ঢাবিতে সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ
সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অপপ্রচারের নেপথ্যে আ.লীগকে পুনর্বাসনের ষড়যন্ত্র

যুগান্তর প্রতিবেদন
প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫, ০৬:৪৩ পিএম

জুলাই বিপ্লবের অন্যতম প্রধান নিয়ামক শক্তি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধভাবে অপপ্রচার ও অপবাদ রটিয়ে দেশের গণতান্ত্রিক সন্ধিক্ষণকে অস্থিতিশীল করার ষড়যন্ত্র হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যে গণঅবস্থানকারীরা। তাদের আশঙ্কা জুলাই বিপ্লবের জনআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের আগেই সেনাবাহিনী ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে পতিত ফ্যাসিবাদী গোষ্ঠী আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন ও ভারতীয় আগ্রাসন ঘটানো হতে পারে।
শুক্রবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এ আশঙ্কার কথা জানান গত ১৩ ফেব্রুয়ারি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ ও দোসর দলগুলোর নিষিদ্ধের দাবিতে গণঅবস্থানকারীরা। এতে বক্তব্য রাখেন- বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক ও গণঅবস্থানের সংগঠক আবদুল ওয়াহেদ, জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের রাজনৈতিক প্রধান আনিছুর রহমান ও সদস্য সচিব হাসান মোহাম্মদ আরিফ।
লিখিত বক্তব্যে আবদুল ওয়াহেদ বলেন, দেশবাসী, অন্তর্বর্তী সরকার ও সেনাবাহিনীকে স্পষ্ট বার্তা দিতে চাই- সময়মতো সবাই সচেতন না হলে দেশ প্রতিবিপ্লবী চোরাবালিতে আটকা পড়বে এবং জনগণ ফের গণহত্যা ও গোলামির শিকার হবে।
সেনাবাহিনীর অবদান উল্লেখ করে তিনি বলেন, জুলাইয়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে ছাত্র-জনতাকে স্তব্ধ করে দিতে চেয়েছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার। তবে সেনা সদস্যরা ছাত্র-জনতাকে হত্যা করতে অস্বীকৃতি জানালে ৪৯ বছরের মাথায় দেশে ফের সিপাহি-জনতার বিপ্লবের জন্ম হয়।
এ সময় সেনাবাহিনীর ভূমিকার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, সেনাবাহিনী ফ্যাসিস্ট হাসিনার কথামতো বন্দুক চালাতে অস্বীকার করে, বহু জায়গায় আওয়ামী সন্ত্রাসীদের লক্ষ্য করে গুলি চালায় এবং আন্দোলনরত জনগণকে সহায়তা করে বলেই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যায়, বাংলাদেশ নতুন স্বাধীনতা লাভ করে।
বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের আহ্বায়ক বলেন, জুলাই গণহত্যা ও তার আগে ১৬ বছর সরাসরি জনগণকে হত্যা-নির্যাতনে সেনাবাহিনীসহ যেকোনো বাহিনীর সদস্যদের বিচার করার বিষয়ে জনগণের মধ্যে কোনো দ্বিধা-সংকোচ, যদি কিন্তু নাই; কিন্তু কোনো সদস্যের ভূমিকার কারণে জুলাই বিপ্লবে ছাত্র-জনতার পাশাপাশি সেনাবাহিনীর অবদানকে অস্বীকার, অবহেলা ও উপেক্ষা করার সুযোগ নাই।
তিনি সবাইকে দেশের নতুন স্বাধীনতা অর্জনে সেনাবাহিনীর প্রাতিষ্ঠানিক ভূমিকাকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানান। তিনি ফ্যাসিবাদ পতনের জন্য সেনাবাহিনীকে শোকরিয়া জানান। বিশেষ করে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামানসহ বিপ্লবের পক্ষের গোটা সেনা নেতৃত্বের প্রতি জাতির কৃতজ্ঞতা প্রকাশে কোনো সংকোচ থাকা উচিত নয় বলে মনে করেন তিনি।
আবদুল ওয়াহেদ অভিযোগ করে বলেন, শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদ টিকিয়ে রাখতে সামাজিক মাধ্যমে ভূমিকা রাখা কিছু লোক, বিতর্কিত দালাল বুদ্ধিজীবী ও সেক্যুলার-বামপন্থি অ্যাক্টিভিস্টরা জুলাই বিপ্লবে সেনাবাহিনীর মহান ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামানকে টার্গেট করে মিথ্যাচার চালাচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে মূলত সেনাবাহিনীকে দুর্বল ও জনগণের প্রতিপক্ষ করার চেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, আমাদের সুস্পষ্ট কথা হলো- জুলাই বিপ্লব-উত্তর উন্নত শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়তে হলে সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী করতে হবে। জুলাই বিপ্লবে সেনাবাহিনীর যে বিশাল অবদান রয়েছে তা স্বীকৃতি দিয়ে বিপ্লবী ছাত্র-জনতার সংকল্প অনুযায়ী ‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থার বিলোপ এবং নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত’ বাস্তবায়নেও সেনাবাহিনীকে সম্পৃক্ত করতে হবে। বিশেষ করে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অঙ্গীকার অনুযায়ী দেশের ‘সবকিছু নতুন করে গড়ে তুলতে’ সেনাবাহিনীর সর্বাত্মক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
