানা থাকলে আমাদের জানালে দ্রুত ব্যবস্থা নেব।
বিশ্ব মিঠাপানির ডলফিন দিবস পালিত : গতকাল ছিল বিশ্ব মিঠাপানির ডলফিন দিবস। বঙ্গবন্ধু হেরিটেজ ও মৎস্য প্রজননক্ষেত্র হালদা নদীর তীরে প্রতিবছরের মতো এবারও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হয়েছে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল-শুশুক ডলফিন রক্ষা করি, জলজ প্রতিবেশ ভালো রাখি। ডলফিন সংরক্ষণে সচেতনতা বাড়াতে চট্টগ্রাম বন বিভাগ ও জেলা প্রশাসন এসব কর্মসূচির আয়োজন করে। হাটহাজারীর গড়দুয়ারা ইউনিয়নে বঙ্গবন্ধু মৎস্য হেরিটেজ রিসোর্স সেন্টার চত্বরে সোমবার দুপুরে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রট সুমনী আকতার। সভাপতিত্ব করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাহিদুল আলম। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির কো-অর্ডিনেটর মনজুরুল কিবরিয়া।
রাউজান উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নিয়াজ মোর্শেদের ও বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্য পরিচালনায় স্বাগত বক্তব্য দেন রাউজান উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুস সামাদ শিকদার। বিশেষ অতিথি ছিলেন বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের চট্টগ্রাম বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম চৌধুরী। বক্তব্য দেন নৌপুলিশ চট্টগ্রাম অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার খোরশেদ আলম, হাটহাজারী উপজেলা পরিষদ ভাইস চেয়ারম্যান নুরুল আলম বাশেক, আইডিএফ-এর জোনাল ম্যানেজার মোহাম্মদ শাহ আলম, হাটহাজারীর গড়দুয়ারা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান সরওয়ার মোর্শেদ তালুকদার, রাউজানের পশ্চিম গুজরা ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান লায়ন শাহাবুদ্দিন আরিফ প্রমুখ।