এ দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিপ্লবের পর দেশ গড়ার দায়িত্ব ছাত্র-জনতা-সেনাবাহিনীসহ দেশের সর্বস্তরের জনগণের।
আবদুল ওয়াহেদ বলেন, আমরা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, সেনাবাহিনী, রাজনৈতিক দল ও নাগরিকদের আহবান জানাই- আপনারা আর কালক্ষেপণ না করে ফ্যাসিবাদ বিলোপে পদক্ষেপ নিন। নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়ে তুলুন।
তিনি বলেন, নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত গড়তে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থা ও কাঠামোকেও সমূলে বিলুপ্ত করতে হবে। একে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, নির্বাচিত সরকারের প্রয়োজনীয়তা বা অন্য কোনো অজুহাতে পুনর্বহাল বা নবায়ন করা যাবে না। বরং রাষ্ট্র পুনর্গঠনের প্রশ্নকে একমাত্র প্রাধান্য দিয়ে সবার আগে জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে অস্পষ্টতা, দ্বিধা-সংকোচ ও কালক্ষেপণকে বাদ দিয়ে সর্বস্তরের নাগরিকের ঐক্য ও সংহতি গড়ে তুলতে হবে।
লিখিত বক্তব্যে সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় পাঁচ বছরের জাতীয় সন্ধিক্ষণ ঘোষণার আহ্বান জানিয়ে বলা হয়েছে- এ সময়ে বাংলাদেশকে অতীতের সব জঞ্জাল মুক্ত করে ত্রুটিহীনভাবে পরিগঠন করতে হবে। পরিগঠনের সময় সামরিক বাহিনীকে রাষ্ট্র পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতে হবে। তবে এটি মোটেই সামরিক শাসন নয়। এটি হলো জাতীয় সন্ধিক্ষণে প্রয়োজনীয় সবক্ষেত্রে সামরিক বাহিনীর উপস্থিতি ও দায়িত্ব পালনের বন্দোবস্ত থাকা।
সেনাবাহিনীকে দেশ পরিচালনায় সম্পৃক্ত করতে ছয়টি পরিধির কথা সংবাদ সম্মেলেন তুলে ধরা হয়েছে। ছয় পরিধি হলো-
১. পুরোনো সংবিধান বাতিল করে ড. ইউনূসের নেতৃত্বে রাষ্ট্রপতি শাসিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনে সর্বাত্মক সহায়তা ও নিরাপত্তা প্রদান করা।
২. একটি শক্তিশালী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ গঠন করা; যার চেয়ারম্যান হবেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের রাষ্ট্রপতি ড. মুহাম্মদ ইউনূস ও ভাইস চেয়ারম্যান হবেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার উজ-জামান। এ পরিষদে প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধান, পুলিশ প্রধান, গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিক ও নাগরিকরাও অন্তর্ভুক্ত হবেন। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্তের আলোকে পুরাতন সংবিধান বাতিল এবং ফ্যাসিবাদী দল ও সংগঠনকে নিষিদ্ধ করবে।
৩. নতুন সংবিধান প্রণয়নে জুনে গণপরিষদ গঠন ও নির্বাচন পরিচালনা এবং পরবর্তীতে দ্রুত সংসদ নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের হাতে ক্ষমতা প্রদান করা।
৪. দেশের আর্থিক খাতের নিরাপত্তা তথা ব্যাংক, স্টক এক্সচেঞ্জ, আমদানি ও রপ্তানির লেনদেন সামরিক বাহিনীর মনিটরিং ও তত্ত্বাবধানে হওয়া।
৫. দেশের সব উপজেলায় স্থায়ীভাবে সেনা মোতায়েন রাখা; যেন সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গি হামলাসহ জননিরাপত্তা সংক্রান্ত ইস্যুতে তাৎক্ষণিক সাড়া দেওয়া যায়। এক্ষেত্রে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবিরও সহায়তা নিতে হবে।
৬. সেনাবাহিনী, জনপ্রশাসনসহ রাষ্ট্রের সর্বত্র ফ্যাসিবাদের দোসর, দুর্নীতিবাজ ও দেশবিরোধীদের চিহ্নিত করে তাদের শূন্যপদে সাবেক দেশপ্রেমিক সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নিয়োগ প্রদান করা।
এদিকে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আওয়ামী লীগ ও মিত্র দলগুলো নিষিদ্ধের দাবিতে ১৬ দিন ধরে চলা লাগাতার অবস্থান কর্মসূচি রমজান মাসে সকাল ৯টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলবে। রমজানে প্রতিদিনই গণইফতার আয়োজন করা হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- জাতীয় বিপ্লবী পরিষদের যুগ্ম আহবায়ক সাইয়্যেদ কুতুব, সহকারী সদস্য সচিব আব্দুস সালাম, ডা. মাসুম বিল্লাহ, গালীব ইহসান, তৌহিদ তপু, আহম্মেদ সুমন, তামিম আনোয়ার, ওয়াসিম আহমদ, মোহাম্মদ হিযবুল্লাহ, কায়েস আহম্মেদ, ওমর ফরুক, বিপ্লবী ছাত্র পরিষদের সদস্য সচিব ফজলুর রহমান, সিনিয়র সহকারী সদস্য সচিব ইসতিয়াক আহমেদ ইফাত, সহকারী সদস্য সচিব আশরাফুল ইসলাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার আহ্বায়ক সানোয়ারা খাতুন ও যুগ্ম আহ্বায়ক গোলাম নূর শাফায়েতুল্লাহ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখার যুগ্ম আহ্বায়ক সালমান ফার্সি ও বাংলাদেশ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সদস্য সচিব ফরহাদ আহমদ আলী প্রমুখ।